Published : 26 May 2026, 01:44 AM
জার শাসনামলে পারস্যে রাশিয়ার দূত ছিলেন আলেক্সান্ডার গ্রিবোয়েদভ, যাকে আজও একজন আদর্শ রুশ কূটনীতিক হিসেবে দেখা হয়।
এখন থেকে ১৯৭ বছর আগে তেহরানে গুলিতে মৃত্যু হয় তার। তার মরদেহ বিকৃত করা হয় এবং আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেওয়া হয়।
রুশ অভিজাত শ্রেণির কাছে ৩৪ বছর বয়সী এই রাষ্ট্রদূত ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার এক ব্যক্তিত্ব।
‘অও ফ্রম উয়েট’ নামে তিনি একটা জনপ্রিয় ব্যঙ্গাত্মক নাটক রচনা করেছিলেন, যা এখনো রাশিয়ার পাঠ্যপুস্তকের অংশ।
বহু ভাষায় তার দখল ছিল। নির্ভীকে সেনা ও বিচক্ষণ কূটনীতিক হিসেবেও সুনাম ছিল তার।
গ্রিবোয়েদভ একবার ইরানের শাহ ফাতহ-আলির একটি দাবি প্রত্যাখান করার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। ওই সময় রাশিয়ার আশ্রয়ে থাকা আর্মেনীয়দের হস্তান্তরের দাবি তুলেছিল ইরানের তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী।
গ্রিবোয়েদভের এই প্রত্যাখ্যানের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে হাজার হাজার উত্তেজিত পারসিয়ান ১৮২৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রুশ দূতাবাসে হামলা চালায়। এতে রাষ্ট্রদূতসহ বহু কূটনীতিক এবং অশ্বারোহী সেনার প্রাণ যায়।
তবে রাশিয়াবিরোধী এই দাঙ্গার শিকড় ছিল অনেক গভীরে।

ছবি: এআই (জেমিনাই)
‘রক্তাক্ত হীরা’
১৮২৯ সালের জানুয়ারিতে গ্রিবোয়েদভকে তেহরান থেকে ২ কোটি রুবল (বর্তমান মূল্যে প্রায় ২০০০ কোটি ডলার) আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
১৮২৬ থেকে ১৮২৮ সাল পর্যন্ত চলা রুশ-পারস্য যুদ্ধে পরাজয়ের পর ইরানের ওপর এই ক্ষতিপূরণ চাপানো হয়েছিল, যা রাশিয়ার নতুন ক্ষমতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
গ্রিবোয়েদভ বুঝতে পেরেছিলেন, এই বিশাল জরিমানা পারস্যের অর্থনীতিতে বড় রকমের প্রভাব ফেলবে।
তিনি একে ‘বর্ণনাতীত দুর্দশা’ ডেকে আনার সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেন।
তার ভাষায়, এই ক্ষতিপূরণ পারস্যকে প্রায় নিঃস্ব করে দিয়েছিল। এই ক্ষতিপূরণ মেটাতে গিয়ে শাহ’র পরিবারকে সোনার ঝাড়বাতি এবং পোশাকের মূল্যবান পাথরের বোতামও দিয়ে দিতে হয়েছিল।
জারশাসিত রাশিয়া তখন বর্তমান আজারবাইজান, আর্মেনিয়া ও জর্জিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল দখল করে নেয়। দাগেস্তানও দখল হয় তখন, যা এখনও রাশিয়ার সবচেয়ে ‘বহুজাতিক’ প্রদেশ হিসেবে পরিচিত।
দূতাবাসের হত্যাকাণ্ড এবং গ্রিবোয়েদভের মৃত্যুর পর পারস্যের লোকজন রাশিয়ার প্রতিশোধের আশঙ্কা করছিল। এই আশঙ্কা থেকে ১৮২৯ সালের অগাস্টে শাহ’র নাতিকে পাঠানো হয় সেন্ট পিটার্সবার্গে।
ওই সময় সেখানকার রাজপ্রাসাদে গিয়ে রাশিয়ার সম্রাট প্রথম নিকোলাসের হাতে উপহার হিসেবে ‘পারস্য ডায়মন্ড’ তুলে দেন তিনি।
৮৯ ক্যারেট ওজনের হলদেটে অষ্টভুজাকৃতির হীরাটি একসময় ভারতের মুঘল সম্রাটদের সম্পদ ছিল। হীরাটি এখনও মস্কোতে সংরক্ষিত আছে।
মস্কোর কেন্দ্রস্থলে ব্রোঞ্জের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রিবোয়েদভ আজও রুশ কূটনীতিকদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার প্রতীক।
২০২০ সালের এক বক্তৃতায় রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ তাকে স্মরণ করে বলেন, “গ্রিবোয়েদভ ছিলেন আমাদের মহান পূর্বসূরিদের একজন, যিনি মাতৃভূমির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলে।”
কিয়েভভিত্তিক রাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পেন্টা সেন্টারের প্রধান ভলোদিমির ফেসেঙ্কোর ভাষায়, “রাশিয়া ও ইরানের দ্বন্দ্বের ইতিহাসে গ্রিবোয়েদভের মৃত্যু সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা।”

কোসাক থেকে শাহ
উনবিংশ শতকের বাকি সময়জুড়ে দক্ষিণ ককেশাস ও মধ্য এশিয়ায় পারস্যের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের ভূখণ্ড দখল করতে থাকে রাশিয়া।
তারা পারস্যকে এশিয়ার দুর্বল মিত্র রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে শুরু করে। এছাড়া এশিয়া নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে চলা ‘গ্রেট গেইমে’ তারা এ অঞ্চলকে একটা গুটিতে পরিণত করে।
তবে পারস্যে ব্রিটিশ প্রভাব মোকাবেলার লক্ষ্যে দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ১৮৭৯ সালে রুশ-পারস্য ‘কোসাক ব্রিগেড’ গঠনে সহায়তা করেন।
এই সামরিক ইউনিট গড়ে ওঠে কোসাকদের আদলে, যারা রুশ সাম্রাজ্যের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
এখনকার মধ্য ইউক্রেইন অঞ্চল থেকে তাদের উৎপত্তি। তারা অশ্বারোহী যুদ্ধকৌশল ও আগ্নেয়াস্ত্রের সমন্বয়ে ভয়ংকর এক সামরিক শক্তিতে রূপ নেয়।
পারস্যে কয়েক বছরের মধ্যেই সবচেয়ে শক্তিশালী ও ভীতিকর সামরিক বাহিনী হিসেবে আবির্ভূত হয় এই ব্রিগেড। এটা অনেকটা রোমান সাম্রাজ্যের প্রেটোরিয়ান গার্ড বা তুর্কি জেনিসারিদের মতো হয়ে ওঠে, যারা সম্রাট বা সুলতানদের ক্ষমতায় বসানো বা সরানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখত।
এই বাহিনীই একসময় শাহ রেজা পাহলভির উত্থানে সহায়তা করেছিল।
১৯২০ সালে নবগঠিত সোভিয়েত সরকার উত্তর পারস্যকে ‘গিলান সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র’ নামে কমিউনিস্ট অঞ্চলে রূপান্তরের চেষ্টা করে। কিন্তু ১৯২১ সালের শেষ দিকে রেজা খানের বাহিনীর আক্রমণে সেই প্রজাতন্ত্র ভেঙে পড়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত নেতা স্টালিন ইরানের কাছে একচেটিয়া তেল সুবিধা দাবি করেন। না দিলে ইরানের ভেতরে কুর্দিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপ দেওয়ার হুমকি দেন তিনি।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি তেলসংক্রান্ত সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং কুর্দিস্তানের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পর মস্কো থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন। অন্যদিকে পশ্চিমাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি।
এমনকি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে পাহলভি রাজবংশের পতনের পরও ইরানের নতুন ধর্মীয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত রাশিয়াকে প্রায়ই ‘ছোট শয়তান’ বলে আখ্যায়িত করত, যে শব্দটি সাধারণত ইসরায়েলের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো।
তবে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

কৌশলগত মিত্র?
১৯৯০-এর দশকে এসে ইরানের মধ্যে আর রুশ দখলদারত্ব নিয়ে ভয়ের কারণ ছিল না। বরং রাশিয়া তখন মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব ধরে রাখার ক্ষেত্রে ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখা শুরু করে।
মস্কো ওই সময় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে আনা অনেক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব আটকে দেয়।
অন্যদিকে তেহরান রাশিয়ার অস্ত্র, যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ছোট অস্ত্র কেনায় কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে।
১৯৯৭ সালে সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্র তাজিকিস্তানে গৃহযুদ্ধের অবসানে ১৯৯৭ সালে যে শান্তি চুক্তি হয়, তাতে মস্কো ও তেহরানের ভূমিকা ছিল। তাজিকিস্তানের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক সম্পর্কও আছে।
সম্প্রতি রুশ প্রতিষ্ঠান রোসাটম জার্মান নকশায় বুশেহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ সম্পন্ন করেছে। দক্ষিণ ইরানে আরো চারটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে গেল বছর ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তিও করেছে উভয় পক্ষ।
ইরান বর্তমানে যে পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করে, তার প্রায় ৬ শতাংশ উত্তোলন করে দেয় রাশিয়ার জ্বালানি কোম্পানিগুলো।
এছাড়া রাশিয়ার তেল ভারত মহাসাগর দিয়ে পরিবহনের জন্য উত্তর-দক্ষিণ অঞ্চলে মস্কো একটি করিডোরও বানিয়েছে।
২০২২ সালে ইরানকে মহাকাশ কেন্দ্র ব্যবহার করে খাইয়াম নামে ইরানের প্রধান অপটিক্যাল ইমেজিং স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের অনুমতি দেয় রাশিয়া।
এর ক্যামেরার যে ক্ষমতা, তা দিয়ে সহজেই মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরে যুদ্ধজাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যায়।
তবে কোনো কোনো বিশ্লেষক রাশিয়া-ইরান সম্পর্ককে ‘স্বার্থের দেনাপাওনা’ হিসেবে দেখেন বলে আল জাজিরা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ নিকিতা স্মাগিন আল জাজিরাকে বলেন, “তাদের কাছাকাছি আসার মূল কারণটা একেবারেই বাস্তববাদী— দুই দেশই আন্তর্জাতিকভাবে কিছুটা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
“কিন্তু তারা একে অপরকে সত্যিকারার্থে পছন্দ করে না।”
স্মাগিন আরও বলেন, “ঐতিহাসিকভাবে ইরানিদের কাছে রাশিয়াকে নিয়ে ইতিবাচক স্মৃতি নেই বললেই চলে। ইরানে রক্ষণশীল গণমাধ্যমও বলে— রাশিয়াকে বিশ্বাস করা যায় না।”

তবে ইউক্রেন, মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো তাদের পূর্ববর্তী প্রভাব বলয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রতি দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস এই দেশ দুটিকে এক করেছে।
কিয়েভভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পেন্টা সেন্টারের ফেসেঙ্কো বলেন: “তাদেরকে এক করেছে একটি অভিন্ন শত্রু, কিংবা বলা যায় অভিন্ন এক ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
“আদর্শিক ও ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমেরিকার বিরুদ্ধে এই বন্ধুত্বের মূল কারণ সেটাই।”
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই সম্পর্ককে তুলে ধরেছেন ‘কৌশলগত অগ্রাধিকার’ হিসেবে।
২০২৪ সালে ব্রিকস সম্মেলনে পুতিন বলেন, “আমাদের সম্পর্ক প্রকৃতপক্ষে মিত্রদের মতোই।”
পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব মোকাবেলার লক্ষ্যে পুতিন ২০২৩ সালে ব্রিকসে ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।
পরের বছরের শুরুতে ইরান এই জোটে যোগ দেয়। এরপর থেকে এর নাম হয় ‘ব্রিকস প্লাস’।
রুশ নেতা তেহরানকে পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখেন, যা মস্কোকে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।
একইসঙ্গে এটি রাশিয়াকে ‘মুসলমানবান্ধব’ রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। যদিও নিজ দেশের মুসলমান জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ক্রেমলিনের সম্পর্কটা বেশ জটিল।
এই জোটের বেশ জোরালো ভূমিকা দেখা যায় সম্ভবত ২০১৫ সালে। ওই বছর মস্কো ও তেহরান মিলে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতন ঠেকাতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রুশ সেনারাই প্রথম বিদেশি, যারা ইরানের মাটিতে সামরিক কার্যক্রম চালিয়েছে।
গত এক দশকে চীনও ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে তাদের সঙ্গে অবস্থান নিয়েছে।
আজারবাইজানের বাকুভিত্তিক ‘মিনভাল পলিটিকা’ সাময়িকীর প্রধান সম্পাদক এমিল মুস্তাফায়েভ বলেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া, ইরান ও চীনের মধ্যে স্বার্থের একটি স্থিতিশীল কাঠামো তৈরি হয়েছে।”
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “এটি প্রচলিত অর্থে আনুষ্ঠানিক কোনো জোট নয়, বরং এটি পশ্চিমা চাপের প্রতি অভিন্ন বিরোধিতা। এই সম্পর্ককে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কৌশলগত আকাঙ্ক্ষা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
স্মাগিনের মতে, “এই ত্রিভুজ সম্পর্কে চীন সবচেয়ে শক্তিশালী এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সতর্ক পক্ষ।
“চীন ইরানকে রক্ষা করতে তেমন তাড়াহুড়া করেনি। রাশিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয়, কিন্তু চীনের মতো এত সম্পদ ও সক্ষমতা রাশিয়ার নেই।”
গত বছরের শুরুতে মস্কো ও তেহরান সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে। কিন্তু তাদের মধ্যে এখনো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়নি। এর কারণও মূলত অঞ্চলটিতে রাশিয়ার অন্যান্য সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত।

‘স্বার্থের সম্পর্ক’
মস্কো কখনোই পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন করেনি।
ইউক্রেইনে যুদ্ধ জড়ানোর প্রতিবাদে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাকরি ছেড়ে দেওয়া রাশিয়ার কূটনীতিক বোরিস বোন্দারেভ বলেন, "রাশিয়া স্বাভাবিকভাবেই এই অঞ্চলে তার প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা এবং সব পক্ষকে খুশি রাখার চেষ্টা করে।"
রাশিয়া ইসরায়েলের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলে।
২০০৯ সালে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেস মস্কো সফরে গিয়েছিলেন। ওই সময় আল জাজিরাকে তিনি বলেন, তার সফরের উদ্দেশ্য হলো, তেহরানের কাছে উন্নত 'এস-৩০০' বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিক্রির বিষয়টি ক্রেমলিন যেন ‘পুনর্বিবেচনা’ করে দেখে।
মস্কো ২০১৬ সাল পর্যন্ত ওই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিক্রির সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখে। ফলে ২০২৪ সালে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইসরায়েলের ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমানের কাছে অনেকটা অসহায় প্রমাণিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ওই যুদ্ধবিমান ইরানের রাডারগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিল এবং অনেকগুলো ধ্বংস করেছিল।
এর আগে ২০১২ সালে জেরুজালেমে পুতিনকে স্বাগত জানান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেছিলেন, তারা দুই দেশই একমত হয়েছেন যে, “ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র একটি গুরুতর বিপদ। এই বিপদ শুধু ইসরায়েলের জন্য নয়, এই অঞ্চল এবং পুরো বিশ্বের জন্যও।"
অন্যদিকে পুতিন বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনাই একমাত্র সমাধানের পথ। তবে ইসরায়েলে শান্তি বজায় থাকার সঙ্গে রাশিয়ার ‘জাতীয় স্বার্থের’ সম্পর্ক থাকার কথাও বলেন তিনি।
অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার নিয়েও মস্কো এবং তেহরানের মধ্যে এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে।
লন্ডন ইউনিভার্সিটির মিডল ইস্টার্ন অ্যান্ড ইরানিয়ান স্টাডিজের প্রভাষক সাইয়েদ আলী আলাভি ২০২৩ সালে লিখেছিলেন, "রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ককে একটি আনুষ্ঠানিক জোটের চেয়ে ‘স্বার্থের সম্পর্ক’ হিসেবে বর্ণনা করাটাই যুক্তিযুক্ত।"
এখন প্রশ্ন উঠেছে, ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা এবং চলমান ইউক্রেইন যুদ্ধ এই স্বার্থের সম্পর্ককে পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে কিনা।

ইউক্রেইনের আকাশে ড্রোন
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া যখন ইউক্রেইনের সঙ্গে পুরোদমে যুদ্ধে জড়ায়, তখন ইরান তার ‘নিরপেক্ষতার’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করে। যুদ্ধের নিন্দা জানিয়ে তারা জাতিসংঘে আনা প্রস্তাবগুলোতে ভোট দেওয়া থেকে বিরত; এমনকি রাশিয়ার বিপক্ষেও ভোট দেয়।
কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা করতে দেখা গেছে।
২০২২ সালের ১ মার্চ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছিলেন, ওয়াশিংটনের ‘মাফিয়া শাসনের’ জন্য ‘সারা বিশ্বে সংকট বাধানোর প্রয়োজন ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র এজন্য ইউক্রেইনকে ‘বলির পাঠা’ বানিয়েছে।
এর চার মাস পর পুতিন যখন তেহরান সফর করেন, তখন তিনি খামেনির মুখ থেকে পশ্চিমাবিরোধী আরেকটি বক্তব্য শুনতে পান।
খামেনি পুতিনকে বলেছিলেন, "ইউক্রেইনের ক্ষেত্রে আপনি যদি নিজে উদ্যোগী না হতেন, তবে অপর পক্ষই যুদ্ধ শুরু করত।"
তিনি আরো বলেন, "ইউক্রেইনে যদি (নেটো) থামানো না হতো, তবে তারা ক্রিমিয়াকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে দিত।"
খামেনির এই বক্তব্যে পুতিনকে সন্তুষ্ট মনে হয়েছিল। তিনি প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, "পশ্চিমারা যেভাবে আচরণ করছে, তা রাশিয়ার সামনে অন্য কোনো বিকল্প রাখেনি।"
তবে রাশিয়ার নেতা আরো বেশি খুশি হয়েছিলেন যখন ইরান নিরপেক্ষতা ভেঙে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়া শুরু করে এবং 'শাহেদ' ড্রোনও সরবরাহ করে।
ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর মস্কো সেই উপকারের প্রতিদান দেয়। তারা আগের চেয়ে উন্নত করা কিছু ‘শাহেদ ড্রোন’ ইরানে ফেরত পাঠায়।
এগুলোতে 'কোমেটা-বি' স্যাটেলাইট নেভিগেশন মডিউল যুক্ত ছিল, যা ‘জ্যামিং’ এড়াতে সাহায্য করে।
যুক্তরাজ্যের 'দ্য টাইমস' পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্যে একটি ড্রোন ১ মার্চ সাইপ্রাসের একটি ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানে।
সামরিক বিশেষজ্ঞ পাভেল লুজিনের দাবি, মস্কো তেহরানকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর অবস্থান সম্পর্কে ‘লিয়ানা’ স্যাটেলাইট সিস্টেম থেকে তথ্য সরবরাহ করেছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যে হামলায় খামেনি নিহত হন, রাশিয়া সেই হামলার নিন্দাও জানিয়েছিল। কিন্তু পুতিন যে বিষয়টি কখনোই বিবেচনা করেননি, সেটা হলো ইরানকে সাহায্য করার জন্য সেনা পাঠানো।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের' সহযোগী গবেষক রুসলান সুলেইমানভ বলেন, "এই পরিস্থিতি পুতিনের ভাবমূর্তির জন্য একটি বড় ধাক্কা। এটি আবারও সামনে এসেছে যে, পুতিন তাদের মিত্রদের সত্যিই সাহায্য করতে অক্ষম।"
কিছু বিশ্লেষক এমন ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন যে, ইরান সংঘাতের পর মস্কো-তেহরান জোট আর টিকবে না।
কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ইউক্রেন ইস্যুতে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কিছু সুবিধা বা ছাড় পাওয়ার বিনিময়ে ক্রেমলিন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করতে আগ্রহী ছিল।
সাবেক কূটনীতিক বোন্দারেভ বলেন, ইউক্রেইনের বিনিময়ে ইরানকে হাতবদল করার প্রস্তাব মস্কো ‘অবশ্যই দিতে পারে’।

শান্তি আলোচনার শর্ত হিসেবে ডনবাস অঞ্চলের বাকি অংশ ছেড়ে দেওয়ার যে দাবি রাশিয়ার রয়েছে, সেটির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, "তারা (ইরানের ক্ষেত্রে) যুক্তরাষ্ট্রকে যা প্রস্তাব করতে পারে, তা স্পষ্টতই ইউক্রেইনে তারা যা পেতে চায়, তার চেয়ে কম।"
স্মাগিন বলেন, "ইউক্রেইন নিয়ে বড় কোনো ছাড় পেলে তার বিনিময়ে মস্কো সানন্দে ইরানকে ত্যাগ করবে।
“ইউক্রেইনের স্বার্থে ইরানকে হাতবদল করা নিঃসন্দেহে ক্রেমলিনের জন্য লাভজনক হতো এবং সেটা তা করত।"
কিন্তু সেই সময় পার হয়ে গেছে বলে মনে করেন স্মাগিন। কারণ, ইউক্রেইন শান্তি আলোচনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকার কারণে এখন এমন চুক্তির সম্ভাবনা নেই।
রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধকে ইইউয়ের জন্য অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখে ব্রাসেলস। এ কারণ তারা যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের শান্তির প্রস্তাব এবং ইউক্রেইনের সশস্ত্র বাহিনীকে সীমিত করার রুশ দাবির বিরোধিতা করে আসছে।
স্মাগিন বলেন, ইউক্রেইনের সেনাবাহিনীকে ওয়াশিংটন গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করলে রাশিয়াও ইরানকে দেবে না, এমন শর্ত মস্কো দিয়ে থাকতে পারে।
তবে সুলেইমানভ বিশ্বাস করেন, মস্কো এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে কেবল তখনই কিছু ‘দর কষাকষি’ সম্ভব, যদি মস্কোকে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
কিন্তু বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে রাশিয়া সহায়তা দিলেও ইরান যুদ্ধের শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী বানানো হয়েছে পাকিস্তানকে।
মুস্তাফায়েভের মতে, এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মস্কোর তুচ্ছতা এবং ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের গুরুত্বহীনতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
মস্কোকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বেছে না নেওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ রয়েছে। সেটি হলো, রাশিয়ার আগের বিশ্বাসভঙ্গের কথা ইরানের খুব কম মানুষই ভুলে গেছে।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিয়েভের কাছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার ছিল।
১৯৯৪ সালের বুদাপেস্ট স্মারকপত্রে ইউক্রেইন তাদের পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করার বিনিময়ে মস্কো ও ওয়াশিংটন কিয়েভের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছিল।
এর ত্রিশ বছর পর মস্কো ক্রিমিয়াকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করে এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেইনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দেয়।
মুস্তাফায়েভ বলেন, "মধ্যস্থতার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আস্থা অর্জনের প্রয়োজন পড়ে। এই আস্থা এমন এক সম্পদ, যা আজ রাশিয়ার হাতে নেই।"