ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘অচলাবস্থা’, কী সমীকরণ ভারত, ইরান, গাজার?
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে কোনও পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনের পর রাজনীতিতে গভীর অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। কারণ, ১২০ আসনের নেসেটে (পার্লামেন্ট) সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন কোনো পক্ষই পায়নি।
চূড়ান্ত ফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট ৫৩টি আসন এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধী জোট ৪৮টি আসন পেয়েছে। বাকি ১৯টি আসন পেয়েছে আরব দলগুলো।
এখন কে ক্ষমতায় আসবে এবং ক্ষমতায় আসার অঙ্ক কী হবে তা নিয়ে নানা জল্পনা চলছে। কোনও রাজনৈতিক জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আপাতত তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কথা।
ফলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা না কাটা পর্যন্ত অথবা প্রয়োজন হলে আগামী বছর পুনরায় নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বহাল থাকবেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলেও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেতানিয়াহুর থাকবে।
সরকার গঠন বা স্থায়ী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আরও কয়েক সপ্তাহ বা মাসব্যাপী আলোচনা চলতে পারে।
সামনে কী কী ঘটতে পারে, তার সম্ভাব্য চারটি দৃশ্যপট আছে। সেগুলো হল- বিরোধী জোটের সরকার কিংবা জাতীয় ঐক্যের সরকার হওয়া।
তৃতীয় বিকল্প হিসাবে দলত্যাগী আইনপ্রণেতাদের নিয়ে নেতানিয়াহুর সরকার গড়ার চেষ্টা কিংবা চতুর্থত: ফের নির্বাচন ও দীর্ঘ টানাপোড়েন।
এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অমীমাংসিত নির্বাচনের প্রভাব কেবল ইসরায়েলের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বরাজনীতিতে বড় ধরনের সমীকরণ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ভারত, ইরান এবং গাজা পরিস্থিতিতে এর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা বিশ্লেষণ করে দেখার চেষ্টা করেছে ভারতীয় পত্রিকা এনডিটিভি।
ইরান-গাজা এবং বৃহত্তর অঞ্চল:
সময়টা খুবই অস্বস্তিকর বা প্রতিকূল। ইসরায়েল এখনও ইরানের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত, গাজার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, লেবানন এখনও উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং পশ্চিম তীর অশান্ত হয়ে উঠছে।
প্রধানমন্ত্রী বদলে গেলেও ইসরায়েলের মূল নীতি বদলাবে না। সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট ইরান এবং ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাসের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থানেই আছেন। তিনি ফিলিস্তিনকে আলাদা রাষ্ট্র বানানোরও বিরোধী।
নেতানিয়াহু এবং আইজেনকোট দুজনই হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং তাদের শাসন নির্মূল করার ব্যাপারে একমত।
ফলে নতুন প্রধানমন্ত্রী যেই হোন না কেন, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে। তবে আইজেনকোট ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ধরণ এবং পশ্চিম তীরে উগ্র ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা দমনের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা দেখা যেতে পারে।
তাছাড়া, নেতানিয়াহুর সঙ্গে আইজেনকোটের মতপার্থক্য রয়েছে অভ্যন্তরীন কিছু বিষয়ে। যেমন: সরকার পরিচালনা পদ্ধতি, জোট গঠনের শর্তাবলি এবং অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার মতো বিষয়গুলোতে।
সেটুকু বাদ দিলে ইসরায়েলের মসনদে পরিবর্তন তেমন বড় কোনও বদল আনতে পারবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
ওদিকে, ইরানের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যদি তেহরানের বিরুদ্ধে কোনও বড় সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেন, তবে নেতানিয়াহু বা আইজেনকোট—যিনিই ক্ষমতায় থাকুন না কেন, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই থাকবে।
আবার নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সামরিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি ঘোরাতে বা দলগুলোকে একটি ‘জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকার’ গঠনে বাধ্য করতে নেতানিয়াহু ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার পথ বেছে নিতে পারেন।
এর ফলে পাল্টা জবাব এবং যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হওয়ার পট প্রস্তুত হতে পারে। ইরান যে জবাবই দিক না কেন তা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো, নৌযান চলাচল পথ এবং তেলের দামে আঘাত হানতে পারে; আর যেসব দেশ জ্বালানি আমদানি করে তারা এর প্রভাব খুব দ্রুতই টের পাবে।
ভারত সমীকরণ:
ভারতের জন্য ইসরায়েলের এই নির্বাচন খুবই সংবেদনশীল। কারণ, ভারত সম্প্রতি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ককে বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ দিয়েছে।
ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক কেবল অস্ত্র কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর পরিধি এখন যৌথ উৎপাদন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি, মহাকাশ গবেষণা এবং বাণিজ্যের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত।
গত ফেব্রুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ইজরায়েল সফর এই সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মোদী এবং নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুবই ভাল।
এই সম্পর্ক কেবল তাদের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের উপরে নির্ভরশীল নয়। প্রতিরক্ষা চুক্তি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং গবেষণা প্রকল্পগুলো বহু বছর ধরেই গড়ে উঠেছে।
ফলে ইসরায়েলে আইজেনকোট বা অন্য কেউ ক্ষমতায় এলেও ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন কোনও সমীকরণ তৈরি হবে না এবং এই উদ্যোগগুলোতেও বড় কোনও পরিবর্তন আসবে না।
তবে ভারতকে একই সঙ্গে দুটি পথে চলতে হবে। একদিকে, ইসরায়েলের সঙ্গে অংশীদারিত্ব আরও গভীর করা, অন্যদিকে আরব দেশগুলো ও ইরানের সঙ্গেও আলোচনার পথ খোলা রাখা।
কারণ,ইসরায়েলের অচলাবস্থার কারণে যদি ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ বেধে যায়, তবে তা পারস্য উপসাগরের জ্বালানি অবকাঠামো এবং হরমুজ প্রণালির নৌ-বাণিজ্যকে হুমকিতে ফেলবে। ফলে তেলের দাম বেড়ে গেলে ভারতের অর্থনীতি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
