Published : 16 Aug 2025, 11:40 AM
সারা বিশ্বের চোখ ছিল এ বৈঠকে। কারও আশা ছিল, আসবে ইউক্রেইন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা। বিশ্বের শীর্ষ দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের দুই প্রেসিডেন্ট কিইভের ওপর ‘অন্যায্য’ চুক্তি বা শর্ত চাপিয়ে দিতে পারেন, এমন শঙ্কাও ছিল অনেকের।
শেষ পর্যন্ত কিছুই হল না। দীর্ঘমেয়াদী, মাঝারি বা স্বল্প, ইউক্রেইনে কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতির চুক্তি ছাড়াই আলাস্কার অ্যাঙ্করেজে এলমেনডর্ফ-রিচার্ডসন সামরিক ঘাঁটি ছেড়েছেন ভ্লাদিমির পুতিন ও ডনাল্ড ট্রাম্প।
শুক্রবার প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠক শেষে দুই নেতা যৌথ সংবাদ সম্মেলন করলেও কেউই সাংবাদিকদের প্রশ্ন নেননি।
তাহলে এই ‘হাই-প্রোফাইল’ বৈঠকের ফলাফল কী মোটাদাগে ‘শূন্য’? ট্রাম্প, পুতিন কিংবা ইউক্রেইন, বৈঠক থেকে কে কী পেল? অ্যাঙ্করেজে যাওয়া বিবিসির তিন সাংবাদিক খুঁজেছেন তার উত্তর।
‘চুক্তিকারী’, ‘শান্তির দূত’ ট্রাম্পের সুনামে চিড়
“চুক্তি তখনই হবে যখন সমঝোতা হবে,” অ্যাঙ্করেজে বৈঠক পরবর্তী মন্তব্যের শুরুতেই এমনটা বলেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
কয়েক ঘণ্টার বৈঠক থেকেও যে চুক্তি, যুদ্ধবিরতি বা বলার মতো কোনো অর্জন নেই, এটা তার এক ধরনের স্বীকারোক্তি-ই।
ট্রাম্প বলছেন, তার ও পুতিনের মধ্যে কিছু বিষয়ে ‘ব্যাপক অগ্রগতি’ হয়েছে, তবে সেটা যে কী তার কোনো ইঙ্গিতই দেননি, স্বভাবসুলভভাবে বিশ্বকে এক ধরনের ধন্দে রেখেছেন।
“আমরা (সমঝোতায়) পৌঁছাতে পারিনি,” উপস্থিত শত শত সাংবাদিকের কারও কাছ থেকে কোনো প্রশ্ন না নিয়ে নীল প্রচ্ছদপটে ‘শান্তির সন্ধানে’ লেখা সংবাদ সম্মেলন কক্ষ ছেড়ে যাওয়ার আগে এমনটাই বলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত এমন কিছুই যে বলবেন, সেই লক্ষ্য সম্ভবত ছিল না তার। এ জন্য এতটা দূর পাড়ি দিয়ে আলাস্কা যাওয়ারও কথা নয় মার্কিন প্রেসিডেন্টের।
তবে ভবিষ্যৎ আলোচনাকে খর্ব করতে পারে, ট্রাম্প একতরফাভাবে এমন কোনো ছাড় বা চুক্তি না করায় তার ইউরোপীয় মিত্র এবং কিইভের কর্মকর্তারা হয়তো এমন ফলে স্বস্তিই পাচ্ছেন।
কিন্তু যে লোক নিজেকে ‘পিসমেকার’, ‘ডিলমেকার’ বলতে ভালোবাসেন, তাকে যে ঝুলিতে ‘শান্তি’ বা ‘চুক্তি’, দুটির কোনোটি নেওয়া ছাড়াই আলাস্কা ছাড়তে হল!
পুতিন হালকা স্বরে ‘পরেরবার মস্কোতে’ বলেলেও ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সঙ্গে নিয়ে পরবর্তী একটি শীর্ষ সম্মেলন হচ্ছেই, এমন আভাসও শুক্রবার পাওয়া যায়নি।
অবশ্য আলাস্কার এ বৈঠক থেকে রাশিয়া বা ইউক্রেইনের তুলনায় ট্রাম্পের প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা এমনিতেই ছিল কম। আগেই তিনি বলেছিলেন, বৈঠকটি ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ২৫%।
সে বিচারে শেষ পর্যন্ত এটি তার সুনামে চিড় ধরাল বলে মনে করছেন বিবিসির উত্তর আমেরিকা প্রতিনিধি অ্যান্থনি জার্চার।
বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনের শুরুটাও ছিল ‘অন্যরকম’। সংবাদ সম্মেলন শুরুই করেন পুতিন, বেশ খানিকক্ষণ কথা বলেন তিনি, এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে পাশে নীরবে দাঁড়িয়েই থাকতে হয়েছে।
ওভাল অফিসে ট্রাম্পের আগের বৈঠকগুলোর ক্ষেত্রে এমনটি দেখা যায়নি। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেখা যেত কথা দিয়ে অপর নেতাকে ‘ঠেসে ধরতে’, যার ধাক্কায় বিদেশি সেই রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানকে নিরুত্তর চেয়ে থাকতে হতো।
জার্চার বলছেন, আলাস্কা যদিও মার্কিন ভূখণ্ডের অধীনে, তারপরও পুতিন এতটাই স্বচ্ছন্দ ছিলেন যে তাকে মনে হয়েছে- ঘরেরই ছেলে। গত শতকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার আগে এটি যে ‘রাশিয়ান আমেরিকা’ ছিল তা বলতে এখনও ভালোবাসেন অনেক রুশ কর্মকর্তা।
“এটা হয়তো সামনের দিনগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ভেতরে ভেতরে পোড়াবে, এমনকি সংবাদ সম্মেলনও, যা শীর্ষ সম্মেলনকে ব্যর্থ হিসেবেই হাজির করেছে,” বলেছেন বিবিসির এ উত্তর আমেরিকা প্রতিনিধি।
তার মতে, এখন সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটা হাজির হবে, শুক্রবার আলাস্কায় যে প্রশ্নটি করতে পারেননি সাংবাদিকরা, সেটি হল- যুদ্ধবিরতি না হওয়ায় সাজা হিসেবে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে হুমকি ট্রাম্প গত কয়েকদিন ধরে দিয়ে গেছেন, তা কি তিনি বাস্তবায়ন করবেন?
“আলাস্কা ছেড়ে যাওয়ার আগে ফক্স নিউজের সঙ্গে এক বন্ধুত্বপূর্ণ কথোপকথনে ট্রাম্প এর আংশিক উত্তর দিয়েছেন। বলেছেন, এ ধরনের পদক্ষেপের (নিষেধাজ্ঞা) বিষয়টি তিনি দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে ভাববেন।
“কিন্তু প্রেসিডেন্টের প্রতিশ্রুতি ছিল ‘গুরুতর পরিণতির’, এখন এ ধরনের অস্পষ্ট উত্তর হয়তো আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দেবে,” বলেছেন জার্চার।
বিশ্বমঞ্চে ‘রাজসিক প্রত্যাবর্তন’ পুতিনের
‘সংবাদ সম্মেলন’ কখন সংবাদ সম্মেলন হয় না? যখন কোনো প্রশ্ন হয় না।
প্রেসিডেন্ট পুতিন ও ট্রাম্প যখন কেবল নিজের নিজের কথা বলে, কোনো প্রশ্ন না নিয়েই মঞ্চ ছেড়ে যান তখন হলরুমের প্রায় সবাই অবাক হয়ে পড়ে বলে জানান বিবিসির রাশিয়া এডিটর স্টিভ রোজেনবার্গ।
রুশ প্রতিনিধিদলের সদস্যরাও দ্রুতগতিতে কক্ষ ত্যাগ করেন, তাদের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়েই।
ইউক্রেইনে যুদ্ধ নিয়ে পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যে যে এখনও বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে, এগুলোকে তার স্পষ্ট লক্ষণ হিসেবে দেখছেন রোজেনবার্গ।
“রাশিয়ার কাছে যুদ্ধবিররতি চাইলেন ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন দিলেন না,” বলেছেন তিনি।
অথচ দিনের শুরুতে পরিস্থিতি ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। অ্যাঙ্করেজের বিমানঘাঁটিতে পুতিনকে লাল গালিচায় স্বাগত জানানো হয়, ট্রাম্প তার অতিথিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। রুশ প্রেসিডেন্টের প্রতি সম্মান জানিয়ে আকাশে উড়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমান।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রের নেতার সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রে নিজের জন্য স্পটলাইট আদায় করে নিলেন সাবেক এ কেজিবি কর্মকর্তা।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেইনে রাশিয়ার ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরুর পর কিইভের মিত্র পশ্চিমা দেশগুলো তাকে ‘একঘরে’ করা, ‘রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন’ করে ফেলার সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই করেছিল। মস্কোর ওপর দেওয়া হয় শত শত নিষেধাজ্ঞা। তার মিত্র হিসেবে পরিচিত দেশগুলোকেও চেপে ধরা হয়।
সেগুলো যে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে, তা দেখানোর জন্য পুতিন এর চেয়ে আর বড় কোন মঞ্চ পেতেন?
ইউক্রেইনের জন্য ‘আপাত স্বস্তি’, সঙ্গে ভয়ও
বিবিসি মনিটরিংয়ের রাশিয়া এডিটর ভিতালি শেভচেঙ্কো বলছেন, অনেকের কাছে ট্রাম্প-পুতিন শীর্ষ সম্মেলনের এমন ফল অপ্রত্যাশিত হলেও কিইভ আপাতত স্বস্তিতে আছে। কেননা, দুই নেতার বৈঠক থেকে অন্তত এমন কোনো চুক্তির ঘোষণা আসেনি, যার চাপে তাদের কিছু না কিছু ভূখণ্ড ছাড়তে হবে।
তবে কোনো চুক্তি হলেও সেটা যে কার্যকর হতোই তা নিয়ে তো শঙ্কা রয়েছেই। এর আগে রাশিয়া-ইউক্রেইন মিনস্ক চুক্তিগুলোও শেষ পর্যন্ত টেকেনি। সে কারণে অ্যাঙ্করিজে কিছু হলেও সেটা যে টেকসই হবেই তা নিয়ে সন্দেহ তো থাকবেই।
কিন্তু ইউক্রেইনের জন্য আশঙ্কারও অনেক কারণ আছে। কারণ যৌথ সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের সামনে পুতিন ফের ইউক্রেইন সংঘাতের ‘মূল কারণগুলোর’ প্রসঙ্গ টেনেছেন এবং বলেছেন, এগুলো দূর না হলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়।
ক্রেমলিনের এ কথার অনুবাদ দাঁড়াচ্ছে, পুতিন এখনও তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি, সাড়ে তিন বছর আগে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরুর সময় তিনি যেসব লক্ষ্যের কথা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন। যার মধ্যে আছে- ইউক্রেইনের সামরিক বাহিনীর আকার ছোট করা, নেটো জোটে যোগ দিতে না পারা, ইউক্রেইনের রুশ ভাষাভাষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাসহ বেশ কিছু শর্ত।
সঙ্গে এও পরিষ্কার যে- ইউক্রেইন থেকে সেনা সরাতে মস্কো রাজি নয় এবং ক্রাইমিয়াসহ যে যে এলাকা তারা দখলে নিয়েছে, সেখানেও তারা ছাড় দেবে না।
সংঘাতের শুরু থেকেই পশ্চিমা দেশগুলো নানান হুমকি, চাপ দিয়েও রাশিয়ার নেতাকে বিন্দুমাত্র দমাতে পারেনি। এই তালিকায় এবার অ্যাঙ্করেজের বৈঠকও যুক্ত হল।
“বৈঠকের পর এখন যে অনিশ্চয়তার উদ্ভব হয়েছে, সেটাও উদ্বেগজনক। এরপর কী হবে? রাশিয়ার হামলা কী নির্বিঘ্নে চলতেই থাকবে?,” জিজ্ঞাসা শেভচেঙ্কোর।
পশ্চিমা দেশগুলো গত কয়েক মাসে কত কত সময়সীমা বেঁধে দিল, কত হুমকি-ধামকি দিল, কিছুতেই কাজ হয়নি।
“এগুলোর মাধ্যমে পুতিনকে মূলত আক্রমণ অব্যাহত রাখার আমন্ত্রণই জানানো হয় বলে মনে করছেন ইউক্রেইনীয়রা। তারা অ্যাঙ্করেজের বৈঠককেও একই দৃষ্টিতে দেখতে পারেন,” বলেছেন বিবিসির এ সাংবাদিক।