Published : 06 Mar 2026, 05:26 PM
গত বছরের অক্টোবরের শেষ দিকে নৌবাহিনীর নীল ইউনিফর্ম এবং স্টাইলিশ সানগ্লাস পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশটির নৌ-সেনাদের এক সভায় ভাষণ দিয়েছিলেন।
সেখানে তিনি ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং এই পথে বাণিজ্য ও তেল পরিবহনের বিশাল সম্ভাবনার কথা জোর দিয়ে উচ্চারণ করেন। উপস্থিত দর্শকদের ‘ভারত মাতার জয়’ স্লোগানের মধ্যে তিনি বলেছিলেন, “ভারতীয় নৌবাহিনী হলো ভারত মহাসাগরের অভিভাবক।”
তার সেই বক্তৃতার পাঁচ মাসও পূর্ণ হয়নি, ভারত মহাসাগরের সেই ‘অভিভাবক’ এখন নিজেই ইমেজ সঙ্কটে পড়েছে। কেননা, ভারত তার নিজের অতিথি জাহাজকেই ওই জলসীমায় সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, অভিযোগ আল-জাজিরার।
বুধবার শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূল থেকে মাত্র ৪৪ নটিক্যাল মাইল (৮১ কিমি) দূরে ভারত মহাসাগরে ইরানি যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস দেনা মার্কিন ডুবোজাহাজের টর্পেডো হামলায় ডুবে যায়।
জাহাজটি ভারত আয়োজিত ‘মিলান’ নৌ-মহড়া শেষ করে সেসময় দেশে ফিরছিল; ওই মহড়া চলাকালে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু খোদ দেনা’র নাবিকদের সঙ্গে ছবিও তুলেছিলেন।
অথচ জাহাজটি আক্রান্ত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে ভারতীয় নৌবাহিনীর এক দিনেরও বেশি সময় লেগে যায়।
মার্কিন কর্মকর্তারা খোলাখুলি বলেছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় তাদের এই হামলা ইরানের বিরুদ্ধে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ আরও বাড়ানোর একটি সঙ্কেত।
পেন্টাগনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, “একটি মার্কিন সাবমেরিন সেই ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ডুবিয়ে দিয়েছে যেটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিজেকে নিরাপদ মনে করেছিল। টর্পেডোর আঘাতে এটি তলিয়ে গেছে, নিঃশব্দ মৃত্যু।”
নিজেদের উপকূল থেকে হাজার মাইল দূরে যুদ্ধজাহাজ আক্রান্ত হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে তেহরান। ইরান স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ‘আইআরআইএস দেনা’ ছিল ভারতের নৌবাহিনীর ‘অতিথি’। তারা দিল্লির আমন্ত্রণেই মহড়ায় অংশ নিয়ে ফিরছিল।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ইরান থেকে ২ হাজার মাইল দূরে সমুদ্রের মাঝখানে এই নৃশংসতা চালিয়েছে। লিখে রাখুন: যুক্তরাষ্ট্র এই নজির স্থাপনের জন্য ভবিষ্যতে চরম অনুশোচনা করবে।”
বর্তমানে আইআরআইএস দেনা ভারত মহাসাগরের তলদেশে পড়ে আছে। তার ওপর আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৮০ জনেরও বেশি ইরানি নাবিক, যারা দুই সপ্তাহের সফরকালে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে কুচকাওয়াজে অংশ নিয়েছিলেন, তুলেছিলেন সেলফি।
অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় নৌ-কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরাই বলছেন, ভারত মহাসাগরে মূল নিরাপত্তা প্রদানকারী হিসেবে নিজেদের যে ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছিল নয়া দিল্লি, এই একটি ঘটনার মধ্য দিয়েই তা অনেকটাই ধূলিস্মাৎ হয়ে গেল।
ভারতের নিজের আঙিনাতেই দিল্লির ক্ষমতা ও প্রভাবের সীমাবদ্ধতা কতখানি, মার্কিন হামলা তাও প্রমাণ করে দিয়েছে, বলছেন তারা।
‘যুদ্ধ ভারতের আঙিনায়’
নৌ মহড়া শেষে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বিশাখাপত্নম ত্যাগ করে আইআরআইএস দেনা। স্থানীয় সময় ৪ মার্চ ভোরে শ্রীলঙ্কার জলসীমার ঠিক দক্ষিণে আন্তর্জাতিক জলসীমায় এটি আক্রান্ত হয়। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী পরে ৮০টির বেশি মৃতদেহ এবং ৩২ জন জীবিতকে উদ্ধার করে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন শতাধিক মানুষ।
এই সেই যুদ্ধজাহাজ, মহড়ায় যেটিকে স্বাগত জানিয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড পোস্ট দিয়েছিল, “তার আগমনে (প্রতিফলিত) দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক সম্পর্ক।”
ভারতীয় নেভাল স্টাফের সাবেক উপপ্রধান চিফ শেখর সিনহা মহড়ায় ইরানিদের কুচকাওয়াজ দেখেছেনও।
“মহড়ায় তাদের সঙ্গে দেখা করেছিলাম আমি, তাদেরকে আমার পছন্দও হয়েছে, বিশেষ করে হাজার মাইল দূর থেকে এসে কুচকাওয়াজ করার ব্যাপারটা।
“জাহাজ ডুবে যাওয়া সবসময়ই দুঃখজনক। কিন্তু যুদ্ধে আবেগ কাজ করে না। যুদ্ধে কোনো নৈতিকতা থাকে না,” বলেছেন সিনহা।
তার মতে, ভারত মহাসাগরকে আগে যতটা নিরাপদ মনে করা হতো, ততটা যে নয়, তা এখন বোঝা যাচ্ছে।
“যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরানের লড়াই এখন ভারতের ঘরের দরজায় পৌঁছে গেছে। ভারত মহাসাগরে আমরা যে স্বাধীনতা ভোগ করতাম, তা এখন সংকুচিত হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে,” বলেছেন তিনি
দিল্লি যে ফাঁদে পড়েছে
দেনা আক্রান্ত হওয়ারও ২৪ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভারতীয় নৌবাহিনী একটি বিবৃতি দেয়। তারা জানায়, ইরানি যুদ্ধজাহাজ থেকে দেওয়া বিপদ সঙ্কেত পেয়ে তারা নৌযানটির নাবিকদের উদ্ধারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কিন্তু ততক্ষণে শ্রীলঙ্কা নৌবাহিনী কাজ শুরু করে দেয়।
এখানে উল্লেখ করা দরকার, ভারতীয় নৌবাহিনীর সেই বিবৃতি কিংবা নয়া দিল্লি, কেউই আন্তর্জাতিক জলসীমায়, তাদের অতিথি জাহাজে মার্কিন হামলার ন্যূনতম সমালোচনাও করেনি।
সামরিক বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন—ভারত কি এই হামলা সম্পর্কে আগে থেকে জানত, নাকি নিজেদের আঙিনায় মার্কিন ডুবোজাহাজের উপস্থিতির খবরই ছিল না তাদের কাছে?
ভারতের সাবেক নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ বলছেন, “যদি ভারত এই হামলা সম্পর্কে আগে থেকে না জেনে থাকে, তবে তা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। কারণ আমাদের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে।”
আর যদি জেনে থাকে, তার অর্থ দাঁড়াবে তারা ইরান যুদ্ধে কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ নিয়েছে।
“এটা ভারতের জন্য এক ধরনের অপমান। এর ফলে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে ভারতের ওপর আস্থা কমে যাবে। সবচেয়ে বড় কথা, ভারত সরকার এই ঘটনা নিয়ে প্রায় চুপ থাকায় নৈতিকভাবে ভারতের অবস্থানও অনেক দুর্বল হয়ে গেছে,” বলেছেন ভারতীয় নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও নয়া দিল্লিভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংক ‘সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজের’ পরিচালক সি উদয় ভাস্কর।
ভারত তবে আগ্রাসনকারীদের পক্ষে?
স্নায়ু যুদ্ধের সময় ভারত ছিল ‘জোট নিরপেক্ষ’ আন্দোলনের নেতা। নরেন্দ্র মোদী সরকার এখন তাদের পররাষ্ট্রনীতিকে দেখাতে চাইছে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ হিসেবে। আদতে তারা ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্র এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকছে।
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মাত্র দুই দিন আগে মোদী ইসরায়েল সফর করেন এবং নেতানিয়াহুকে উষ্ণ আলিঙ্গন করেন। অথচ খামেনি নিহত হওয়ার পর মোদী একটি শোকবার্তাও পাঠাননি। গত বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিসরি ইরান দূতাবাসে গিয়ে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করে এসেছেন। সাধারণত এ ধরনের রাষ্ট্রীয় শোকের ক্ষেত্রে ভারত মন্ত্রীদের পাঠায়, এবার আমলা পাঠিয়ে দায় সেরেছে।
সামরিক ইতিহাসবিদ শ্রীনাথ রাঘবন বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের এই কর্মকাণ্ড ভারতের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বুঝিয়ে দিয়েছে। ভারত এখন সরাসরি হামলাকারীদের পক্ষ নিয়েছে। এমনকি খামেনি হত্যার নিন্দা না জানিয়ে মোদী উল্টো ইরানের পাল্টা হামলার সমালোচনা করেছেন।”
বিরোধীদল কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট মল্লিকার্জুন খাড়্গেও মোদী সরকার যে ‘বেপরোয়াভাবে ভারতের কৌশলগত ও জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়েছে’ তার কড়া সমালোচনা করেছেন।
“খামেনি হত্যাকাণ্ডের পর মোদী সরকারের নীরবতা ভারতের মূল জাতীয় স্বার্থকে হেয় করেছে, বছরের পর বছর ধরে একাধিক সরকার কঠোর পরিশ্রমে ও সযতনে যে পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলেছিল ও অনুসরণ করছিল, তা ধ্বংস করে দিয়েছে,” বলেছেন তিনি।
রাঘবন বলছেন, খামেনি নিয়ে নিশ্চুপ মোদী কিন্তু উপসাগরের বিভিন্ন দেশে ইরানের পাল্টা হামলার সমালোচনা করেছেন।
“ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভারতের আগ্রহ যে নাটকীয়ভাবে কমে আসছে, এ সিদ্ধান্তে না পৌঁছে উপায় নেই।
“এটা পুরো অঞ্চলে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করবে এবং পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের দীর্ঘমেয়াদী ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলবে,” আল জাজিরাকে বলেছেন রাঘবন।