Published : 29 Oct 2025, 05:25 PM
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দুইজনেরই মুখোমুখি বৈঠক আসন্ন দক্ষিণ কোরিয়ায়। এই বৈঠকের আগে দিয়ে সিউলে শুরু হয়েছে 'নো ট্রাম্প!', 'নো চায়না' বিক্ষোভ।
এই বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার তাগিদ- দু’য়ে মিলে বেকায়দায় পড়া দক্ষিণ কোরিয়াকে স্বাগত জানাতেই হচ্ছে এই দুই প্রতিপক্ষ পরাশক্তি দেশের নেতাকে।
দক্ষিণ কোরিয়ার গিয়ংজু শহরে বুধবারেই পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে তাকে সর্বোচ্চ সম্মাননা দিয়ে স্বাগত জানানো হলেও ট্রাম্পের আগমন ঘিরে ছিল ক্ষুব্ধ নাগরিকদের প্রতিবাদ।
ট্রাম্প দেশটিতে পৌঁছানোর আগেও গত শনিবার রাজধানী সিউলের কেন্দ্রস্থলে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কাছে 'নো ট্রাম্প!' স্লোগানে এগিয়ে যায় শত শত মানুষের বিক্ষোভ মিছিল। তারা যতই দূতাবাসের প্রবেশপথের কাছাকাছি আসছিল, ততই চড়া হচ্ছিল আওয়াজ।
পুলিশের বাস দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে বিক্ষোভকারীদের ফটকে পৌঁছানো ঠেকানো হলেও, মাইকের কারণে তাদের আওয়াজ গোয়াংওয়ামুন স্কয়ার ছাপিয়ে ট্রাম্পের প্রতিনিধিদের কানে পৌঁছে যায় ঠিকই।
চীন বিরোধী আরেকটি বিক্ষোভও এদিন হয়েছে। শোনা গেছে স্লোগান: “নো চায়না, 'সিসিপি (চায়নিজ কমিউনিস্ট পার্টি) দূর হও!” সেটিও ছিল কয়েকশ মানুষের বিক্ষোভ।
দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে এই বিক্ষোভ সমাবেশগুলো আকারে ছোট হলেও তা এক জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতিরই ইঙ্গিত দেয়। যেখানে দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ুংকে এ সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নেতার আতিথেয়তা করতে হচ্ছে।
ট্রাম্প এবং শি জিনপিং এর মধ্যে আগামী বৃহস্পতিবার মুখোমুখি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) সম্মেলনের ফাঁকে হবে এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক।
দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘদিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ১৯৫০-৫৩ সালের কোরিয়া যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের সহায়তার কথা স্মরণ করে দুই দেশই তাদের সম্পর্ককে 'রক্ত দিয়ে গড়া' বন্ধুত্বের বলে উল্লেখ করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার এখনও তাদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন। কিন্তু একইসঙ্গে, বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও তাদের জন্য দরকার।
থিংকট্যাংক ‘কার্নিগ এন্ডোওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’- এর বিশ্লেষক ডার্সিয়ে ড্রাউড-ভেজারেস এর মতে, এ এক অনাকাঙ্খিত মূহূর্ত। দক্ষিণ কোরিয়া এক জটিল, অনভিপ্রেত অবস্থায় পড়ে গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে এখন দুই পরাশক্তির মধ্যে কৌশল করে চলার চেষ্টা করতে হচেছ।
এই কৌশল নিতে গিয়ে তার দেশ এখন ট্রাম্প-শি বৈঠকেরও আয়োজন করছে। এই বৈঠক থেকে দুই দেশের বাণিজ্য যুদ্ধের কোনও সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে বলেই আশা।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টও অন্য অনেক দেশের মতো বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার চাপে আছেন। প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ুং ছয় মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর, গত জুনে দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষমতায় আসেন।
তার ক্ষমতা গ্রহণের পরই ট্রাম্পের বাণিজ্য শুল্ক নীতি মিত্র ও প্রতিপক্ষ সবাইকেই হতবাক করেছে। এরপর আলোচনা শুরু হয়। গত আগস্টে লি হোয়াইট হাউজে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন।
বিনিময়ে ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে আনতে রাজি হন। শক্তিশালী বন্ধু রাষ্ট্রকে তুষ্ট করা গেছে- এমনটিই ভেবেছিলেন লি।
কিন্তু এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার হুন্দাই কারখানায় অভিবাসন বিরোধী এক বড় ধরনের অভিযানে ৩০০-র বেশি দক্ষিণ কোরিয়কে আটকের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তবে এতেই দুই দেশের সম্পর্ক ভেঙে গেছে এমন মনে করেন না শনিবার সিউলে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করা ৩০ বছর বয়সী হাই ইউন লি।
হোয়াইট হাউজ দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে নগদ বিনিয়োগের মতো আরও দাবি তুলেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের চেষ্টা চলার পরও কোনও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। বুধবারের দুই নেতার বৈঠকে কোনও অগ্রগতি হবে এমন আশাও কম।
এশিয়া সোসাইটির ইউএস-চায়না রিলেশনস সেন্টার-এর সিনিয়র ফেলো জন ডেলুরির মতে, “ট্রাম্পের এই সফরকালে দক্ষিণ কোরিয়ার সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন কিংবা ব্যর্থতার অনেক ঝুঁকি আছে।
“কিন্তু মজার বিষয় হল, ডনাল্ড ট্রাম্প যত কম সময় এখানে থাকবেন, প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ুংয়ের জন্য তা ততই ভাল হতে পারে। কারণ, বাণিজ্য চুক্তিতে কোনও অগ্রগতি হবে -তেমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।”
দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও মোহভঙ্গের একটি কারণ তার বিতর্কিত রাজনীতি। বিক্ষোভে যোগ দেওয়া এক শিক্ষার্থী ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন নিয়ে এসেছিলেন। এতে ট্রাম্পের টাকা উগলানোর চিত্র আঁকা ছিল।
বিক্ষোভকারী ওই শিক্ষার্থী বলেন,'যখন ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়াকে 'টাকা তৈরির মেশিন' বলেছিলেন, তখন আমি সত্যিই ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম।' তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়াকে 'ক্যাশ কাউ' হিসেবে দেখছে, বিশাল বিনিয়োগ চাচ্ছে, সমান অংশীদার হিসেবে গণ্য করছে না।
তারপরও দক্ষিণ কোরিয়রা অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে বলেই মনে হয়। এবছর শুরুতে চালানো জনমত জরিপে দেখা গেছে, ১০ জনে প্রায় ৯ জন দক্ষিণ কোরিয়ই যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবেই দেখে। যদিও এই জরিপ চালানো হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায় অভিবাসন বিরোধী অভিযানের আগে।
তবে চীন সম্পর্কে দক্ষিণ কোরিয়দের ধারণা ততটা ইতিবাচক নয়। জরিপে দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশ দক্ষিণ কোরিয় নাগরিক চীনকে তাদের দেশের সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মনে করে।
দক্ষিণ কোরিয়া চীন বিরোধী মনোভাব ক্রমেই বেড়েছে ২০১৬ সাল থেকে। সে সময় সিউল উন্নত মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করতে রাজি হয়েছিল। এতে ক্ষব্ধ চীন দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল।
তার ওপর দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বিদ্বেষ এবং অস্বস্তিকর সম্পর্ক বরাবরই ছিল। তাছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল এর অভিশংসন ঘিরে চীনের প্রভাব নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্বে অবিশ্বাস আরও বেড়েছে।
সিউলে চীনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া এক বিক্ষোভকারী বলেন, 'আমি আজ এখানে এসেছি দক্ষিণ কোরিয়াকে ভালোবেসে, দক্ষিণ কোরিয়াকে রক্ষা করতে।'
তিনি বলেন, 'আমার মনে হয়, রিপাবলিক অব কোরিয়া ধীরে ধীরে চীনের প্রভাবাচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে।' তবে তিনি স্বীকার করেন যে, 'অবশ্যই চীনের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিযার নির্দিষ্ট মাত্রায় একটি অনুকূল কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত।
তবে “আমরা সিসিপি-কে (চীনা কমিউনিস্ট পার্টি) অপছন্দ করি”, বলেন ওই বিক্ষোভকারী।
পর্যবেক্ষকরা অবশ্য বলছেন, এই চীন-বিরোধী মনোভাব একটি সংখ্যালঘু মত। তবে তাদের মতে, চীন-বিরোধী মনোভাব যে একটু বেড়েছে সেটিও অস্বীকার করা কঠিন। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া চীনা পর্যটকদের জন্য ভিসা নীতি শিথিল করার পর তা কিছুটা বেড়েছে।
প্রেসিডেন্ট লি চীন বিরোধী সমাবেশ এবং ঘৃণা ও বৈষ্যম্য ছড়ানো দমন করতে বিলও এনেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তার সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী।
লি জে-মিয়ুং নিজে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের পক্ষে। তিনি আগামী শনিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একান্তে বৈঠকও করবেন। বেইজিং থেকে অল্প দূরত্ব হওয়ার পরও গত ১১ বছরে এটি শি-র দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথম সফর।
শি বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ায় যাবেন। ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি অ্যাপেক সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি গিয়ংজুতে যাবেন। সেখানে তিনদিন থাকবেন তিনি। ট্রাম্পের চেয়ে বেশি সময় ধরে শি দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকবেন।
এতে চীন স্থিতিশীল বাণিজ্য অংশীদার ও বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপনের সুযোগ পাবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন-এর চীনের প্রতি কঠোর নীতির বিপরীতে, বর্তমান প্রেসিডেন্ট লি-র চীনের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে দক্ষিণের আলোচনার পথ খুলে দিতে পারে।
তবে কিমের বিষয়টি ছাড়াও এই সপ্তাহটি দক্ষিণ কোরিয়া এবং এর প্রেসিডেন্ট লি এর জন্য মস্ত এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতিতে রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রোথিত। ফলে এটি উপেক্ষা করা কঠিন।
কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া এখন একটি সম্পদশালী এবং সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে অন্য দেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেলার ক্ষমতাসম্পন্ন (সফট-পাওয়ার জায়ান্ট) হিসেবে নিজেদের কণ্ঠস্বর নিয়ে উঠে আসছে।
কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী পোশাক কোরিয়ান হ্যানবোক বর্তমানে পশ্চিমাদের কাছেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিশেষ করে কে-ড্রামা, কে-পপ এবং কোরিয়ান সংস্কৃততে ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কারণে অনেকেই ঐতিহ্যবাহী এই পোশাক নিচ্ছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার কে-বিউটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হচ্ছে। অর্থনীতিও গতি ফিরে পেয়েছে। তবে দেশটির প্রেসিডেন্ট লি বিশ্বের দুই সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি কোনও এক পক্ষকে অবহেলা করতে পারবেন এমনটি কল্পনা করা কঠিন।