Published : 19 Jun 2026, 11:50 PM
দিনটি ঐতিহাসিক হতে পারত। এদিন একজন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ইরানের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকের একই স্থানে হাজির হওয়ার কথা ছিল, যা গেল ৪৭ বছরে ছিল অনেকটাই অকল্পনীয়।
শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে তাদের একটি নথিতে সই করার কথা ছিল, যা চলমান ইরান যুদ্ধের ইতি টানার একটা সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
কিন্তু এখন সুইজারল্যান্ডে কোনো দেশের প্রতিনিধি দলই নেই। চুক্তি সই হওয়ার পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠানই শুধু বাতিল হয়নি, স্থগিত হয়ে গেছে শান্তি আলোচনার পরবর্তী ধাপের প্রথম দফার কারিগরি আলোচনাও। দুই দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি হওয়ার ক্ষেত্রে এই আলোচনা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারকের কালি শুকানোর সঙ্গে সঙ্গেই এই কারিগরি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, গত কয়েক দিনের মধ্যে শান্তি আলোচনা নিয়ে কোনো না কোনো জটিলতা তৈরি হয়েছে।
বুধবার ফ্রান্সে বসে চুক্তিতে সই হয়ে যাওয়ার কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এর কিছু সময় পর একই ধরনের ঘোষণা আসে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের তরফেও।
দূরে বসে তাদের এই চুক্তি সইয়ের ঘোষণায় অনেকের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, শুক্রবার সশরীরে চুক্তি সইয়ের আনুষ্ঠানিকতার আদৌ কোনো দরকার আছে কিনা?
এরমধ্যে হোয়াইট হাউজের একজন মুখপাত্র বৃহস্পতিবার রাতে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ডের লুসার্নে যাচ্ছেন না।
এর কিছুক্ষণ পরই সুইজারল্যান্ডের আয়োজকরা জানান, আলোচনা স্থগিত হয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার রাতে স্থগিতের ঘোষণা আসার আগ পর্যন্ত হোয়াইট হাউজে দায়িত্বরত সাংবাদিকরা মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে ভ্যান্সের যাত্রার অপেক্ষায় ছিলেন।
সিএনএন লিখেছে, সব মিলিয়ে যা বোঝা যাচ্ছে, এই শান্তি প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপও প্রথম ধাপের মতোই জটিল ও অনিশ্চিত হতে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার রাতভর ইরানের পক্ষ থেকে যেসব বার্তা এসেছে, তাতেও স্পষ্ট হয়েছে যে, ট্রাম্পের উদ্দেশ্য নিয়ে তেহরানের মধ্যে এখনো গভীর সন্দেহ রয়ে গেছে।
শীর্ষ উপদেষ্টাদের তিনি চুক্তিতে সই করার অনুমোদন দিলেও রাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতাবা খামেনি বলেন, "নীতিগতভাবে আমার মত ভিন্ন ছিল।"
এরপর প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেন, অন্য পক্ষ যদি অসৎ উদ্দেশ্য দেখায়, চুক্তি ভঙ্গ করে বা অতিরিক্ত দাবি তোলে, তাহলে ইরান ‘তছনছ করে দেওয়ার মতো জবাব দেবে’।
এরপর ইরানের প্রভাবশালী সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের তরফে বার্তা আসে, চুক্তি লঙ্ঘন করা হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার পরিকল্পনা তারা প্রস্তুত করেই রেখেছে।
এর অর্থ হলো, যুদ্ধ শুরুর সময়কার মতো এখনও ইরানের সামরিক বাহিনীর কাছে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর একটি তালিকা আছে, প্রয়োজন পড়লে যেটা ধরে তারা হামলা চালাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের অনাস্থা নতুন নয়। কারণ, গেল বছর এবং চলতি বছর— দুবারই ইরানে বোমা ফেলা হয়েছে আলোচনা চলার মধ্যে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বার্তার দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, চুক্তিবিরোধী কট্টর ইরানিদের শান্ত রাখা। দ্বিতীয়ত, ওয়াশিংটনকে এটা মনে করিয়ে দেওয়া যে, শান্তি আলোচনা যেকোনো সময়ই ভেস্তে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি এ বার্তার প্রাপক যে ইসরায়েলেও, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।
কারণ সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, "লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে।"
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াই এখনো চলছে।

লেবাননের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলেছে, শুধু শুক্রবারই ইসরায়েলি হামলায় এক ডজনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
অব্যাহত হামলার মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা, এমনকি ভ্যান্সও প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সমালোচনা করছেন।
তেহরান লিখিত চুক্তিকে বরাবরই গুরুত্ব দেয়। তারা চায়, চুক্তি হুবহু বাস্তবায়ন করা হোক। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্নই মনে হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার ভ্যান্স বলেন, "আমরা কথায় বিশ্বাস করি না, আমরা কাজে বিশ্বাস করি।"
একই সঙ্গে তিনি জানান, সমঝোতা স্মারকে যা লেখা আছে, তার বাইরেও কিছু ‘গোপন সমঝোতা’ রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলা শুরু করে। এতে মৃত্যু হয় প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের। নিহতের তালিকায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও আছেন।
পাল্টা হামলায় ইসরায়েলসহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে নিশানা বানায় ইরান।
জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় এক ডজন দেশে হামলা চালায় তারা।
এ যুদ্ধে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি স্থবির হয়ে পড়ে পশ্চিম এশিয়ার বিমান পরিবহন ব্যবস্থা; হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে।
যুদ্ধের ৪০ দিনের মাথায় গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় দুই দেশ। সেই দুই সপ্তাহ শেষ হওয়ার ঘণ্টা কয়েক আগে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প।
এরমধ্যে সম্প্রতি ১৪ দফার সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা জানায় দুই দেশ, যেটা শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল।
এই ১৪ দফায় পৌঁছাতে কয়েক মাস লেগেছে দুই পক্ষের। কিন্তু পরবর্তী কারিগরি আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো আরও জটিল বিষয় রয়েছে। ফলে এই ধাপ যে আরও কঠিন হবে, তা অনেকটাই নিশ্চিত।
পরবর্তী আলোচনা কবে শুরু হবে, কিংবা পরিকল্পনা হবে কিনা, সেটা নিয়ে অস্পষ্টতা থেকেই গেছে।
আরো পড়ুন
সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা বাতিল, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে শঙ্কা