Published : 15 May 2026, 02:00 AM
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের ঐতিহাসিক বৈঠকের মধ্যে দিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক।
তাদের ধারণা, বৃহস্পতিবার দুই নেতার মধ্যে যে বৈঠক হয়, তাতে একাধিক ‘জটিল বিষয়’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এ তালিকায় চীনে মার্কিন পণ্য রপ্তানি বাড়ানো, বাণিজ্য শুল্ক, তাইওয়ান, বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ) ও ইরান যুদ্ধের মতো বিষয় থাকতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মিলে বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
এই তথ্য তুলে ধরে এইচএসবিসির এশিয়া বিষয়ক অর্থনীতিবিদ জাস্টিন ফেং বলছেন, শি-ট্রাম্পের বৈঠক বিশ্বের দুই পরাশক্তির ‘ভবিষ্যৎ নির্ধারণী পরীক্ষা’ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এর আগে শি ও ট্রাম্পের মধ্যে বৈঠক হয় গত বছরের শেষ দিকে; দক্ষিণ কোরিয়ায়। ওই বৈঠকের পর দুই দেশের বাণিজ্যযুদ্ধ কিছুটা শিথিল হয় বলে সিএনবিসির খবরে বলা হয়েছে।
‘আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন চায়নার’ চেয়ারম্যান জেমস জিমারম্যান মনে করেন, “দুই দেশের জন্য বাণিজ্যযুদ্ধে জড়ানো বা পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো অর্থ নেই।”

প্রায় এক দশকের মধ্যে এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীন সফর করছেন। বুধবার বেইজিংয়ে পা রাখার পর লাল গালিচা দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয় ট্রাম্পকে।
সফরের আগে ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দেয়, তারা চীনের কাছ থেকে আরো বেশি মার্কিন সয়াবিন, বোয়িং উড়োজাহাজ এবং অন্যান্য পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি চাইবে।
অন্যদিকে শি-ট্রাম্পের বৈঠকের আগে চার বিষয়ে ‘লাল রেখা’ টেনে দেয় বেইজিং। এরমধ্যে রয়েছে— ‘তাইওয়ান প্রশ্ন’, ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার’, ‘উন্নয়নের পথ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা’ এবং ‘চীনের উন্নয়ন অধিকার’। এর মধ্যে তাইওয়ানের বিষয়টি সবচেয়ে প্রাধান্য দিচ্ছে বেইজিং।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী গ্রাহাম অ্যালিসন সিএনবিসিকে বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হবে ‘স্থিতিশীলতা’। দুই পক্ষ যেসব বিষয়ে আলোচনা করেছে, তা সম্ভবত আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে রূপ নেবে।”
উদীয়মান শক্তি ও প্রতিষ্ঠিত শক্তির মধ্যে সংঘাত প্রায়ই যুদ্ধে গড়ায়— এই তত্ত্বকে বলা হয় ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’। এই তত্ত্ব যাদের হাত ধরে পরিচিতি পেয়েছে, গ্রাহাম অ্যালিসন তাদের একজন।
এই তত্ত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরে শি জিনপিং অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কি এই ফাঁদ এড়িয়ে চলতে পারবে?
যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্তারা এই সফরে ট্রাম্পের সঙ্গী হয়েছেন। এই তালিকায় অ্যাপলের টিম কুক, বোয়িংয়ের কেলি অর্টবার্গ, টেসলা ও স্পেসএক্সের ইলন মাস্ক এবং ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্কের মতো ব্যবসায়ীরাও আছেন।

অ্যালিসন বলেছেন, “ট্রাম্প যেহেতু বড় ঘোষণা দিতে পছন্দ করেন, সেই হিসাবে তিনি ঘোষণা দিতে পারেন যে, চীন অতিরিক্ত এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের মার্কিন পণ্য কিনবে।”
এর মধ্যে বোয়িং উড়োজাহাজ, সয়াবিন, গরুর মাংস ও সেমিকন্ডাক্টরও থাকতে পারে।
এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংও শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হয়েছেন। এতে বোঝা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তিখাতও বৈঠকের সূচিতে ছিল।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার প্রায় ১০টি চীনা কোম্পানিকে এনভিডিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এআই চিপ কেনার অনুমতি দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে কোম্পানিটির সবচেয়ে উন্নত চিপের ক্ষেত্রে এখনো মার্কিন সরকারের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এ ঘটনাকে আশা জাগানিয়া হিসেবে তুলে ধরে জিমারম্যান বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ভবিষ্যতেও সংলাপ চালিয়ে যেতে পারবে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারবে।”
বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যে শি-ট্রাম্পের এই বৈঠক বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ার চেষ্টাকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
জাস্টিন ফেং মনে করেন, “বিশ্ব এখন স্পষ্টভাবেই স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী একমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে আরো প্রতিযোগিতাপূর্ণ বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।”
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ‘ব্যাংক জে সাফরা সারাসিনের’ প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ডং চেনের পর্যবেক্ষণও ফেংয়ের মতো।
ডং চেন বলেন, ‘জি-টু’ কাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ‘সমান অংশীদার’ হিসেবে আলোচনার টেবিলে বসবে, যেখানে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে প্রাধান্য দেবে না।

বৈঠকের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আরো সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে বেইজিংয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়।
এতে ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে গঠনমূলক চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক’ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ
ট্রাম্প এমন সময় বেইজিং সফরে গেলেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে।
এই সংঘাত নিরসনে বেইজিংয়ের ভূমিকা প্রত্যাশা করেন কেউ কেউ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং বৈঠক থেকে ইরান যুদ্ধ নিয়ে বড় কোনো অগ্রগতি আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
কারণ, চীন নিজেকে বৈশ্বিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরলেও যুদ্ধ বন্ধে সরাসরি ভূমিকা নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক রয়েছে।
গ্রাহাম অ্যালিসন বলেন, “চীনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, যুক্তরাষ্ট্র অন্য কোনো জটিলতায় ব্যস্ত থাকলে সেটা তাদের জন্য কখনো কখনো সুবিধাজনক।”
চীনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত গৌতম বাম্বাওয়ালে মনে করেন, “যুদ্ধ বন্ধে চীন যতটুকু সম্ভব, সহায়তা দিতে রাজি হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, চীনের সক্ষমতারও সীমা আছে।”
এই কূটনীতিক মনে করেন, বেইজিং বৈঠক থেকে বড় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতির কথা হয়ত শোনা যাবে না।
আরও পড়ুন-
ট্রাম্প ইরানে চীনের সহায়তা চাইলেও বেইজিংয়ের থাকতে পারে 'অন্য ভাবনা'