Published : 15 May 2026, 11:37 PM
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ে পা ফেলার আগে থেকেই চীনকে হোয়াইট হাউজ চাপ দিচ্ছিল, যেন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে শান্তিচুক্তির আলোচনায় বেইজিং সহায়তা করে।
কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কয়েক দফার বৈঠকের পর শুক্রবার বিকালে ট্রাম্প যখন দুই দিনের সফরের ইতি টানেন, তখন পর্যন্ত ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভালো কোনো সংবাদ সামনে আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে যে যুদ্ধ বাধিয়েছে, তা ইতোমধ্যে ৭৭তম দিনে গড়িয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে শি-ট্রাম্পের বৈঠকে ইরান যুদ্ধ নিয়ে কী কী আলাপ হয়েছে, কোথায় কোথায় মতবিরোধ রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বন্ধের প্রচেষ্টার ভবিষ্যৎ কী হতে পারে, তা নিয়ে বিশ্লেষণী খবর প্রকাশ করেছে আল জাজিরা।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে যা বলছে চীন?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলা শুরু করে। এতে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের। নিহতের তালিকায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও আছেন।
এদিকে পাল্টা হামলায় ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে নিশানা বানিয়েছে ইরান।
জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় এক ডজন দেশে হামলা চালিয়েছে তারা।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক না হয়, সেটা ঠেকাতে এ যুদ্ধ প্রয়োজন ছিল। যদিও তেহরান বহুবার দাবি করেছে, পারমাণবিক বোমা বানানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
অন্যদিকে চীন শুরু থেকেই এ যুদ্ধের বিরোধিতা করে আসছে, যা তারা ট্রাম্পের বেইজিং সফরের সময়ও পুনর্ব্যক্ত করে।

এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, “ইরান পরিস্থিতি নিয়ে চীনের অবস্থান স্পষ্ট। এই সংঘাত ইরান ও আশপাশের অন্যান্য দেশের মানুষের ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে এনেছে।
“এই পরিস্থিতির উত্তরণ শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জন্য নয়, তা পুরো অঞ্চল ও বিশ্বের জন্যই জরুরি।”
যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যে আলোচনা চলছে, চীনের বিবৃতিতে সেই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে।
বেইজিং বলেছে, “সংলাপই এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। যত দ্রুত সম্ভব একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ।”
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যে চার দফা পরিকল্পনার কথা শুনিয়েছেন, সেটাও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে।
এই চার দফার মধ্যে রয়েছে— শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান; রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান; যৌথ নিরাপত্তা এবং উন্নয়নভিত্তিক সহযোগিতা।
বেইজিং বলেছে, তারা ভবিষ্যতে এই চার দফার ভিত্তিতেই কাজ চালিয়ে যাবে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কী বলেছে?
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজের বিবৃতিতে বলা হয়, “জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখাটা যে জরুরি, সে বিষয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিং একমত।”
মার্চের শুরুতে ইরান ওই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিধিনিষেধ আরোপ করে। পশ্চিম এশিয়ার তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্য সরবরাহে এই নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি এই পথেই পরিবহন হতো।
ইরান কিছু দেশকে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অনুমতি নিতে হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের ক্ষেত্রে টোল বা ফি আরোপের কথাও বলেছিল। ওয়াশিংটন বারবার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
যুদ্ধের ৪০ দিনের মাথায় গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় দুই দেশ। দুই সপ্তাহ শেষ হওয়ার ঘণ্টা কয়েক আগে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প।

কিন্তু যুদ্ধবিরতির মধ্যেই হরমুজ প্রণালি ঘিরে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবরোধ ও অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে আরো বলা হয়, “প্রেসিডেন্ট শি স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি হরমুজ প্রণালির সামরিকীকরণ এবং টোল আরোপের বিরোধী। আর ভবিষ্যতে এই জাহাজপথের ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরো বেশি তেল কেনার আগ্রহ দেখিয়েছেন তিনি।”
তবে ট্রাম্পের বেইজিং সফরের সময় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে টোল বা হরমুজের সামরিকীকরণ প্রসঙ্গে কিছু বলা হয়নি।
চীনের বিবৃতিতে শুধু বলা হয়েছে, “এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিন্ন স্বার্থের ক্ষতি করছে।”
পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর তেলের ওপর চীন ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং তারা ইরানি তেলের বড় ক্রেতা।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কী বলা হয়েছে?
হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়, “দুই দেশ একমত হয়েছে যে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।”
তবে চীনের বিবৃতিতে সরাসরি এ কথা বলা হয়নি।
সেখানে বলা হয়েছে, “পরিস্থিতি শান্ত রাখা, রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা, সংলাপ ও পরামর্শ চালিয়ে যাওয়া এবং সব পক্ষের উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে ইরানের পারমাণবিক ইস্যুসহ অন্যান্য বিষয়ে সমাধানে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ।”

ইরান কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। বরং বারাক ওবামার সময় চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও রাশিয়া একসঙ্গে কাজ করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত পর্যায়ে রাখা।
ধারণা করা হয়, বর্তমানে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন।
মানে কী দাঁড়াল?
দুই পক্ষের বিবৃতিতে এটা স্পষ্ট যে, ইরান বিষয়ে কেউই নিজেদের অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ায়নি। চীন তাদের প্রেসিডেন্টের চার দফা পরিকল্পনায় অনড় রয়েছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
অনেক মার্কিন নেতা তাদের বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, চীনের কাছ থেকে ট্রাম্প প্রশাসন যেটা প্রত্যাশা করেছিলেন, সেটা মেলেনি।
হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগে কয়েক সপ্তাহ ধরে চীনের সহায়তা চেয়ে আসছিল ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু শি-ট্রাম্পের বৈঠকের ঠিক আগে মার্কিন কর্মকর্তারা বলতে শুরু করেন যে, তাদের বেইজিংয়ের সহায়তা প্রয়োজন নেই।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “ইরান ইস্যুতে আমাদের কারো সহায়তা দরকার নেই। যেকোনো উপায়ে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জয়ী হবে।”
একই দিনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কংগ্রেসে দাঁড়িয়ে বলেন, ইরানের ওপর চীনের ‘অনেক প্রভাব’ রয়েছে। সঙ্গে অবশ্য এ কথাও বলেন যে, “সবচেয়ে বেশি প্রভাব প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতেই।”
তবে বৈঠকের আগে ও বৈঠক চলাকালে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা চীনের কাছে সরাসরি সহায়তা চেয়েছেন।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গত সপ্তাহে বলেন, “ইরানের হামলায় প্রণালিটি বন্ধ হয়েছে। আমরা এটি খুলে দিচ্ছি। তাই আমি চীনকে এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগে আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাই।”
এমনকি বৃহস্পতিবার চীনে অবস্থানকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন বেইজিংকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করবে, যদিও তিনি দাবি করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের চীনের সহায়তা প্রয়োজন নেই।
রুবিও বলেন, এটি চীনের নিজের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জ্বালানি আমদানির জন্য চীন হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
“আমরা আশা করি, চীন আরও সক্রিয় ভূমিকা নেবে এবং ইরানকে পারস্য উপসাগরে বর্তমান কার্যক্রম থেকে সরে আসতে রাজি করাবে।”
আরো পড়ুন
শি-কে প্রশংসায় ভাসিয়ে 'যৎসামান্য জয়' নিয়ে চীন ছাড়লেন ট্রাম্প
ইরান চুক্তি নিয়ে ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে: ট্রাম্প
শি-ট্রাম্প বৈঠকে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে 'স্থিতি' ফেরার আশা
যেভাবে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ট্রাম্পের সঙ্গী হয়ে চীনে রুবিও
ট্রাম্পকে চীনে স্বাগত জানিয়ে তাইওয়ান নিয়ে সতর্কবার্তা দিলেন শি