Published : 26 Jan 2026, 12:42 PM
ইতিহাসে প্রথমবার সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত বছর মূল্যবান এ ধাতুর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। উল্লম্ফনের ওই ধারা যে এখনও অব্যাহত আছে, আউন্সপ্রতি নতুন মূল্য সে সাক্ষ্যই দিচ্ছে।
এমন এক সময়ে সোনার দাম এই নতুন উচ্চতায় পৌঁছাল, যখন গ্রিনল্যান্ড ঘিরে নেটো ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চতার মধ্যে নতুন উদ্বেগ হয়ে যুক্ত হয়েছে।
এর পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতিও বিশ্বের শেয়ার বাজারগুলোকে নিত্যনতুন অস্বস্তিতে ফেলছে। শনিবার তিনি কানাডাকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, অটোয়া যদি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে তাহলে তাদের পণ্যে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
বিবিসি লিখেছে, অনিশ্চয়তার সময়ে সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু কেনাকে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বলে বিবেচনা করে। শুক্রবার রূপার দামও প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। গত বছর এ ধাতুটির দাম প্রায় ১৫০% বেড়েছিল. দাম বৃদ্ধির ওই ধারা এখনও অব্যাহত আছে।
সোনা, রূপার মতো ধাতুগুলোর দাম বাড়ার পেছনে আরও অনেক কিছুর ভূমিকা আছে। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি, মার্কিন ডলার দুর্বল হয়ে পড়া, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বেশি বেশি সোনা ক্রয়, এবং এ বছরও মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা সেগুলোর মধ্যে অন্যতম।
ইউক্রেইন ও গাজা যুদ্ধ, পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের অপহরণকাণ্ডও সোনার দামবৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।
সোনায় আকৃষ্ট হওয়ার অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে বিশ্বজুড়ে এর পরিমাণ স্বল্পতা। এখন পর্যন্ত মাত্র ২ লাখ ১৬ হাজার ২৬৫ টন সোনা উত্তোলন করা হয়েছে বলে জানাচ্ছে বাণিজ্য সংস্থা বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদ।
এ দিয়ে অলিম্পিকের জন্য বানানো তিন কি চারটি সুইমিংপুল ভরাট করা যাবে। যত সোনা উত্তোলিত হয়েছে তার সিংহভাগই করা হয়েছে ১৯৫০ সালের পর থেকে। আধুনিক খনন প্রযুক্তি ও নতুন নতুন খনি আবিষ্কারের ফলে তখন থেকেই বাজারে সোনার পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার অনুমান, আরও ৬৪ হাজার টন সোনা ভূগর্ভস্থ মজুদ থেকে উত্তোলন করা যেতে পারে। তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সোনার সরবরাহ স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনাও প্রকট।
১৯৭৯ সালের পর গত বছরই সোনার দামে অভাবনীয় উত্থান দেখা গেছে, বিনিয়োগকারীরাও মূল্যবাধ এ ধাতুর পেছনেই ছুটেছেন।
ট্রাম্পের শুল্ক, কৃত্রিত বুদ্ধিমত্তা-সংশ্লিষ্ট স্টকের দাম বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে এমন শঙ্কাসহ নানা কারণে আর্থিক বাজারে তুমুল অস্বস্তির মধ্যেই সোনা একের পর এক নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছেূ।
“আমার মনে হয়, এর পেছনে সবচেয়ে বড় দায় হচ্ছে মার্কিন নীতিকে ঘিরে চরম অনিশ্চয়তা,” বলেছেন গবেষণা পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান মেটালস ফোকাসের নিকোস কাভলিস।
মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক এ বছরও তার মূল সুদের হার দুইবার কমাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুদের হার কমার অর্থ হল বিনিয়োগকারীরা বন্ডের মতো বিনিয়োগ থেকে কম লাভবান হবেন, তখন স্বভাবতই অনেকে সোনা, রূপার দিকে ছুটবেন।
“সরকারি বন্ডে টাকা রাখা এখন আর লাভজনক নয়, তাই লোকজন সোনার দিকে ঝুঁকছে,” বলেছেন পেপারস্টোনের গবেষণা কৌশলবিদ আহমাদ আসিরি।
তবে কেবল বিনিয়োগকারীরাই সোনার পেছনে ছুটছেন তা নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও এখন ডলার ছেড়ে সোনা কেনায় মনোযোগ বাড়িয়েছে।
গত বছর বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভে শত শত টন সোনার বার (বুলিয়ন) যুক্ত করেছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদ।
“মার্কিন ডলার থেকে সবাই সরছে, যা সোনার জন্য সুবিধাজনক হচ্ছে,” বলেছেন কাভালিস।
অবশ্য সবাই যে কেবল বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে সোনা কিনছে, তাও নয়।
অনেক সংস্কৃতিতেই উৎসবের সময় সোনা কেনা বা বিয়েসহ নানান আয়োজনে উপহার দেওয়ার চল রয়েছে।
ভারতে, প্রতি বছর দিওয়ালি উৎসবের সময় সম্পদ ও ভাগ্যকে আকৃষ্ট করতে অনেকে মূল্যবান ধাতু কেনেন।
মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক মর্গান স্ট্যানলির হিসাব অনুযায়ী, ভারতের পরিবারগুলোর কাছে তিন লাখ ৮০ হাজার কোটি টন সোনা রয়েছে, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ৮৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
ভারতের চেয়েও সোনা কেনায় এগিয়ে প্রতিবেশী চীন। এশিয়ার সর্ববৃহৎ এ অর্থনীতি বিশ্বের মধ্যে সোনার সবচেয়ে বড় বাজার। সোনা সৌভাগ্য নিয়ে আসে বলে অনেক চীনাই বিশ্বাস করেন।
“চীনা নববর্ষের সময় সোনার চাহিদা অনেকখানি বেড়ে যায়, যা এখনও বোঝা যাচ্ছে,” ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া ‘ইয়ার অব দ্য হর্স’ বা ‘ঘোড়া বর্ষের’ দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন কাভালিস।