১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ঈদের আনন্দ মেখে ঢাকায় ফিরছে তাবাসসুম-জায়ানরা

“আবার গরুর ঈদে যাব।”

ঈদের আনন্দ মেখে ঢাকায় ফিরছে তাবাসসুম-জায়ানরা
ছুটির একদিনও ‘নষ্ট’ করতে চায় না দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া তাবাসসুম।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Mar 2026, 06:34 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:15 PM

‘‘খুবই মজা হয়েছে। দাদু বাড়ি, নানু বাড়ি গিয়েছি।”

চাঁদপুরে ঈদের ছুটি কাটিয়ে মা-বাবার সঙ্গে ঢাকায় ফিরে বলছিল শিশু তাবাসসুম। বাসে পাঁচ ঘণ্টার যাত্রা শেষে ক্লান্ত শরীরে সায়েদাবাদ নামলেও তার চোখেমুখে এখনো আনন্দের ঝিলিক। 

রোজার ঈদের ছুটি সোমবার শেষ হলেও কর্মস্থলে ফেরেননি বিপুল সংখ্যক মানুষ। পরের দুদিন ছুটি নিয়ে অবকাশের সময় দীর্ঘ করেছেন অনেকেই। 

বৃহস্পতিবার স্বাধীনতা দিবস এবং পরের দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় রোববার থেকে পুরোদমে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মচাঞ্চল্য ফিরবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ছুটি আরেকদিন থাকতেই ঢাকায় ফিরলেন কেন, এ প্রশ্নের উত্তরে তাবাসসুমের মা আনোয়ারা খাতুন বললেন, ‘‘ওরা তো আরো থাকতে চায়। কিন্তু ওর বাবা তো বেসরকারি চাকরি করে। 

“ছুটি বাড়িয়ে নিয়েছে, আজকেও আনা হয়েছে জোড় করে।”

দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া তাবাসসুমের স্কুল খুলবে রোববার। সেই কারণে পুরো ছুটি কাটিয়ে শনিবার রাতে ঢাকায় ফিরতে চাইছিল সে।

গুলিস্তান ফ্লাইওভার থেকে সৃষ্ট যানজট ছড়িয়েছে ৬ কিলোমিটার দূরের শনির আখড়া পর্যন্ত। শুক্রবার বিকালে কাজলা ফুটওভার ব্রিজ থেকে তোলা

গুলিস্তান ফ্লাইওভার থেকে সৃষ্ট যানজট ছড়িয়েছে ৬ কিলোমিটার দূরের শনির আখড়া পর্যন্ত। শুক্রবার বিকালে কাজলা ফুটওভার ব্রিজ থেকে তোলা

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে জেলাগুলোর ঢাকায় প্রবেশের পথ যাত্রাবাড়ী-চিটাগং সড়কে শুক্রবার সকাল থেকেই অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ দেখা গেছে। গণপরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মাইক্রোবাসের চাপে যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারে ওঠার পথে সৃষ্টি করছে তীব্র যানজট।

তাবাসসুমের মতো গ্রামে ঈদের ছুটি কাটিয়ে এদিনই ঢাকায় ফিরেছে নুসরাত, মাসুদা আকতার ইলমা, জায়ান আব্দুল্লাহরা।

চতুর্থ শ্রেণি পড়ুয়া নুসরাত মায়ের সঙ্গে থাকে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে গ্রামের বাড়িতে থাকে। ঈদের ছুটি শেষ হলেও কিছুতেই বাবাকে ঢাকায় ফিরতে দিবে না।

উপায় না পেয়ে নুসরাতকে সঙ্গে নিয়েই ঢাকায় ফিরেছেন বাবা জামাল উদ্দিন। 

বাবাকে ঢাকা আসতে দেবে না; বাধ্য হয়ে নুসরাতকেই ঢাকায় আনলেন বাবা জামাল

বাবাকে ঢাকা আসতে দেবে না; বাধ্য হয়ে নুসরাতকেই ঢাকায় আনলেন বাবা জামাল

যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলের বাসিন্দা জামাল বললেন, “ও (নুসরাত) ঢাকা দেখবে। আমাকেও আসতে দিবে না তাকে ছাড়া। তাই নিয়ে আসলাম।”

জামালের শ্বশুর-শ্বাশুরি ঢাকায় থাকেন; স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামে গিয়েছিলেন।

নুসরাতের ক্লাস চালু হতে আরও সপ্তাহখানেক লাগবে। তখন পর্যন্ত সে তার নানা-নানির কাছে থাকবে।

জামাল উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘আমার অফিস খুলেছে গত সোমবারই। কী করব, আসতে পারছিলাম না। 

“কাইলকে (শনিবার) জয়েন করাই লাগবে। তাই ওকেও (নুসরাত) নিয়ে আসলাম। আগামী সপ্তাহে আবার গ্রামে দিয়ে আসতে যাব।”

ইট কাঠের ঢাকা ছেড়ে যেসব শিশু গ্রামে ঈদ করতে গিয়েছিল, নির্মল হাওয়া আর স্বজনদের সঙ্গে কাটানো তাদের আনন্দ এখনো অনুরণিত হচ্ছে।

বরিশালের বানারীপাড়া থেকে ঢাকায় ফেরার ছয় ঘণ্টার যাত্রায় পরিবারের সদস্যরা ক্লান্ত হলেও মাসুদা আকতার ইলমাকে উচ্ছ্বসিত দেখা গেল।

ঈদের আনন্দে উচ্ছ্বসিত ইলমা

ঈদের আনন্দে উচ্ছ্বসিত ইলমা

ঈদ কেমন হলো জিজ্ঞাসা করতেই দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া এ শিক্ষার্থী সলজ্জ হাসিতে বলল, “খুবই আনন্দ করেছি। খুব ভালো ঈদ হইছে। 

“আবার গরুর ঈদে (কুরবানির ঈদে) যাব।”

সায়েদাবাদ টার্মিনালে নেমেই জায়ান আব্দুল্লাহ বাস থেকে নামানো লাগেজগুলো সড়কের এক পাশে রাখতে শুরু করেছে।

এক ফাঁকে মায়ের কাছে জিজ্ঞাসা করলো, আগামী ঈদে ফের দাদাবাড়ি বরিশাল যাওয়া হবে কি না?

হ্যাঁ সূচক উত্তর শুনে লাফিয়ে উঠে বলল, “আবার যামু”।

গ্রামে গিয়ে ‘যামু’ বলতে শিখেছে জায়ান আব্দুল্লাহ

গ্রামে গিয়ে ‘যামু’ বলতে শিখেছে জায়ান আব্দুল্লাহ

ঢাকায় পঞ্চম শ্রেণিতে লেখাপড়া করা জায়ান এ কয়দিন গ্রামে থেকে কয়েকটি আঞ্চলিক শব্দ আয়ত্ত করে ফেলেছে; তার মধ্যে ‘যামু’ একটি।

তার এই ‘যামু’ শব্দে হতকচিত মা হেসেই বললেন, “যাব তো কি হয়েছে। তাড়াতাড়ি রাস্তা পার হব। ব্যাগগুলো দেখিও।”

আলাপচারিতায় জায়ান আব্দুল্লাহ বলল, গ্রামের বাড়িতে দাদা-দাদি আছে, নানি আছে। 

“তাই মজা বেশি হয়েছে বাড়িতে। বাড়ি গেলে আত্মীয়রা আদর করে; খেলা যায়, ঘোরা যায়।“

যাতায়াতে ঝক্কি পোহাতে হলেও ঈদে গ্রামে যাওয়ার পক্ষে জলিল

যাতায়াতে ঝক্কি পোহাতে হলেও ঈদে গ্রামে যাওয়ার পক্ষে জলিল

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বানারীপাড়া থেকে ঢাকায় নেমেই বাসায় যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন আব্দুল জলিল।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বললেন, ‘‘ঢাকায় তো কোনো আত্মীয় নাই। ঈদের সময়ে গ্রামে গেলে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। বাড়ির খোঁজ খবর নেওয়া যায়। 

“আমাদের তো বয়স শেষ, ছেলে-মেয়েদের জন্য বাড়ি যাওয়া। ওরাও বাড়ি চিনুক, না চিনলে তো জমি-জমাও খুঁজে পাবে না। তাই কষ্ট হলেও বাড়ি যাই ঈদ করতে।’’

ফিরতেও দ্বিগুণ ভাড়া

যশোরের ঝিকরগাছার নাভারণে ঈদের ছুটি কাটিয়ে শিশুসন্তানকে নিয়ে এদিন ঢাকায় ফেরেন তরুণ কর্মজীবী ফাতেমা আকতার। ফেরার সময়ে ৬৫০-৭০০ টাকার টিকেট কাটতে তাকে গুনতে হয়েছে এক হাজার টাকা।

লম্বা অবকাশে শেষে শুক্রবার ঢাকা ফিরছেন অনেকেই।

লম্বা অবকাশে শেষে শুক্রবার ঢাকা ফিরছেন অনেকেই।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে ফাতেমা বললেন, ‘‘যাওয়ার সময়েও বেশি ভাড়া নিল। এখন তো রেগুলার ভাড়া হওয়ার কথা। 

“এক হাজার টাকাই নিল। কী আর করার, উপায় তো নাই। বেশি ভাড়া দিয়েই আসলাম।”

বানারীপাড়া থেকে বরিশালের ভাড়া ৬০০ টাকা হলেও বাড়তি দুইশ টাকা দিতে হয়েছে আব্দুল জলিলকে। তেবে তাতে খেদ নেই তার মনে।

 ‘‘ঈদের সময়ে তো বেশি নেওয়াটা নিয়ম হয়ে গেছে। আমরাও নিয়মে বন্দি,” বলছিলেন জলিল।

ঢাকামুখী যাত্রীরা বলছেন, ফিরতি যাত্রায়ও বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়েছে।

ঢাকামুখী যাত্রীরা বলছেন, ফিরতি যাত্রায়ও বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়েছে।

পটুয়াখালী থেকে আসা নাসির হোসেন তার অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন, ‘‘দুর্ভোগ তো একটু থাকবে। তবে ভাড়াও দ্বিগুণের মত নিয়েছে। ফ্যামিলি দেখলে ছোটো বাচ্চারও টিকেট কাটতে বলে।

“ঈদের সময়ে কষ্ট তো থাকবে। রাস্তায় যানজট হয়েছে। তার পরও বলবো ঈদ ভালো হয়েছে। ভাড়ার বিষয়টা সরকার দেখলে ভালো হতো।“