Published : 22 Aug 2025, 10:42 PM
রোহিঙ্গা শরণার্থী বেগম কিছুটা স্বস্তি পান এই ভেবে যে, তার সাত মেয়ের একজনকে অন্তত বিয়ে দিতে পেরেছিলেন স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই।
তার মেয়ের স্কুলের মত কক্সবাজারের ঘিঞ্জি শরণার্থী শিবিরগুলোর হাজারো স্কুল তহবিল সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে প্রায় পাঁচ লাখ শিশুর ওপর।
বেগম তার যে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, সে তার দ্বিতীয় সন্তান, বয়স মাত্র ১৬।
৩৫ বছর বয়সী বেগম বলছিলেন, স্কুল না থাকলে মেয়েরা ঘরে বসে থাকে, মানুষ নানা কথা বলতে শুরু করে।
বেগম যখন কথা বলছিল, তার সবচেয়ে ছোট মেয়েটি মায়ের ওড়না ধরে টানছিল। আর চার মেয়ে গুটিসুটি মেরে বসে ছিল আশ্রয়কেন্দ্রের বাঁশের ঘরে।
তাদের মা বললেন, “আমার আসলে ভয় হচ্ছিল। মেয়েকে বিয়ে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। শুধু দোয়া করি, জামাই যেন তাকে পড়তে দেয়।”
বেগমের স্বামী মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। মধ্যবয়সী এই নারী নিজের পুরো নাম প্রকাশ করতে চাননি। এত অল্প বয়সে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ায় কোনো ঝামেলায় পড়তে হয় কি না, সে ভয়ও তার আছে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে থাকা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর অর্ধেকেরই বয়স আঠারোর কম। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রখাইনে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরুর পর পরিবারের সঙ্গে তারা বাংলাদেশে এসেছে। শরণার্থী শিবিরেই অনেকের জন্ম হয়েছে, হচ্ছে।
তারিখটি ছিল ২৫ অগাস্ট, ২০১৭ সাল। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে শরণার্থীদের ঢল শুরু হয়েছিল। এরপর কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়। গড়ে ওঠে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের যেভাবে তাদের বাস্তুভিটা থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে, জাতিসংঘ তাকে বর্ণনা করেছে ‘জাতিগত নিধনের উদাহরণ’ হিসেবে।
গত সোমবার সেই ভয়াবহ বাস্তুচ্যুতির আট বছর পূর্ণ হল। এর মধ্যে কয়েকবার রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও মিয়ানমারের পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। এদিকে আশ্রয় শিবিরের পরিস্থিতিও দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে।

ডনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে ফেরার পর আন্তর্জাতিক সহায়তার তহবিল অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যেই গত ১৮ মাসে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা এসেছে, অথচ ক্যাম্পের জন্য আন্তর্জাতিক বরাদ্দ কমছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, এ বছর রোহিঙ্গাদের সহায়তায় প্রায় ২৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার দরকার। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রয়োজনের মাত্র ৩৮ শতাংশ প্রতিশ্রুতি মিলেছে।
ইউএনএইচসিআর বলছে, বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তাদের ১০.৬ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক চাহিদার কেবল এক-তৃতীয়াংশ পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি জুলিয়েট মুরেকেইসনি বলেন, “এই শরণার্থীরা আগেই সব হারিয়েছে। এখন তাদের জন্য তহবিল নিয়েও মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তাদের টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে যাবে।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে থাকা পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি সেবা ও জীবনরক্ষাকারী সহায়তার যে কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, তহবিল সংকটে তা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
“খাবার, স্বাস্থ্যসেবা, রান্নার গ্যাস (এলপিজি), সাবান আর শিক্ষা—সবই হয় বন্ধ হয়ে যাবে, নয়ত দারুণভাবে ব্যহত হবে যদি জরুরি সহায়তা না মেলে।”
শরণার্থী ক্যাম্পের বেশিরভাগ স্কুল চালাত ইউনিসেফ। তহবিল ঘাটতির কারণে জুনে তারা ৪ হাজার ৫০০ স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।
তাতে ২ লাখ ২৭ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শিশু পড়াশোনার সুযোগ হারিয়েছে। চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ২০০ বাংলাদেশি শিক্ষক। অনেক রোহিঙ্গা শিক্ষকও বেকার হয়ে পড়েছেন।
বয়সে যারা বড়–তেমন শিক্ষার্থীদের একটি অংশের জন্য জুলাই মাসে ফের ক্লাস শুরু করা গেলেও বাঁশ আর প্লাস্টিকের তৈরি অনেক শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা পড়ে আছে, তালা ঝুলছে দরজায়।
রোহিঙ্গা শিক্ষক নাসের খান বলছিলেন, বাচ্চারা এখন কাদার মধ্যে খেলে। স্কুলে যা শিখেছিল, সব ভুলতে বসেছে।
“শিক্ষা ছাড়া তো তারা অন্ধ হয়ে যাবে। পুরো প্রজন্মটাই হারিয়ে যাবে।”

‘ভবিষ্যৎ ছিনতাই’
শরণার্থী শিবিরের সরু গলি ধরে দুপুরের কড়া রোদের মধ্যে হাঁটছিলেন মোহাম্মদ ফারুক; একটু পর পর দুই মেয়ের নাম ধরে ডাকছিলেন। আসলে তিনি মেয়েদের খুঁজছেন।
আগে তার মেয়েরা বই-খাতা হাতে স্কুলে যেত। এখন স্কুল বন্ধ, তাদের দিন কাটে শরণার্থী শিবিরের অলিগলি ঘুরে ঘুরে।
২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ছয় সন্তানের জনক ফারুক বলেন, “আমাদের শিশুদের শিক্ষালাভের সামান্য সুযোগটুকুও ছিনিয়ে নেওয়া হল।
“মিয়ানমারে গণহত্যা থেকে আমরা বেঁচে গেছি, এখানে বন্যা আর আগুন থেকেও টিকে গেছি। কিন্তু এখন আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ নীরবে খুন হয়ে যাচ্ছে।”
এই দুশ্চিন্তার ভার একা একা বহন করাও ফারুকের জন্য কঠিন। তিনি বলছিলেন, “আমাদের সন্তানরা যদি পড়তে না পারে, তাদের কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না। ওরা যে শিগগিরই দেশে ফিরতে পারবে, সেরকম কোনো সুযোগ আমরা দেখি না। আর এখানে তো ওদের কিছুই নেই।”
আন্তর্জাতিক রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজারে ১২ বছরের কম বয়সী কোনো রোহিঙ্গা শিশু পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে না। প্রায় ৫ লাখ শিশু এখন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
আইআরসি বলছে, মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ার মারাত্মক প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। এ বছর বাল্যবিয়ের ঘটনা বেড়েছে ৩ শতাংশ, শিশুশ্রম বেড়েছে ৭ শতাংশ। প্রকৃত হার আরো বেশি হওয়ার কথা কারণ সেখানে নজরদারির সুযোগ সীমিত, সামাজিক কারণে অনেক রোহিঙ্গা প্রকৃত তথ্য প্রকাশও করেন না।
বাংলাদেশে আইআরসির পরিচালক হাসিনা রহমান বলেন, “এই পরিস্থিতিতে প্রতিদিন আরও অনেক পরিবার টিকে থাকার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেবে। তারা জুয়ায় জড়াবে, মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেবে, শিশুদের ঠেলে দেবে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে। এমনকি যৌন নির্যাতনও বাড়বে।”

‘পুড়ছে শিশুদের স্বপ্ন’
ইউনিসেফ বলছে, বিশ্বের মনেযোগ এখন অন্য দিকে সরে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল কমে গেছে।
বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “প্রতিটি ডলার বাঁচাতে আমরা কর্মী কমিয়েছি, কার্যক্রম সঙ্কুচিত করেছি, খরচে কাটছাঁট করেছি। কিন্তু প্রয়োজন মেটাতে সেসব যথেষ্ট নয়।”
ইউএনএইচসিআর সতর্ক করে বলেছে, বিগত বছরগুলোতে যদি সামান্য হলেও অগ্রগতি হয়ে থাকে, এখনকার তহবিল সংকট সেটাকে ‘শূন্যে’ নামিয়ে আনতে পারে।
মিয়ানমারে সহিংসতা অব্যাহত থাকায় গত ১৮ মাসে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা এসেছে কক্সবাজারে, ফলে সীমিত যেটুকু সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল, সেখানেও চাপ বেড়েছে।
আশ্রয় শিবিরের বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী গণিত শিক্ষক কফায়েত উল্লাহ বলেন, “আমি স্বপ্ন দেখতাম, আমার ছাত্ররা ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে। এখন স্কুল বন্ধ, ওরা কিছুই হতে পারবে না।
“ওরা (মিয়ানমারের সেনা) আমাদের ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। আর এখন আমাদের শিশুদের স্বপ্ন জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”
৯ বছরের রোহিঙ্গা শিশু নাহিমা বিবিও পড়ালেখা করে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখত। এখন তার দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে শরণার্থী শিবিরের কাদামাখা অলি গলিতে অন্য শিশুদের সাথে খেলাধুলায়।
আস্তে করে সে বলে, “যদি স্কুলে না যাই কীভাবে আমি ডাক্তার হব? আমার মনটা খারাপ লাগে।”