Published : 24 Jul 2026, 01:06 AM
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের উপস্থিতিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে নিজের লেখা কবিতা পাঠ করতে গিয়ে এনসিপির শ্রম সংগঠন ‘শ্রমিক শক্তির’ এক নেতার হাতে নাজেহাল হয়েছেন কবি মোহন রায়হান।
বৃহস্পতিবার বিকালে বাংলা একাডেমিতে কবিতা পাঠের মাঝে তার মাইক কেড়ে নেন শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদ ইসহাক। ‘আওয়ামী লীগের দালাল’ আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে স্লোগানও দেওয়া হয়। ওই ঘটনার একটি ভিডিও ছড়িয়েছে ফেইসবুকে।
ভিডিওতে দেখা যায়, মাইক কেড়ে নিয়ে ইসহাক বলেন, “আজকে থেকে এইখানে এই মোহন রায়হান আওয়ামী লীগের দালালকে বাংলা একাডেমিতে আমরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলাম।”
এরপর ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি ‘আওয়ামী লীগের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’ স্লোগানও দেন তিনি।
এসময় মোহন রায়হান প্রতিবাদ করে বলেন, “কবিতার শেষ শুনতে হবে, এটা আওয়ামী লীগের কবিতা নয়, কবিতার শেষ শুনতে হবে।”
এ ঘটনার সময় মঞ্চে সভাপ্রধান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। পরে তার হস্তক্ষেপে মোহন রায়হান পুরো কবিতা পাঠ করেন বলে দাবি করেছেন শ্রমিক শক্তির নেতা ইসহাক, যিনি নিজেকে একজন কবি বলে পরিচয় দেন।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ইসহাক অনুষ্ঠানে কবি মোহন রায়হানকে ‘অবাঞ্ছিত ঘোষণা’ করার কথা স্বীকার করেন।
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাংলামোটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের একটি অনুষ্ঠানেও বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। স্রোত আবৃত্তি সংসদের ‘রবীন্দ্র স্মরণ দ্রোহে, জাগরণে রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামের সেই অনুষ্ঠানও বন্ধ হয়েছিল ইসহাকসহ কয়েকজনের বাধায়।
‘একটি পক্ষ ভুল ব্যাখ্যা করছে’
বৃহস্পতিবার কবিতা পাঠের সময় হট্টগোলের বিষয়ে মোহন রায়হান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যে কবিতাটি আমি পাঠ করেছি, তা মূলত জুলাই আন্দোলনের পক্ষে এবং জুলাই নিয়ে যারা ব্যবসা করছে তাদের বিরুদ্ধেই লেখা।
“একটি পক্ষ কবিতার আসল বক্তব্য তুলে না ধরে এটিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছে। 'জুলাই বিরোধী কবিতা' বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমার কবিতার শেষ বক্তব্যই ছিল জুলাই কখনো পরাজিত হতে পারে না।”
নিজেকে জুলাই আন্দোলনের ‘রাজপথের যোদ্ধা’ দাবি করে মোহন রায়হান বলেন, “কিন্তু জুলাই আন্দোলনকে পুঁজি করে যারা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে চায়, আমরা তা মেনে নেব না।

“মুক্তিযুদ্ধে যেমন আমাদের কোনো আপস নেই, ঠিক তেমনি জুলাই আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যারা রাজনীতি বা ব্যবসা করতে চায়, তাদের সঙ্গেও আমাদের কোনো আপস হতে পারে না।”
বাংলা একাডেমির ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, “কবিতায় যখন ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির নতুন মুখে ফিরে আসার চক্রান্তের কথা তুলে ধরা হয়, তখনই জামায়াত-শিবির সমর্থিত একটি গোষ্ঠী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে কবিতা পাঠে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে আমি তাদের মুখোমুখি হয়ে বক্তব্য প্রদান ও কবিতা পাঠ শেষ করেই মঞ্চ ছেড়েছি।
“আমরা এই দেশে জন্ম নিয়েছি। ১৯৭১ তার নিজের মর্যাদার জায়গায় থাকবে এবং ২০২৪ থাকবে তার নিজের জায়গায়। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও শহীদদের স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়ন হয়নি, সে কথা বলা কখনোই জুলাইয়ের বিরোধিতা হতে পারে না।”
ঘটনার বিষয়ে শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদ ইসহাক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মোহন রায়হানের আগের কিছু কর্মকাণ্ডের কারণে বা জুলাইবিরোধী অবস্থানের কারণে একটা অস্বস্তি জুলাইপন্থি কবিদের মধ্যে আছে।
“তো উনাকে মঞ্চে দেখে শুরুতেই কিছুটা সমালোচনা হয়। কিন্তু তিনি যখন কবিতা পড়তে উঠলেন আরকি, তখন দেখা গেল যে তিনি একদমই জুলাইবিরোধী, আওয়ামী বয়ানের একটা কবিতা পড়া শুরু করলেন। কবিতা পড়াকালীন কিছুক্ষণের মধ্যে উনি বলা শুরু করেন- ‘ইনকিলাব স্লোগানগুলা হচ্ছে রাজাকারের স্লোগান’, এরপরে হচ্ছে, ‘৭১ এর পরাজিত শক্তিদের দ্বারা জুলাই সংঘটিত হয়েছে’- এই ধরনের বক্তব্য।”
তার ভাষ্য, “প্রথমে প্রতিবাদ জানাই এবং মঞ্চে উঠে তাকে আমি অবাঞ্ছিত ঘোষণা করি। এরপর হচ্ছে যখন একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়, তিনি পুরো কবিতাটা পড়তে চান এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক আজমের হস্তক্ষেপে তিনি পুরো কবিতাটা আসলে পড়েন।”
মোহন রায়হানকে শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগ বিষয়ে ইসহাকের দাবি, “না না একদমই না। ভিডিওটা স্পষ্ট দেখা যাবে যে আমি যখন মঞ্চে উঠে উনাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করি, তখন উনি আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং আমার তরফ থেকে উনার বা আমাদের তরফ থেকে উনাকে শারীরিক কোনো হেনস্তা করা অথবা ধরেন ‘আপনি এখান থেকে বের হয়ে যান’, মানে ‘বের’ করে দেওয়ার মত কোনো ঘটনা আসলে ঘটেনি।”
অনুষ্ঠানে প্রায় ৯০ জন কবি স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।