Published : 14 May 2026, 03:05 PM
দুই দিনের শীর্ষ সম্মেলনের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ওয়াশিংটন-বেইজিং বাণিজ্য আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে জানিয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান নিয়ে মতবিরোধ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে বিপজ্জনক পথে নিয়ে যেতে পারে।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে উষ্ণ সংবর্ধনা দিয়ে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব পিপলে এই শীর্ষ সম্মেলন শুরু হয়েছে; মার্কিন প্রেসিডেন্ট যাকে ‘সম্ভবত সর্বকালের সর্ববৃহৎ সম্মেলন’ হিসেবে দেখতে চাইছেন।
ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে যখন ট্রাম্পের জনসমর্থন ক্রমশ কমছে, তখন প্রায় এক দশকের মধ্যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর বাড়তি গুরুত্বও যোগ করেছে। সর্বশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পই ২০১৭ সালে চীনে গিয়েছিলেন, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
গার্ড অব অনার, ফুল আর পতাকা নাড়ানো শিশুদের উচ্ছ্বাস সম্বলিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সম্মেলনের শুরুতেই শি ট্রাম্পকে বলেন, বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে স্থিতিশীল সম্পর্কে লাভ গোটা দুনিয়ার।
“যখন আমরা একে অপরকে সহযোগিতা করি, উভয় পক্ষ উপকৃত হয়; আর যখন বৈরিতায় মুখোমুখি হই, দুই পক্ষই ভোগে,” গণমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত সংক্ষিপ্ত সেশনে শি এমনটাই বলেন।
এর জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আপনি একজন অসাধারণ নেতা, আমি এমনটা বলি লোকজন অনেক সময়ই তা চায় না, কিন্তু তাও আমাকে বলতেই হচ্ছে। অনেকেই আছেন যারা বলছেন, এটা হতে যাচ্ছে সর্বকালের সর্ববৃহৎ সম্মেলন।”
বুধবার দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন ও চীনা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য দলের মধ্যে হওয়া আলোচনা ‘সার্বিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ও ইতিবাচক ফলাফলে’ পৌঁছেছে, শি এমনটা বলেছেন বলে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ভাষ্যে বলা হয়েছে।
গত অক্টোবরে ট্রাম্প ও শি-র মধ্যে শুল্ক নিয়ে যে ‘যুদ্ধবিরতি’ হয়েছিল, তা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহায়তার উপায় বের করার লক্ষ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ায় ওই আলোচনা হয়েছিল বলে বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত একাধিক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন।
শি বৈঠকে তাইওয়ান প্রসঙ্গেও কড়া অবস্থান নিয়েছেন বলে জানিয়েছে বেইজিং। চীন এ দ্বীপটিকে তার নিজের অংশ মনে করে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় চলা তাইপেকে অস্ত্র সহায়তা দিয়ে আসছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ভাষ্যে বলা হয়েছে, তাইওয়ানই যে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এ বিষয়ে ‘যে কোনো ভুল পদক্ষেপ’ যে দুই দেশকে সংঘাত এবং খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে শি তা ট্রাম্পকে বলেছেন।
দুই নেতার মধ্যে বৃহস্পতিবারের বৈঠক দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
তাইওয়ানে এক হাজার ৪০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির একটি প্রস্তাব ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। বুধবারও চীন এ অস্ত্র বিক্রির কড়া নিন্দা জানিয়েছে। স্বশাসিত দ্বীপটিকে আলাদা দেশ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও তাদের প্রতিরক্ষায় সহায়তা করতে ওয়াশিংটন নিজেদের আইনেই বাধ্য।
পরে টেম্পল অব হেভেনে শি-র সঙ্গে ছবি তোলার পোজ দেওয়ার সময় এক সাংবাদিক বৈঠকে তাইওয়ান প্রসঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা তা জানতে চাইলেও ট্রাম্প কোনো উত্তর দেননি।
ইউনেস্কোর ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের’ তালিকায় থাকা এই টেম্পল অব হেভেনে-ই একসময় চীনা সম্রাজ্ঞীরা ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করতেন।
দুই নেতা বৈঠকে বাণিজ্য এবং কৃষিতে সহযোগিতার আওতা আরও বিস্তৃত করার ব্যাপারে একমত হয়েছেন এবং তারা পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময় করেছেন, বলেছে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি।
এ বৈঠকে ইরান প্রসঙ্গে আলোচনা হতে পারে বলে আগে থেকেই কানাঘুঁষা চলছিল। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানকে চাপ দিয়ে আলোচনায় বসাতে ওয়াশিংটন যেভাবে বেইজিংয়ের সহায়তা চাইছে তা মিলবে না বলেই তাদের অনুমান।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় চীন অর্থনৈতিকভাবে খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করার সুযোগ হাতাছাড়া করতে চাইবে না, বলছেন তারা।
ট্রাম্প এ বৈঠকে শি-র তুলনায় ‘দুর্বল অবস্থান’ নিয়েই গেছেন বলেই ভাষ্য তাদের। তার শুল্ক যুদ্ধ ‘ব্যাকফায়ার’ করেছে, ইরান যুদ্ধে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এমনকী সামরিকভাবেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান যে ক্ষতিগ্রস্ত—তা সবার কাছেই পরিষ্কার।
২০১৭ সালে ট্রাম্প যখন চীন সফর করেছিলেন, তখনকার তুলনায় এখন ‘ক্ষমতার ভারসাম্যও’ অনেকখানি বদলে গেছে বলে মনে করেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মার্কিন-চীন সম্পর্ক বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলি ওয়াইনি।
সেবার চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা দিয়েছিল, কিনেছিল শত শত কোটি ডলারের মার্কিন পণ্য। এবার তেমনটা হচ্ছে না, বলেছেন তিনি।
ট্রাম্প নিজেও এখন বিশ্বমঞ্চে চীনের আধিপত্য স্বীকার করে নিচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, গত অক্টোবরে তিনি এশিয়া প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশন সম্মেলনের সাইডলাইনে শি-র সঙ্গে বৈঠকের কথা বলতে গিয়ে ‘জি২’ বা ‘গ্রুপ টু’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র-চীন যে বিশ্বের বড় দুই পরাশক্তি তারই আভাস দেওয়া হয়েছিল, ভাষ্য ওয়াইনির।
অন্যদিকে এবারের সফরে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে চীনের কাছে বোয়িং, কৃষিজাত পণ্য ও জ্বালানি বিক্রি করা, যার মাধ্যমে ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে পারে। এ ঘাটতি ট্রাম্পকে সারাক্ষণই খোঁচাচ্ছে।
এর বিনিময়ে বেইজিং চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি ও অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টরে যুক্তরাষ্ট্রের বিধিনিষেধ শিথিল চাইতে পারে, বলছেন আলোচনার পরিকল্পনায় জড়িত কর্মকর্তারা।
দুই নেতার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়েও কথা হতে পারে। এ কারণেই ট্রাম্পের এবারের সফরে তার সঙ্গী হয়েছেন স্পেসএক্সের ইলন মাস্ক, এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হোয়াং।
মার্কিন প্রেসিডেন্টও বলেছেন, শি-কে করা তার প্রথম অনুরোধই থাকবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের জন্য চীনের বাজার ‘উন্মুক্ত করে দেওয়া’।
বৈঠকে ট্রাম্প প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের সঙ্গে শি-কে পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছেন।
শি-কে উদ্ধৃত করে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যে বলা হয়েছে, চীনের সংস্কার ও বাজার উন্মুক্তকরণে মার্কিন কোম্পানিগুলো গভীরভাবে জড়িত; চীনের এ দরজা আরও উন্মুক্ত হবে।
ট্রাম্প ও শি-র পরে এক রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। শুক্রবার তারা একসঙ্গে চা পান করবেন ও মধ্যাহ্নভোজনে অংশ নেবেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফরের পাল্টায় চীনা প্রেসিডেন্টও এ বছরের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স। তেমনটা হলে ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করা ট্রাম্পের আমলে এটাই হবে চীনের কোনো প্রেসিডেন্ট প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর।