Published : 12 Jul 2026, 11:15 AM
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেহরান জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার পর ইরানে ফের হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ জলপথ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
জাহাজে হামলার ব্যাখ্যায় আইআরজিসি বলেছে, ‘আইন লঙ্ঘনকারী’ জাহাজটি তার সিস্টেম বন্ধ করে দিয়ে এবং অনুমোদিত রুট থেকে সরে যাওয়ার পর সেটির ওপর হামলা চালানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি নামের সাইপ্রাসের পতাকাবাহী জাহাজটিতে আইআরজিসি ‘নির্লজ্জভাবে হামলা’ চালানোর পর ‘চলতি সপ্তাহে তৃতীয় দফা হামলা’ চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
তেলবাহী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জেরে চলতি সপ্তাহের শুরুতে তেহরানে নতুন করে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। তাতে ১৭ জন নিহত এবং ১১৫ জন আহত হন বলে ইরানের ভাষ্য।
এর জবাবে ইরানও প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
সেন্টকম বলছে, ইরানি হামলায় ইঞ্জিন রুমের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হওয়ায় এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি ‘যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারেনি। জাহাজের একজন বেসামরিক ক্রু নিখোঁজ রয়েছেন।
তবে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) বলেছে, সেই ক্রু একটি লাইফবোটে ছিলেন।

এক্সে প্রকাশিত বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, এর আগে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় দায় নেওয়ার পরও ইরানকে সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুত রক্ষার সুযোগ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সেটি রক্ষা করতে পারেনি।
এ বিবৃতি শেয়ার করে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ লিখেছেন, “ইরান বাজে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তাদের মূল্য দিতে হবে।”
রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম লিখেছে, অননুমোদিত পথ দিয়ে যাতায়াতের চেষ্টার সময় একটি জাহাজে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার পর ইরান পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে।
আইআরজিসি বলেছে, এই প্রণালি বন্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ‘আগ্রাসন’ চালালে তার জবাব ‘কঠোরভাবে’ দেওয়া হবে এবং অঞ্চলের নতুন ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করা হবে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওমানি জলসীমা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত পথ পার হওয়ার চেষ্টা করলে তিনটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়। ইরান বরাবর বলে আসছে, তাদের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাওয়া পথই একমাত্র ‘নিরাপদ’ পথ।
ওই উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের এই হামলার অর্থ হল ‘যুদ্ধবিরতি শেষ’। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন।
তবে এর পরও আলোচনা চলবে জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরান মার্কিন কর্মকর্তাদের বলেছে, ট্যাংকারগুলোতে হামলা চালানো ‘ভুল ছিল’ এবং এর জন্য তারা নিজেদের ‘বিপথগামী’ একটি গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যম দাবি জানিয়েছেন যে, ইরানকে জনসম্মুখে ঘোষণা করতে হবে—গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।

বিবিসি লিখেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতাবা খামেনির নেতৃত্ব গ্রহণের পর জনসম্মুখে দেওয়া প্রথম বিবৃতিতে প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বানের পর এই প্রণালি বন্ধের ঘটনা ঘটল।
তার বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রথম দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি বিমান হামলায় নিহত হন। গত শুক্রবার তাকে তার নিজ শহর মাশহাদে দাফন করা হয়।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে মুজতাবা বলেন, এর প্রতিশোধ নেওয়াই ‘জাতির আকাঙ্ক্ষা’।
তিনি বলেন, “আমরা এই দুই যুদ্ধের অপরাধী ও কলঙ্কিত খুনিদের বিরুদ্ধে শহীদ নেতা এবং সব শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করছি।”
সর্বোচ্চ নেতা বলেন, “বিষয়টি আমার অস্তিত্ব বা অন্য কর্মকর্তাদের অস্তিত্বের ওপর নির্ভর করছে না। এটা ঘটবেই।”
খামেনির সপ্তাহব্যাপী অন্ত্যিষ্টিক্রিয়ায় বহু ইরানি ডনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান জানিয়ে প্ল্যাকার্ড বহন করেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প শনিবার হুঁশিয়ার দেন, এ ধরনের যে কোনো পরিকল্পনার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ‘সব এলাকা ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন’ করে দেবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো চলতি সপ্তাহে খবর দেয়, ইরান সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে হত্যার একটি পরিকল্পনা তৈরি করে বলে ওয়াশিংটনকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছে ইসরায়েল।
তবে ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প। নিউ ইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের হত্যা তালিকার তালিকার ‘১ নম্বরে’ রয়েছেন।