Published : 20 Mar 2026, 10:44 AM
চলমান ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানের ‘কিছু’ তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র।
অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ফক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই ধারণাটি তুলে ধরেছেন।
তার ভাষ্য, এতে বৈশ্বিক ক্রেতাদের জন্য আরও তেল সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে। যুদ্ধের কারণে পরিবহন ও উৎপাদনে প্রভাব পড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে।
বিবিসি লিখেছে, যদি এই ধারণা আলোর মুখ দেখে, তাহলে দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতির একটি নাটকীয় পরিবর্তন হবে। তবে এর ফল কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পদক্ষেপ তেলের দামে খুব কমই প্রভাব ফেলবে এবং ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থার তহবিল বাড়ানোর পথ তৈরি করবে, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মেরিটাইম নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন কমপ্লায়েন্স সার্ভিসেসের পরিচালক ডেভিড ট্যানেনবাউম বলেন, “সোজা কথায় বলতে গেলে, এটা একেবারেই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। মোটাদাগে আমরা ইরানকে তেল বিক্রি করতে দিচ্ছি, যা পরে তাদের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অর্থ জোগাতে পারে।”
যুদ্ধের আগে ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা ছিল চীন, তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যদের নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা কম দামে তেল কিনত।
বেসেন্ট বৃহস্পতিবার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলে ভারত, জাপান ও মালয়েশিয়ার মত দেশগুলো ইরানের তেল কিনতে পারবে, আর চীনকে ‘বাজারমূল্য’ দিতে বাধ্য করা যাবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সাগরে থাকা প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০ থেকে ১৪ দিনের জন্য কমাতে পারে।
তবে কীভাবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে বা তেলের বিক্রির অর্থ ইরান সরকারের কাছে যাওয়া ঠেকানো যাবে কি না—সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি। এ বিষয়ে বিশদ তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়।

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি। “দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে যা প্রয়োজন আমরা তাই করব” বলেই তিনি থেমে যান।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বব্যাপী চাহিদার তুলনায় প্রস্তাবিত সরবরাহ খুবই কম, তাই বাজার দরে এর প্রভাবও সীমিত হবে।
তাছাড়া ইরানের কিছু তেল ইতোমধ্যেই বাজারে পৌঁছাচ্ছিল, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে ক্রেতা আরও বাড়বে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির বিশেষজ্ঞ র্যাচেল জিয়েম্বা বলেন, “এতে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে, কিন্তু এটি বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না এবং অনেক প্রশ্নের জন্ম দেবে।”
বিবিসি লিখেছে, এর আগে তেলের সরবরাহ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মজুদ থেকে তেল ছেড়েছে এবং রাশিয়ার তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞাও সাময়িকভাবে শিথিল করেছে।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, তারা মনে করেন, এতে পুতিন সরকার আরও শক্তিশালী হবে এবং ইউক্রেইন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে।
এখন নতুন প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি তৈরি করবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। সম্প্রতি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ইরানের তেল খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করার একটি বিল পাস করেছে।
এ বিষয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতারা মুখ খুলতে চাননি।

জিয়েম্বা বলেন, তিনি মনে করেন না যে যুক্তরাষ্ট্র চায় তেল বিক্রির অর্থ ইরানের সরকারের হাতে যাক; তবে বাস্তবে তা আটকানো কঠিন হতে পারে।
তিনি বলেন, বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন কতটা উদ্বিগ্ন, তা তাদের এমন পদক্ষেপে ফুটে উঠছে।
“নাজুক সরবরাহ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রতিটি ব্যারেল খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাড়তি তেলের জন্য সম্ভাব্য সব জায়গায় তারা নজর দিচ্ছে।”
বিশ্বে প্রতিদিন ব্যবহৃত প্রায় ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হত, যা ইরানের উপকূলের পাশ দিয়ে গেছে। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই পথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
কিছু তেল বিকল্প পথে সরানো গেলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্বে সরবরাহের প্রায় ১০ শতাংশ ইতোমধ্যে কমে গেছে।
চলমান সংঘাত যদি দ্রুত শেষও হয় পরিস্থিতি আগের চাইতে জটিল আকার ধারণ করেছে। কারণ ইরান ও কাতার পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্রে পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।