Published : 14 May 2026, 12:59 PM
চীন সফরে যাওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ইরানে তার ব্যয়বহুল ও খুবই অজনপ্রিয় যুদ্ধের সমাধানে বেইজিংয়ের সহায়তা চাইবেন বলে অনেকেই ধারণা করছেন।
যদিও এ সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা তার নেই বললেই চলে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শি হয়তো ইরানের নেতাদেরকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে রাজি হতে পারেন, কিন্তু চীনের নেতা পশ্চিম এশিয়ায় বেইজিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের অর্থনৈতিক সহায়তা কর্তন কিংবা তেহরানের সামরিক প্রয়োজনে তাদেরকে দ্বৈত-ব্যবহারী পণ্য সরবরাহ বন্ধে অনিচ্ছুকই থাকবেন।
ট্রাম্পের হাতে চীনের বড় বড় ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকিসহ চাপ দেওয়ার বেশক’টি শক্তিশালী হাতিয়ার থাকলেও সেসব ‘তাস খেললে’ যুক্তরাষ্ট্রকেও ‘মেনে নেওয়ার মতো নয় এমন চড়া মূল্য’ দেওয়া লাগতে পারে, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
এমন এক সময়ে বেইজিংয়ে ট্রাম্প ও শি-র বৈঠক হচ্ছে, যখন বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের সমাধানে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা ফিকে হয়ে এসেছে। দুই পক্ষের মধ্যে থাকা যুদ্ধবিরতি ক্রমশ আরও নড়বড়ে হয়ে উঠছে।
চীন-যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বৈঠকে আলোচনার পরিকল্পনা সম্বন্ধে অবগত দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তি করতে তেহরানের সিদ্ধান্তগ্রহীতাদের হাতে গোনা যে কয়েকটি শক্তি প্রভাবিত করতে পারে, ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা বেইজিংকে তার অন্যতম হিসেবেই দেখছেন ট্রাম্পের সহযোগীরা।
চীনের ওপর জোর খাটানোর হাতিয়ার না থাকায় ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য থাকবে- ইরান যুদ্ধ শেষ করা যে বেইজিংয়ের স্বার্থের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ তা দেশটির নেতাদের বোঝানো।
কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও সহজ হবে না। কারণ, ইরান যুদ্ধে চীনের বিপরীতমুখী স্বার্থ রয়েছে। একদিকে তারা চায়—হরমুজ প্রণালি খোলা থাক, ইরানের সেনাবাহিনী যা রুদ্ধ করে রেখেছে। যুদ্ধের আগে কৌশলগত এ জলপথ দিয়েই বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের এক পঞ্চমাংশ গন্তব্যে যেত। চীনগামী তেলের বেশিরভাগও এই সঙ্কীর্ণ প্রণালিটিই ব্যবহার করতো।
অন্যদিকে, ইরান এখনও পশ্চিম এশিয়ায় চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে থাকা অন্যতম শক্তিও। এর পাশাপাশি এ যুদ্ধের কারণে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক ও সামরিক মনোযোগ ইন্দো-প্যাসিফিক থেকে দূরেও সরে আছে।
অর্থ্যাৎ, অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরান যুদ্ধে চীনের যে একেবারেই কোনো লাভ হচ্ছে না, তা নয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক কাউন্সিল ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ ফেলো হেনরিয়েতা লেভিন বলছেন, গত বছরের শুল্ক যুদ্ধ থেকে ট্রাম্পের পিছু হটা এবং ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে ওয়াশিংটন যে চীনের উঠান থেকে গুরুত্বপূর্ণ সব সামরিক সরঞ্জাম সেদিকে সরিয়ে নিচ্ছে—এমনটা বুঝতে পারা শি সাহসী ও ‘ব্যাপক আত্মবিশ্বাসী’ অবস্থান নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন।
যদিও ট্রাম্প মঙ্গলবার তার নৌ-অবরোধকে দেখিয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ইরানকে রাজি করাতে চীনের সহায়তা লাগবে না তার।
“ইরানের শাসকগোষ্ঠী জানে তাদের বর্তমান বাস্তবতা টেকসই নয়, চুক্তি করতে আলোচকরা কাজ করলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতেই সব তাস রয়েছে,” বলেছেন হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত চীন দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংগিউ বলেছেন, বেইজিং যে কোনো ‘অবৈধ একতরফা নিষেধাজ্ঞার’ বিরোধী এবং চীন তার কোম্পানিগুলোকে আইন ও নিয়ম নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করতে বলেছে।
“ইরান পরিস্থিতির ক্ষেত্রে, এখনকার জরুরি অগ্রাধিকার হচ্ছে যে কোনো মূল্যে যুদ্ধ ফের শুরু হওয়া থামানো, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অন্য দেশের দিকে কাদা ছোড়া নয়,” বলেছেন তিনি।
চীনকে চাপে রাখার ‘অস্ত্র কম’
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে জনসমর্থন কমতে থাকা ট্রাম্পের হাতে ইরান নিয়ে চীনকে চাপ দেওয়ার মতো কার্যকর হাতিয়ার খুব একটা নেই।
নিষেধাজ্ঞা আর শুল্কের ওপর ভর করতে পারেন তিনি, কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের ওপর নৌ অবরোধ দিয়ে রেখেছে। ট্রাম্প একসময় হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলে যুক্তরাষ্ট্রেরই ফি ধার্য করার সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন, যা অবশ্যই বেইজিংকে তাঁতিয়ে দিত।
কিন্তু দেশের ভেতর এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবল চাপের মুখে পড়ে হোয়াইট হাউস এখন বলছে, হরমুজে অবাধ নৌচলাচলই দেখতে চান ট্রাম্প।
দিনকয়েক আগে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে কোনো দেশ বা গোষ্ঠীরই যে টোল আরোপের অনুমতি থাকা উচিত নয়—সে ব্যাপারে ওয়াশিংটন ও বেইজিং একমত।
দৃশ্যত, ওয়াশিংটনের হাতে এখন নিষেধাজ্ঞাই চীনকে চাপ দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
ইরানকে নিষেধাজ্ঞা-অবরোধ এড়িয়ে যেতে সহায়তাকারী একাধিক চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে নানান অর্থনৈতিক সাজাও চাপিয়েছে, তবে সেসব পদক্ষেপ আদতে চীন-ইরান বাণিজ্যে খুব একটা প্রভাব ফেলছে না বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
ঝুঁকি বিষয়ক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজরসের ব্যবস্থাপনা অধ্যক্ষ ব্রেট এরিকসন বলছেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসায় সহযোগিতা দেওয়া চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করলে যুক্তরাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে চীনকে চাপে ফেলতে পারবে না।
“সত্যিকার অর্থে যাদের গুরুত্ব আছে, সেই চীনা ব্যাংগুলোকে নিয়ে কিছু করতে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় আগ্রহী নয়,” বলেছেন তিনি।
চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞার সুযোগ সম্বন্ধে সরাসরি অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চীনের বেআইনি অর্থায়ন সংক্রান্ত হাজার হাজার ‘সম্ভাব্য টার্গেট’ রয়েছে।
“চীনের ব্যাংকগুলোকে নিশানা করা ছাড়া ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার বাস্তবায়ন যে অসম্ভব, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই,” বলেছে সূত্রটি। সঙ্গে এও বলেছে, ইরানি তেলের ক্রেতাদের হুমকি-ধামকি দেওয়া চললেও বড় চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মার্কিন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
এপ্রিলে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানি তেল ক্রয়ে সহযোগিতার অভিযোগে দুটি অনামা চীনা ব্যাংককে সতর্ক করে চিঠি পাঠিয়ে বলেছিলেন, তার মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ট্রাম্পের এবারের চীন সফরে বেসেন্ট প্রসঙ্গটি ফের তুলবেন বলেও মনে করা হচ্ছে—এ সংক্রান্ত পরিকল্পনা বিষয়ে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে এ কথা বলেছে।
বেইজিংয়ের পাল্টা পদক্ষেপ ‘হতে পারে মারাত্মক’
বেইজিংয়ের পাল্টা পদক্ষেপের ভয় থেকেই ওয়াশিংটন চীনা ব্যাংক খাতকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে অনিশ্চয়তায় ভুগছে, মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ছোট বা মাঝারি কোনো চীনা ব্যাংকের ওপরও যদি যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেয়, এবং বেইজিং যদি পাল্টা ব্যবস্থা নেয় তাহলে দুই দেশ আবারও অর্থনৈতিক যুদ্ধাবস্থায় ফিরে যেতে পারে, বলছেন কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জিওইকোনমিক সেন্টারের পরিচালক এডওয়ার্ড ফিশম্যান।
দুই দেশ এমন কোনো পথে গেলে ফের একে অপরের পণ্যে শতভাগ বা তারও বেশি শুল্ক আরোপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—যা যুক্তরাষ্ট্র ও চীন গত বছর থেকে স্থগিত রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এখন যে মূল্যস্ফীতি, তার সঙ্গে এ ধরনের পাল্টাপাল্টি শুল্ক মার্কিন অর্থনীতিকে মারাত্মক চাপে ফেলবে, যার রাজনৈতিক পরিণতি ট্রাম্পের জন্য মোটেও সুখকর হবে না।
“ইরানের মতো কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান বোমা ফেললে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার মারাত্মক প্রভাব তো পড়েই, তবে চীনের রাষ্ট্র-মালিকানাধীন বড় কোনো ব্যাংকে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব তার চেয়েও মারাত্মক হবে,” বলেছেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা নীতি ও বাস্তবায়ন বিষয়ক সাবেক পরিচালক জিম মুলিন্যাক্স।
চীনা ব্যাংকের ওপর যে কোনো আঘাতের পাল্টায় বেইজিং তার আরেক শক্তিশালী অস্ত্র ‘বিরল খনিজ’ও সামনে নিয়ে আসতে পারে।
বিশ্বে ‘বিরল খনিজ’ শোধন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে। গত বছরের বাণিজ্য যুদ্ধের সময় বেইজিং প্রক্রিয়াজাত বিরল খনিজ যেন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে না পৌঁছায় সে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল।
এ ধরনের খনিজ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর প্রযুক্তি ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটাই অচল হয়ে পড়তো। চীনা হুমকিতে অনেকটা বাধ্য হয়েই ওয়াশিংটনকে শুল্ক যুদ্ধ থেকে পিছু হটতে হয়।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র না চাইলেও এবারের শি-ট্রাম্প বৈঠকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গ উঠতে পারে।
ইরানের সামরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করার অভিযোগে শুক্রবারই ওয়াশিংটন চীনভিত্তিক তিন কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। সোমবার বেইজিংয়ের দিক থেকে এর কড়া প্রতিবাদও এসেছে।
সাবেক মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্ট ক্যাম্বেল অন্য আরেকটি দিকও সামনে এনেছেন। তার মতে, চীন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষা নিয়েছে, যে কারণে পশ্চিম এশিয়ায় বেশি জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে তারা সতর্ক থাকবে। এ কারণে ইরানের ওপর ব্যাপক চাপ প্রয়োগের অনুরোধ তারা এড়িয়ে যাবে—এমন সম্ভাবনাই বেশি।
“যে কোনো পরিস্থিতিতেই চীনাদের গভীরভাবে সম্পৃক্ত করাটা কঠিন হবে। তারা সতর্ক থাকতে চাইবে—কারণ, রাজনৈতিক চোরাবালি তারা অন্যদের মতোই ভালো বোঝে,” বলেছেন ক্যাম্বেল।