Published : 13 Jul 2026, 10:16 PM
নেপালে বালেন্দ্র শাহের নতুন সরকার এক বছর পার করার আগেই ফের বিদ্রোহের আগুনে জ্বলে উঠেছে। সরকারের বিরুদ্ধে নতুন করে পথে নেমেছে নেপালের তরুণ প্রজন্ম জেন জি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলেন্দ্র শাহের সরকারকে। এই বিক্ষোভের নেপথ্যে রয়েছে এক বাইকচালকের আত্মহত্যার ঘটনা।
বৃহস্পতিবার নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর পাসপোর্ট অফিসের সামনে সরকারি জায়গায় বাইক রাখার জন্য ১,০০০ নেপালি রূপি জরিমানা আদায়ের চেষ্টা করা হয় গণেশ নেপালি নামের একজনের কাছ থেকে।
অ্যাপভিত্তিক বাইক পরিষেবা দেওয়া সংস্থার সঙ্গে যুক্ত গণেশ বাইকে যাত্রীদের চাপিয়ে বিভিন্ন গন্তব্য পৌঁছে দিতেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, জরিমানার অর্থ দিতে না পারার কথা জানালেও জোর-জবরদস্তি করে কাঠমান্ডু মেট্রোপলিটন পুলিশ। এ নিয়ে তর্কাতর্কির মধ্যেই নিজের গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেন গণেশ।
গুরুতর আহত অবস্থায় গণেশকে কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু শুক্রবার চিকিৎসকেরা তার মৃত্যুর খবর করেন। তার পরেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
কাঠমান্ডু পুলিশের অতিসক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে অনেকে। সরকারের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ উগরে দেন বিক্ষুব্ধরা। বিক্ষোভকারা বলছে, কাঠমান্ডু পুলিশ মূলত শহরের প্রশাসনিক কার্যকলাপ নির্বিঘ্নে চালানোর কাজে সহায়তা করে এবং জনগণের সঙ্গে সমন্বয় রাখে।
তাদের বলপ্রয়োগ করা বা নাগরিকদের সম্পত্তি জব্দ বা কাউকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করা কিংবা কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কোনও আইনগত ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা দেখিয়ে কাঠমান্ডু পুলিশ গণেশ নেপালির কাছ থেকে জরিমানা আদায় করেছে বলে অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের।
বিষয়টি নিয়ে পার্লামেন্টের ভেতরে এবং রাস্তায়ও বিক্ষোভ হয়েছে। শুক্রবারের ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে বিক্ষোভকারীরা। শত শত তরুণ বিক্ষোভকারী রোববার সিংহদরবার সচিবালয়ের বাইরে রাস্তায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করে।
সরকারের কাছ থেকে জবাবদিহিতা এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায় তারা। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘গরিবদের ওপর নির্যাতন বন্ধ কর’, ‘মানবাধিকারকে সম্মান কর-সহ নানা স্লোগান।
নগর প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র, পথের ক্ষুদ্র হকার ও বস্তিবাসীদের প্রতি অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করে আসছে বলে অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের। তারা অবিলম্বে অবৈধ গ্রেপ্তার বন্ধ এবং উচ্ছেদ হওয়া বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনেরও দাবি জানাচ্ছে।
ওদিকে, নেপালের পার্লামেন্টে বলেন্দ্র সরকারের সমালোচনায় সরব হয়েছে নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি, নেপালি কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলো। বিক্ষোভের মুখে নেপাল সরকার ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। কমিটির শীর্ষে রয়েছেন নেপাল পুলিশের ডেপুটি ইনস্পেক্টর জেনারেল গোবিন্দ থাপলিয়া।।
নেপালে এর আগে গত বছর জেন-জি আন্দোলনের প্রধান মুখ ছিলেন বলেন্দ্র শাহ। বর্তমানে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে। তবে যুব সমাজের অভিযোগ, দেশবাসীর মনে যে আশা জাগিয়ে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন তা পূরণে তিনি ব্যর্থ।
জেন-জি নেপাল সংগঠনের অভিযোগ, বালেন্দ্র জনবিরোধী শাসন চালাচ্ছেন। গত কয়েকদিন ধরেই কাঠমান্ডুর রাজপথে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে নেপালের যুবসমাজ।
গত বছর নেপালে জেন জি বিদ্রোহ ভয়াবহ আকার নেওয়ার আগে ২০২৩ সালেও সরকার বিরোধী বিক্ষোভে নেমে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল। প্রেম আচার্য নামে এক যুবকের মৃত্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন তৎকালীন কাঠমান্ডুর মেয়র বলেন্দ্র শাহ। এবার সমালোচনার মুখে খোদ তিনি।
গত বছর নেপালে জেন-জি বিদ্রোহ ও সাবেক কেপি শর্মা ওলির সরকারের পতনের অন্যতম কারিগর ছিলেন বলেন্দ্র শাহ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তার গান সাড়া ফেলে যুবসমাজের মধ্যে।
প্রাথমিক ভাবে সমাজমাধ্যমের উপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হলেও কিছু দিনের মধ্যেই তা নেপালে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের রূপ নেয়। রাস্তায় নামা তরুণ প্রজন্মের জোয়ারের মুখে ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
সরকারকে উৎখাত করার পর ৫ মার্চ ফের নির্বাচন হয় নেপালে। সেই নির্বাচনে জয়ী হন বলেন্দ্র শাহ। মাত্র ৩৫ বছরে দেশের প্রধানমন্ত্রীও হন জেন জি’দের পছন্দের এই নেতা। আর এবার খোদ জনরোষের মুখে বালেন্দ্র।
সূত্র: এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস, নিউজ১৮