Published : 03 Feb 2025, 09:45 PM
যেসব সামুদ্রিক খাবার মানুষ খায়, তাতে ব্যাপক মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ধরা পড়েছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। সামুদ্রিক খাবারের নমুনার ৯৯ শতাংশেই এ দূষণ পাওয়া গেছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য এক ক্রমবর্ধমান হুমকি।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অরেগন রাজ্যে পোর্টল্যান্ড স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের (পিএসইউ) অ্যাপলাইড কোস্টাল ইকোলোজি ল্যাবের বিজ্ঞানীরা।
পিয়ার-পর্যালোচিত এই গবেষণায় সামুদ্রিক খাবারের ১৮২টি নমুনার মধ্যে ৯৯%, অর্থাৎ ১৮০টি নমুনাতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।
এসব নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে দোকানের কেনা খাবার কিংবা অরেগনের মাছ ধরার নৌকা থেকে। গবেষণায় সবচেয়ে বেশি মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে চিংড়িতে।
গবেষকরা আরও জানান, নমুনাগুলোতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সবচেয়ে সাধারন ধরণ পোশাক বা টেক্সটাইল থেকে আসা ফাইবারও তারা শনাক্ত করেছেন। এই ক্ষুদ্র কণাগুলোর উপস্থিতি দেখা গেছে ৮০ শতাংশেরও বেশি।
পোর্টল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটির মাইক্রোপ্লাস্টিক গবেষক ও গবেষণার সহ-লেখক এলিস গ্রানেক বলেন, “গবেষণার ফল বর্তমানে প্লাস্টিক ব্যবহারের মাত্রার মারাত্মক সমস্যা তুলে ধরেছে। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রধান উপাদান হিসাবে প্লাস্টিক ব্যবহার করতে থাকলে এবং ব্যাপকমাত্রায় তা করলে আমাদের খাদ্যেও এর উপস্থিতি দেখতে পাব।"
বিশ্বজুড়ে পানির নমুনাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে এবং এই দূষণ মূলত খাবারেই প্রকট হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত সব ধরনের মাংস এবং উৎপাদিত পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের ক্ষেত্রে প্রায় ১৬,০০০ ধরনের প্লাস্টিক-সংক্রান্ত রাসায়নিক থাকতে পারে এবং সেগুলোতে প্রায়ই বিষাক্ত সব উপাদানের সংমিশ্রণ থাকে। যেমন: পিএফএএস, বিসফেনল এবং থ্যালেটস; যা ক্যান্সার, নিউরোটক্সিসিটি, হরমোনজনিত সমস্যার কারণ হতে পারে।
বিষাক্ত ওইসব উপাদান মস্তিষ্ক এবং প্লাসেন্টাল বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম এবং হার্টের টিস্যুতে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার কারণে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকিও দ্বিগুণ বেড়ে যেতে পারে।
গবেষণায় পাঁচ ধরনের ফিন ফিশ এবং গোলাপী চিংড়ির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মাছের ফুলকা বা মুখ থেকে তাদের মাংসে পৌঁছাতে পারে, যা পরে মানুষ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
গবেষক এলিস গ্রানেক বলেন, "প্ল্যাঙ্কটন প্রায়ই সমুদ্রের উপরিভাগে জমা হয়, এবং মাইক্রোপ্লাস্টিকও একইভাবে জোয়ারের সঙ্গে চলাচল করে। ফলে, সামুদ্রিক প্রাণীগুলো যখন প্ল্যাঙ্কটন গ্রহণ করে, তখন তারা অজান্তেই মাইক্রোপ্লাস্টিকও গ্রহণ করে।"
বিশেষত, নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে খাবার সংগ্রহ করা বাচ্চা ল্যাম্প্রে মাছগুলোর মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উচ্চমাত্রার উপস্থিতি দেখা গেছে। তবে, যখন এই ল্যাম্প্রেগুলো যখন বড় হয়ে সমুদ্রে চলে যায়, তখন তাদের দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা হ্রাস পায়।
গবেষণায় চিনুক স্যামনের দেহে সবচেয়ে কম পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। তবে, গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, এটি সম্পূর্ণ তুলনাযোগ্য না, কারণ তারা শুধুমাত্র স্যামনের ফিলে (যা সাধারণত মানুষ খায়) পরীক্ষা করেছেন, কিন্তু ছোট মাছ ও চিংড়ির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দেহ পরীক্ষা করা হয়েছে।

এছাড়া, দোকান থেকে কেনা লিং কড (এক ধরনের সামুদ্রিক মাছ)-এ বেশি মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যা সরাসরি নৌকা থেকে কেনা লিং কডের তুলনায় বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রক্রিয়াজাত হওয়ার কারণে এর মাত্রা বেশি হতে পারে।
এ থেকে বোঝা যায়, খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে।
তবে, গবেষকরা সামুদ্রিক খাবার এড়ানোর পরামর্শ দেন না, কারণ মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধুমাত্র সামুদ্রিক খাবারেই নয়, বরং মাংস ও কৃষিপণ্যে ব্যাপকভাবে পাওয়া গেছে। তাই শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করলেই সমস্যা সমাধান হবে না।
কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, সামুদ্রিক খাবার ধুয়ে খেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা কিছুটা কমতে পারে।
এলিস গ্রানেক বলেন, ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, যেমন ওয়াশিং মেশিন মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটি প্রধান উৎস। তাই ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধোয়া থেকে বিরত থাকা, ঠান্ডা পানিতে কাপড় ধোয়া, এবং সিনথেটিক কাপড় পরা এড়িয়ে চলা। এগুলো মেনে চললে মাইক্রোপ্লাস্টিক কিছুটা রোধ করা সম্ভব।
এগুলো ছোট হলেও, দৈনন্দিন জীবনে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিস্তার কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে, চূড়ান্ত সমাধানটি অবশ্যই নীতিগত পর্যায়ে আসা দরকার। যেমন প্লাস্টিকের ব্যবহার হ্রাস করা এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্ধারণ করার জন্য ওয়াশিং মেশিনে বিশেষ ফিল্টার ব্যবহার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
গ্রানেক বলেন, "যদি আমাদের খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক না চাই, তবে আমাদের দৈনন্দিন অনুশীলনে পরিবর্তন আনতে হবে। এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি দিকেই প্রভাব ফেলবে, এবং সমাধানে আসতে হলে এটি ব্যক্তিগত থেকে নীতিগত পর্যায়ে নেওয়া প্রয়োজন।"