Published : 05 Jun 2026, 12:31 PM
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিনকে পরপর আতিথেয়তা দেওয়ার কয়েক সপ্তাহ বাদেই উত্তর কোরিয়ায় যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া শুক্রবার জানিয়েছে, আগামী সোমবার থেকে শুরু হতে যাওয়া দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে শি উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ-ও এ সফরের কথা নিশ্চিত করেছে।
সিএনএন লিখেছে, ২০১৯ সালের পর উত্তর কোরিয়ায় এটিই হবে শি’র প্রথম সফর এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে জটিল সম্পর্ককে উষ্ণ করার জন্য বেইজিংয়ের সর্বশেষ পদক্ষেপ। এ বছর এটিই শির প্রথম বিদেশ সফর।
শির সবশেষ বিদেশ সফর ছিল গত বছরের অক্টোবরে, দক্ষিণ কোরিয়ায়। সেই সফরে এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোটের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন তিনি।
এরপর বেইজিংয়ে বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের ঢল নামে। শির আমন্ত্রণে এ বছর ১৭ জন বিশ্ব নেতা বেইজিং সফর করেছেন। চীন সফররত লাও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এ সপ্তাহেই তার সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে।
শি ও কিমের সবশেষ দেখা হয় গতবছর সেপ্টেম্বরে, বেইজিংয়ে সামরিক প্যারডে আমন্ত্রিত বিশ্ব নেতাদের একজন ছিলেন উত্তর কোরীয় নেতা।
ওই প্যারেডে পুতিনও ছিলেন। সেখানে তিন আলোচিত নেতা অভূতপূর্ব ঐক্য প্রদর্শন করেন।
শি তার উত্তর কোরিয়া সফরের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প ও কিমের দূরত্ব কমাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছেন কি না, সেই জল্পনা বাড়ছে।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং মে মাসে বলেছিলেন, চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যে কোনো বিনিময় “উভয় পক্ষের স্বার্থের পাশাপাশি অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য কাজ করে।”
সিএনএন লিখেছে, ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে কিমের সঙ্গে তিনবার দেখা করেছিলেন, যা ছিল উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের একটি ‘ঢাকঢোল পেটানো’ প্রচেষ্টা, যা শেষ পর্যন্ত থমকে যায়। ট্রাম্প সেই কূটনীতি পুনরায় শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন একাধিকবার।
মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বেইজিংয়ে তিন দিনের সফরকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেসব বিষয়ে চীনা নেতার সঙ্গে আলোচনা করেছেন, তার মধ্যে কোরীয় উপদ্বীপের বিষয়টিও ছিল।
হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, দুই নেতারই “উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার একটি লক্ষ্য রয়েছে।”
সিএনএন লিখেছে, প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই উত্তর কোরিয়া তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংবামাধ্যমের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহেই কিম অস্ত্র তৈরির উপযোগী পারমাণবিক উপাদান উৎপাদনকারী একটি নতুন কারখানা পরিদর্শন করেছেন এবং বলেছেন যে পিয়ংইয়ং পারমাণবিক শক্তিকে ‘জ্যামিতিক হারে শক্তিশালী করার’ পরিকল্পনা করছে।
কিম গত শরতে ট্রাম্পের সঙ্গে ফের বসার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে তা কেবল তখনই সম্ভব, যখন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্য থেকে সরে দাঁড়াবে।
ট্রাম্পের পক্ষে তা মেনে নেওয়া সম্ভব কি না তা বলা কঠিন, কারণ তিনি ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধে নেমেছেন।
সিএনএন লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক, বেইজিংয়ের অন্যতম জটিল অংশীদারত্ব এগিয়ে নেওয়ার নিজস্ব এজেন্ডা নিয়েই পিয়ংইয়ংয়ে পৌঁছাবেন শি।
উত্তর কোরিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক লাইফলাইন হল চীন। তাদের বৈদিশেকি বাণিজ্যের সিংহভাগের চীনের সঙ্গেই হয়। দীর্ঘদিন ধরে পিয়ংইয়ংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবেও বিবেচিত বেইজিং।
তবে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি ও অস্ত্র পরীক্ষার বিষয়ে পথেষ্ট সতর্ক অবস্থান রক্ষা করে এসেছে বেইজিং।
উত্তর কোরিয়ার কর্মকাণ্ডের কারণে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি নজর থাকে এবং এমন এক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি করে, যা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সীমান্ত থাকা চীনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সম্পর্ক লক্ষণীয়ভাবে শীতল ছিল; বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে উত্তর কোরিয়া তার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছিল।
পরে তারা মস্কোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হয় এবং ইউক্রেইনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধে সহায়তার জন্য হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করে বলে ধারণা করা হয়।
সিএনএন লিখেছে, বৈশ্বিক অস্থিরতার মুহূর্তে সম্পর্কের গুরুত্বের বার্তা দিতে এবং সম্পর্কে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার তাগিদ দেওয়ার জন্য শির কাছে এ সফরটি একটি সুযোগ।
ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা, কিউবা ও ইরানকে নিশানা করেছে, কারণ এসব দেশকে ওয়াশিংটন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে।
এদিকে বেইজিং সতর্ক দৃষ্টি রাখছে জাপানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর।
২০২৪ সালে পিয়ংইয়ং সফরের সময় পুতিনকে যেভাবে স্বাগত জানানো হয়েছিল, তার তুলনায় শির অভ্যর্থনা ও কিমের সঙ্গে বৈঠকে কেমন হয়, সেদিকে এখন নিবিড়ভাবে নজর রাখবেন পর্যবেক্ষকরা।
প্রায় সিকি শতাব্দীর মধ্যে পুতিনের প্রথম সেই সফর ছিল জাঁকজমকপূর্ণ এক আয়োজন, যেখানে কিম রাশিয়ার তৈরি বিলাসবহুল গাড়ি ‘অরাস’-এ চড়িয়ে পুতিনকে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন এবং একটি ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছিলেন তারা।
মস্কোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গত মাসে পিয়ংইয়ংয়ে একটি স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্সের উদ্বোধনে অংশ নিয়েছিলেন। যেখানে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করা সেনাদের সম্মান জানানো হয় এবং পুতিনের একটি বার্তা পড়ে শোনানো হয়।
শির এবারের সফর দুই দেশের ১৯৬১ সালের ‘বন্ধুত্ব, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সহায়তা চুক্তি’র ৬৫তম বার্ষিকীর সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। এটি চীনের একমাত্র প্রতিরক্ষা চুক্তি, যা কোরীয় যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার পক্ষে চীনা সেনারা লড়াই করার এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে সই হয়েছিল।