Published : 27 Dec 2025, 01:12 AM
প্রায় দেড় বছর কেটে গেলেও মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না কেন; কিংবা আগে থেকে আভাস পাওয়ার পরও ১৮ ডিসেম্বর রাতে সংবাদমাধ্যমসহ সাংস্কৃতিক সংগঠনে ‘মব’ করে তাণ্ডব চললো কীভাবে?
সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা মনে করছেন, মব সন্ত্রাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফ থেকে ‘কিছুটা শৈথিল্য আছে’।
আর মব নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে হতাহতের আশঙ্কা থাকার যে যুক্তি পুলিশের তরফে শোনানো হচ্ছে, তাকে ‘মন্দ অজুহাত’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোচনা অনুষ্ঠান ইনসাইড আউটে অংশ নিয়ে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন নুরুল হুদা।
তিন দশকের বেশি সময় ধরে পুলিশে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে এ বাহিনী নিয়ে তার মূল্যায়নও উঠে এসেছে আলোচনায়।
সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যা ও এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও কথা বলেছেন তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে শুক্রবার অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়।
১৯৭০ সালে পুলিশে যোগ দেওয়া নুরুল হুদা ২০০০ সালের ৭ জুন থেকে ২০০১ সালের ৬ নভেম্বর পর্যন্ত আইজিপির দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করে ২০০৩ সালে অবসরে যান।
১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অধীনে জাতীয় পরামর্শকও ছিলেন নুরুল হুদা। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ সালে পুলিশের কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এখন অবসর জীবনে লেখালেখিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি।

প্রসঙ্গ হাদি হত্যা
ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদির খুনিরা দেশে থাকলে ধরা পড়বে বলে মনে করেন সাবেক এই আইজিপি।
তিনি বলেছেন, “অন্যান্য অনেক কেসেও তো দেখা যাচ্ছে যে পরে ধরা পড়ছে। তো এটা ধরা পড়াও খুব ডিফিকাল্ট হবে বলে আমি মনে করি না এবং এটাই জরুরি। তাহলে বোঝা যাবে যে এটা কাদের বিষয় ছিল, এটা কোনো কন্সপিরেসির পার্ট কিনা, বা এটা ব্যক্তিগত শত্রুতা বা অন্য গোষ্ঠীগত কোনো শত্রুতা আছে কিনা। এখন বলাটা আর্লি হবে এটা, এক মাসও হয়নি।”
‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব’
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব হবে কিনা জানতে চাওয়া হয়েছিল নুরুল হুদার কাছে।
জবাবে তিনি বলেছেন, “আমি মনে করি, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব। কারণ নির্বাচন যখন হবে, সেটা দেশব্যাপী হবে। অতএব আজ যারা কিছু কিছু জায়গায় গন্ডগোল করছে, তারা তো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারবে না। আর দেশব্যাপী যদি গন্ডগোল করবার ক্ষমতা রাখে, তাহলে সেই খবর নিশ্চয় কর্তৃপক্ষের কাছে থাকবে এবং সে মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
“যদি দরকার হয়, সেখানে ৫০০ থেকে এক হাজার লোককে গ্রেপ্তার করতে হবে, যারা ভোট পর্যন্ত কারাগারে থাকবে। আমাদের আইনও সাপোর্ট করে এটা। তো এখন আমি মনে করি না, পরিস্থিতি এত ভয়াবহ। যখনই ইলেকশনের ক্যাম্পেইন শুরু হবে, তখন সমস্ত লোকেরা যার যার এলাকায় চলে যাবে। তখন কিন্তু ঢাকাকেন্দ্রিক এক জায়গায় সব লোক বসে থাকবে না। তো যার যার এলাকায় চলে গেলেই তো এটার কিছুটা টেনশন এমনিই চলে গেল।”
‘গানম্যানে আংশিক সমাধান’
হাদি হত্যার পর রাজনীতিকসহ ৫০ জনের ‘হিটলিস্টের’ গুঞ্জন ছড়িয়েছে। সরকার সমাধান হিসেবে গানম্যান নিয়োগ দেওয়ার কথা বলেছে।
এভাবে সমাধান হবে কিনা জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, “এভাবে সমস্যার পুরো সমস্যার সমাধান হবে না, কিন্তু আংশিক নিশ্চয় হবে। অতীতের এই রেকর্ড আছে, যখন ব্যক্তিবিশেষের নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে, তখন তাকে রাষ্ট্রের তরফ থেকে প্রটেকশন দেওয়া।
“এই গানম্যান দেওয়াটা সাময়িক একটা বন্দোবস্ত। যদি তার পার্মানেন্ট প্রটেকশন লাগে, তিনি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নেবেন। আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয় যে দুই-তিনটা কারণে, তার মধ্যে একটা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা; সেটা তার দেহের বা সম্পত্তির। তো সেদিক দিয়ে বিষয়টা ঠিক আছে। “
নির্বাচন সামনে রেখে যেখানে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করার কথা, সরকার সেখানে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়া সহজ করল।
তবে এখানে নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখছেন না সাবেক এই আইজিপি। তিনি বলছেন, “একটা লোককে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দিতে হলে তো অনেক কিছু চিন্তা করেই দিতে হয়। নির্বাচন আসছে, অতএব অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া নিরাপত্তার জন্য, এটা কোনো ঝুঁকি তৈরি করে না।”

১৮ ডিসেম্বর রাত
তার সঙ্গে আলোচনায় উঠে আসে ১৮ ডিসেম্বর রাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলার প্রসঙ্গও।
ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর আসার পর সেই রাতে আক্রান্ত হয় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারসহ ছায়ানটের মত সংগঠন।
এ বিষয়ে সাবেক পুলিশ প্রধান নুরুল হুদা বলেন, “কিছুটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফ থেকে শৈথিল্য আছে আরকি। সময় মত অ্যাকশনের অভাব আছে। কিন্তু আমাদের একটু এই পরিপ্রেক্ষিতটা মনে রাখা উচিত যে, বিগত ৫ অগাস্টের যে ঘটনা এবং তার আগে সরকার যেভাবে দমননীতি চালিয়েছে, তারা জনগণকে শত্রু হিসেবেই ট্রিট করেছে। এবং এর প্রত্যুত্তরে জনগণেরও অংশবিশেষ পুলিশ বাহিনীকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং তাদের আচরণও সেরকম হয়েছে।
“যেভাবে পুলিশের ওপর আক্রমণ হয়েছে, থানা পোড়ানো হয়েছে, পুলিশের লোকদের দড়িতে ঝুলিয়ে পাবলিক জায়গায় দেখানো হয়েছে। তো এগুলো ইন্ডিকেট করে যে, একটা বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। আমরা ঠিক অনেকে এখনো বুঝতে পারছি না।
তিনি বলেন, “যেখানে ১০০০ থেকে ১২০০ লোক মারা যায়, তিন থেকে চার হাজার লোক যেখানে আহত হয়, এইরকম একটা বিরাট ঘটনার পর সবকিছু যে নরমাল হবে এবং স্বাভাবিক হবে, সেটা আশা করা মুশকিল। সাধারণত এরকম ঘটনা ঘটলে সেটাকে বৈপ্লবিক পরিবর্তন বলা হয় এবং তখন সেখানে বিপ্লবী সরকার আসে। তারা এত নিয়মকানুনের মধ্যে যায় না। তাদের যেটা দরকার সেটা তাড়াতাড়ি করে।
“আমাদের এখানে তা হয় নাই। এই যে এত লোক মারা গেল, এরকম একটা অবস্থার বিপরীতে কী অ্যাকশন হতে পারত, তা আমাদের এখানে ঠিক ওইভাবে হয় নাই। তো এখন ওই পুলিশ বাহিনীকে দিয়ে পুরোদমে ফুল গিয়ারে কাজ করানো মুশকিল। সেজন্যই হয়ত গোয়েন্দা তথ্য ঠিক সময়ে আসছে না; বা এলেও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না। তো এই কাজগুলোই করতে হবে আরকি। দ্রুত নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে তার ভিত্তিতে কাজ করলে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব একটা কঠিন কাজ না।”
সময়মত অ্যাকশন না নেওয়ার কারণ হিসেবে ডিএমপি বলেছে, পুলিশ অ্যাকশনে গেলে হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারত।
এই বক্তব্যকে ‘মন্দ যুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করে নুরুল হুদা বলেন, “হতাহতের ঘটনা তো ঘটবেই। এটা কোনো অজুহাত হল না। আগে থেকে জানা থাকলে এটার প্রিভেন্টিভ বন্দোবস্ত নেওয়া উচিত ছিল। এবং এটা যখন তারা করছিল, তখনও তাদেরকে নিবৃত্ত করা যেত। এটা খুব কঠিন কাজ না।”

ডিএমপির পক্ষ থেকে পুলিশের গত বছরের ‘ট্রমা’র বিষয়টিকেও সামনে আনা হয়েছে। ভঙ্গুর মনোবল নিয়ে নতুন ‘ক্যাজুয়ালিটি’ হলে এই পুলিশকে নিয়ে সামনে এগোনো কঠিন বলেও মনে করেন কেউ কেউ।
এ বিষয়ে সাবেক এই আইজিপি বলেন, “কিছু লোকের (পুলিশ সদস্য) মনোবলের ওপর আঘাত লাগতে পারে, যারা অন্যায় কাজ করেছে, অন্যায় আদেশ পালন করেছে, বা মানুষ হত্যায় লিপ্ত হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ ফোর্সের তো এই ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার কথা না। আর পুলিশিংয়ে এলে আপনাকে একটু শক্ত মনের লোক হতে হবে এবং আপনাকে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মত মানসিক প্রস্তুতিও থাকতে হবে। সেগুলো যাদের আছে, যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী, তারাই তো এই কাজটা করবে।
“এখানে এই দুর্বলতার কোনো জায়গা নাই। আর এখন এক বছর পার হয়ে দেড় বছর হতে যাচ্ছে। এখন এই অজুহাত দেওয়া যাবে না। সেই সময় পার হয়ে গেছে আমার মনে হয়।”
হাদির মৃত্যুকে ঘিরে হামলা-ভাঙচুরকে নিছক ‘মব’ হিসেবে দেখতে চান না সাবেক এই আইজিপি।
তিনি বলেন, “না, এটা শুধু ওইরকমের একটা অল্প সময়ের জন্য অ্যাক্টিভ হওয়া, একটা উন্মত্ত জনতা তো না। মব তো উন্মত্ত জনতাই, শুধু উন্মত্ত জনতা হলে এভাবে বেছে বেছে যে সমস্ত সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা আছে, যাদের রাজনৈতিক আদর্শ একরকম…তা সেটা হতো না আমার মনে হয়।
“তাদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে অ্যাক্টিভ কিছু লোক থাকতে পারে, যারা আদর্শগতভাবে ওইরকম ধ্বংসাত্মক কাজে বিশ্বাসী এবং মনে করে যে অন্য যাদের আদর্শ আছে বা ধর্ম, সেগুলো আমরা এখানে পালন করতে দেব না। এরকম একটা টেন্ডেন্সি বা দৃষ্টিভঙ্গির কিছু লোক থাকবে।”

‘শৈথিল্য দেখানোর সুযোগ নেই’
ময়মনসিংহের ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার প্রসঙ্গও আসে আলোচনায়।
সাবেক এই আইজিপি বলেন, “এই মব, এই ব্যাপারটা, এখনো অনেক লোকের মধ্যে একটা সুপ্ত জিঘাংসা আছে। সুযোগ পায় না, সুযোগ যখন পায়, তখন তার প্রকাশ দেখা যায়। তো এই ধর্মের নামে এই উন্মাদনা, এগুলো তো নিঃসন্দেহে কিছু গোষ্ঠীর কাজ। তা না হলে এ ধরনের ঘটনা এভাবে হবে না। তবে এটা অত্যন্ত নিন্দনীয় ব্যাপার, এটা আমাদের আন্তর্জাতিকভাবে আমাদেরকে হেয় করেছে।
“তো জনতার মধ্যে যে এরকম একটা টেন্ডেন্সি আছে, এটা কিন্তু অতীতের ঘটনা দেখলেও…ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, রামু- এসব জায়গার ঘটনা দেখলে বোঝা যায় যে, যখন এই তাণ্ডব ঘটেছে, সেখানে কিন্তু সব দলের লোক অংশগ্রহণ করেছে। মানে আওয়ামী লীগ আমলে যেটা হয়েছে, সেখানে দেখা গেছে যে ছাত্রলীগের উঠতি নেতা বা পান্ডা, তারা এর মধ্যে অংশগ্রহণ করেছেন।”
তিনি বলেন, “এই যে ‘কমিউনাল অ্যাটিটিউড’ বা সাম্প্রদায়িক একটা যে ঘৃণা, জিঘাংসা, এগুলো যতদূর সম্ভব দাবিয়ে রাখা যাবে, তত দিন পর্যন্ত এটা আমরা ঠিক রাখতে পারব। তবে এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, হুট করে হবে না। এটা পাশের দেশেও হচ্ছে, এই উপমহাদেশে হচ্ছে। পৃথিবীব্যাপী যদি দেখা যায়, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও হচ্ছে। অতএব এটা প্রিভেন্ট করতে হবে।
নুরুল হুদা মনে করেন, ওই মানসিকতা দূর করতে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপগুলো জরুরি; শিক্ষা জরুরি।
“এগুলো রাজনৈতিক ব্যাপার আরকি। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং খুব দৃঢ়ভাবে। এখানে কোনো শৈথিল্য দেখাবার কোনো অবকাশই নাই।”