Published : 13 Jul 2026, 10:38 PM
ভারতে পিটিয়ে হত্যার অপরাধে ১৪ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পর এক মুসলিম নারী বিচারক তীব্র অনলাইন হেনস্থার পাশাপাশি ধর্ষণের হুমকি ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়েছেন।
গত ১২ জুন ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান ওই ১৪ জনকে হত্যা, হত্যার চেষ্টা, দাঙ্গা ও অবৈধভাবে পথরোধসহ বিভিন্ন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেন।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৫০ বছর বয়সী নাজির আহমদ নামের এক ব্যক্তি রাতে গবাদিপশু পরিবহনের সময় লাঠিসোঁটা ও রডধারী একদল ‘গো-রক্ষক’ বা গরু রক্ষাকারীর হামলার শিকার হন।
গরু পাচারের সন্দেহে তারা নাজির ও তার দুই সঙ্গীকে গাড়ি থেকে টেনে বের করে নির্মমভাবে মারধর করে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাজির মারা যান, তবে তার দুই সঙ্গী বেঁচে যান এবং আদালতে ঘটনার সাক্ষ্য দেন।
বিচারক তাবাসসুম খান তার রায়ে এ ঘটনাকে স্পষ্ট ‘মব লিঞ্চিং’ বা পিটিয়ে হত্যার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু এই রায়ের পর থেকেই ধর্মীয় বিদ্বেষের শিকার হচ্ছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মুসলিম পরিচয়কে সামনে এনে কট্টর হিন্দুত্ববাদী ইনফ্লুয়েন্সাররা তাকে গালিগালাজ করাসহ বিভিন্ন হুমকি দিচ্ছে।
এমনকি একটি ভিডিওতে ১০ দিনের মধ্যে দণ্ডিতদের মুক্তি না দিলে দেশজুড়ে ‘রক্তগঙ্গা’ বইয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। কট্টরপন্থি হিন্দি নিউজ চ্যানেল ‘সুদর্শন নিউজ’-এর এক উপস্থাপকও দণ্ডিতদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে দর্শকদের ‘প্রতিবাদ’ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এছাড়া পাঞ্জাবে কট্টরপন্থি দলগুলো বিক্ষোভ করে ওই নারী বিচারকের কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে এবং উত্তর প্রদেশে দণ্ডিতদের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে।
এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মার্কন্ডেয় কাটজু লিখেছেন, বিচারকের রায়কে আইনি যুক্তিতে মূল্যায়ন না করে তার ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে বিচার ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার বিপজ্জনক চেষ্টা চলছে।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনও (এসসিবিএ) এই হুমকির নিন্দা জানিয়ে বিচারকদের নির্ভয়ে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে।
ওদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে লিগ্যাল নিউজ ওয়েবসাইট ‘লাইভ ল’-এ লিখেছেন, ২০২৪ সালে মুম্বাই হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি গৌতম প্যাটেল একটি মামলার রায়ের পর হুমকির মুখে পড়লে আদালত মহারাষ্ট্র সরকারকে তার নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ দিয়েছিল।
একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি যদি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পান, তবে জেলা আদালতের একজন কর্মরত বিচারকও একই নিরাপত্তা পাওয়ার যোগ্য। বিচারকের পদ বা ধর্ম দেখে এই নীতি বদলানো উচিত নয়।
এদিকে স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় ইতিমধ্যে মামলা দায়ের করে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং উস্কানিমূলক ভিডিও রটনাকারীদের শনাক্ত করতে সাইবার সেল কাজ করছে।
মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টও ওই নারী বিচারকের নিরাপত্তা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চেয়েছে।