Published : 24 Apr 2026, 02:21 PM
দ্রুতগতির এক ঝাঁক ছোট নৌযানকে ব্যবহার করে ইরান যেভাবে হরমুজ প্রণালির কাছে দুটি মালবাহী জাহাজ জব্দ করেছে, তা মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে যে তারা ইরানের দিক থেকে আসা নৌ-হুমকিকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে।
তারা এতদিন রেভল্যুশনারি গার্ডের ছোট দ্রুতগতির আক্রমণাত্মক নৌযানগুলোকে যে খুব একটা বড় হুমকি মনে করেননি তা সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের স্বীকারোক্তিতে বোঝাও গেছে।
অথচ সেই মার্কিন প্রেসিডেন্টই এখন বলছেন, হরমুজ প্রণালির বাইরে মার্কিন অবরোধের কাছে এ ধরনের কোনো ইরানি নৌযান এলে তা ‘নির্মূল’ করা হবে। তিনি এর সঙ্গে ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারকারী নৌকা ধ্বংসের তুলনাও টেনেছেন।
তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ইরানের এই স্পিডবোটগুলো মাদক পাচারকারী নৌকার মতো নিরস্ত্র নয়। রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের এই নৌযানগুলোতে ভারি মেশিনগান ও রকেট লঞ্চার তো আছেই। কোনো কোনোটিতে জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও থাকে।
গ্রিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ‘ডায়াপ্লাস’ বলছে, স্পিডবোট হামলা এখন ইরানের ‘নানান স্তরের আক্রমণ ব্যবস্থার" অংশ। অনিশ্চয়তা ও বিপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীর করে দিতে এর সঙ্গে ‘তীরে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মাইন এবং ইলেকট্রনিক হস্তক্ষেপও’ যুক্ত আছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের কাছে এ ধরনের কয়েকশ’ বা কয়েক হাজার স্পিডবোট ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে, যেগুলো বেশিরভাগ সময়েই উপকূলীয় সুড়ঙ্গ, নৌ ঘাঁটি বা বেসামরিক নৌযানের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়।
মেরিটাইম সিকিউরিটি গ্রুপ ‘ড্রাইড গ্লোবাল’-এর প্রধান নির্বাহী কোরি র্যানসেলাম জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইরানের এ ধরনের প্রায় ১০০ বা তার বেশি নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে।
ইরানের এক ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, এই দ্রুতগামী নৌযানগুলো এখন তাদের নৌ-কৌশলের ‘মেরুদণ্ড’।
তিনি জানান, “অত্যন্ত দ্রুতগতির কারণে এই স্পিডবোটগুলো ধরা পড়ার আগেই ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশলে হামলা চালিয়ে সফলভাবে ফিরে আসতে পারে।”
সাধারণত একটি জাহাজ জব্দ অভিযানে এ ধরনের প্রায় ডজনখানেক নৌযান অংশ নেয়।
তবে এই স্পিডবোটগুলোর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। গ্রীষ্মকালে সাগরের ঢেউ ও বাতাসের তীব্রতা বাড়লে এসব নৌযান থেকে লক্ষ্যভেদী গুলি চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়া কোনো যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে নামলেও এগুলো চরম ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জেরেমি বিনি বলেন, “ইরানের বড় যুদ্ধজাহাজগুলো খুঁজে বের করা এবং ধ্বংস করা যতটা সহজ ছিল, এই ছোট বোটগুলোকে নির্মূল করা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হবে। কারণ এগুলো খুব সহজেই আত্মগোপন করতে পারে।”
আশির দশকের তথাকথিত ‘ট্যাংকার যুদ্ধের’ পর থেকেই ইরান ক্রমাগত এ ধরনের ‘অসম যুদ্ধ’ বা অ্যাসিমেট্রিক কৌশলের দিকে ঝুঁকেছে।
সেবারের ট্যাংকার যু্দ্ধেও পরিস্থিতি প্রায় একই রকম ছিল বলে জানান ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির সাবেক ভাইস অ্যাডমিরাল এবং বর্তমানে পরামর্শক সংস্থা ‘ইউনিভার্সাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি সলিউশনস’-এর পরিচালক ডানকান পটস।
তিনি বলেন, “মার্কিন নৌবাহিনী এবং প্রেসিডেন্ট যখন বলেন, ‘আমরা ওদের নৌবাহিনী ধ্বংস করেছি, শ্রীলঙ্কার উপকূলে একটি ফ্রিগেট ডুবিয়ে দিয়েছি’, তখন বুঝতে হবে যে আপনারা আগেও এমনটা করেছেন।
“কিন্তু আপনারা ভুলে গেছেন, আপনাদের প্রতিপক্ষ তখন থেকেই এই অসম সমরকৌশল গ্রহণ করেছে এবং তারা এখন এতে সিদ্ধহস্ত।”