Published : 26 Jun 2026, 06:19 PM
ভারতের রাজধানী দিল্লির তপ্ত জুনের ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। মাথার ওপর সূর্য যখন আগুন ঢালছে, ঠিক তখন দিল্লির যন্তর মন্তরে জড়ো হয়েছে শত শত তরুণ-তরুণী। তারা কেউ রাজনৈতিক নেতা নন, কোনো চেনা ছাত্রসংগঠনের চেনা মুখও নন। নিজেদের তারা পরিচয় দিচ্ছেন ‘তেলাপোকা’ বা ‘ককরোচ’ বলে।
গত কয়েক দিন ধরে ভারতের রাজধানী কাঁপিয়ে দিচ্ছে এই তরুণ প্রজন্ম। দাবি একটাই, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং দেশের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার।
ভারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কলেজ ভর্তি এবং স্কুল শেষ করার বোর্ড পরীক্ষাগুলোতে ব্যাপক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ এনে গত শনিবার তারা এই আন্দোলনে নেমেছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান ধর্মঘট চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে তারা।
তরুণ প্রজন্মের এই আন্দোলন সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রিনের গন্ডি ছাড়িয়ে রাজপথে আছড়ে পড়ে গত কয়েক বছরের মধ্যে মোদী সরকারের জনপ্রিয়তার ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার মতো অন্যতম বড় এক প্রতীকী লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
‘সেলফ-ডেপ্রিকেটিং হিউমার’ থেকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’
এই আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। কোনও রাজনৈতিক আদর্শ নয়, বরং আত্মবিদ্রূপ বা (সেলফ-ডেপ্রিকেটিং হিউমার) থেকে জন্ম নেওয়া সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এক মঞ্চ এটি। এ দলের সমর্থক ‘জেনারেশন জেড’ বা জেন-জি তরুণেরা।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে একটি অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন (যদিও পরে তিনি দাবি করেন তার বক্তব্য ভুল প্রসঙ্গে ছড়ানো হয়েছে)। সেই মন্তব্যেরই এক তীব্র ব্যঙ্গাত্মক জবাব হিসেবে জন্ম নেয় এই দল, যার নাম সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ (বিজেপি)-র সঙ্গে মিলিয়ে রাখা।
ইনস্টাগ্রামে মাত্র চার সপ্তাহের কম সময়ে এই পেজের ফলোয়ার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখে, যা ভারতের ভার্চ্যুয়াল জগতে অন্যতম বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকেরা একে গত কয়েক বছরের মধ্যে নরেন্দ্র মোদীর কর্তৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম হিসেবে দেখছেন।

রাতারাতি ইন্টারনেট সেনসেশন হয়ে ওঠা দল এখন ভার্চুয়াল দুনিয়া ছেড়ে দিল্লির রাজপথে নেমেছে। যন্তর মন্তরে কেউ চামচ দিয়ে স্টিলের থালা বাজাচ্ছেন, কেউ গাইছেন জাতীয় সংগীত, আবার কেউ এ আর রহমানের ‘বন্দে মাতরম’ গানের তালে তাল মেলাচ্ছেন। হাতে তাদের ধরা অদ্ভুত সব ব্যঙ্গাত্মক পোস্টার।
ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে, যিনি বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্য পাস করে দেশে ফিরেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, “লাখ লাখ শিক্ষার্থীর সাথে যে অন্যায় হয়েছে, আমরা তার বিচার চাই। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে এই ব্যর্থতার দায় নিতেই হবে।”
তবে অনলাইনে দলটির বিপুল জনপ্রিয়তা মাঠের লড়াইয়ে বড় জনসমাগমে রূপ নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, গত সপ্তাহের শেষদিকে এ বিক্ষোভে কয়েক শ মানুষের উপস্থিতি ছিল। তাদের বেশির ভাগই ১৮ থেকে ২৪ বছরের শিক্ষার্থী, যাদের জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে মোদীর শাসনামলে।
মেরুকরণ নয়, চাই কর্মসংস্থান:
এই তরুণ প্রজন্ম এখন ধর্মীয় মেরুকরণ আর বিদ্বেষের রাজনীতিতে ক্লান্ত। তারা চায় চাকরি, উন্নয়ন এবং সুশিক্ষা। এই শিক্ষার্থীরা বলছে, তারা মোদীর হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণের রাজনীতিতে ক্লান্ত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ২৩ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা সংস্কার ও উন্নয়ন চাই, কোনও ঘৃণার রাজনীতি চাই না।”
ভারতের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশই তরুণ, কিন্তু তাদের সামনে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৯.৯ শতাংশ, যা শহরাঞ্চলে আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩.৬ শতাংশে। ফলে আন্দোলনটা কেবল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি আসলে তরুণদের হারিয়ে যেতে বসা ভবিষ্যতেরও লড়াই।

আন্দোলনের নেপথ্যে গভীর হতাশা
ককরোচ পার্টির সমর্থকদের আন্দোলনের পেছনে কেবল যে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস আছে, তা-ই নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে এক গভীর হতাশা ও বিষাদ।
ভারতে মেডিকেল এন্ট্রান্স বা ‘নিট’ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ভারতজুড়ে তোলপাড় চলছে, যা প্রায় ২৩ লাখ হবু ডাক্তারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে। এর পরপরই স্কুলের চূড়ান্ত পরীক্ষার অনলাইন গ্রেডিং সিস্টেমেও বড় ধরনের জালিয়াতি সামনে আসে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং আরও প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সরকার দ্রুত ‘টেলিগ্রাম’ অ্যাপ নিষিদ্ধ করে এবং বিমানবন্দরের মতো কঠোর নিরাপত্তা দিয়ে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করে। কিন্তু এই কড়াকড়ি অনেকের জন্যই বড্ড দেরিতে এসেছে।
মে মাসে পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পর থেকে ২১ জুনের পুনঃপরীক্ষার মাঝের দিনগুলোতে অন্তত ১২ জন শিক্ষার্থী হতাশা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন।
যন্তর মন্তরে ৪০ ডিগ্রি গরমে পোস্টার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক ২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ক্ষোভ ঝেড়ে বলছিলেন: “আমার বন্ধুরা ডাক্তার হতে চায়, তারা এখন ঘরের কোণে বসে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই আমি আর আমার বোন এখানে এসেছি ওদের হয়ে লড়তে। বড়রা আমাদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে, এখন তরুণদেরই একে অপরের জন্য লড়তে হবে।”
আন্দোলনে অংশ নেওয়াদের একটি অংশ ছিল ইউটিউবার। অনেক আন্দোলনকারী নিজের ইনস্টাগ্রাম পেজের জন্য এ কর্মসূচির ভিডিও ও ছবি তুলেছেন। মূলত ইন্টারনেটে এ আন্দোলনের ভাইরাল হওয়া জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ভিউ ও অনুসারী বাড়ানো ছিল লক্ষ্য।

লড়াইটা কতদূর যাবে?
সহজেই হয়ত এই ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনকে ইন্টারনেটের সাময়িক ট্রেন্ড বলে চালিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু রাতের অন্ধকারে শত শত আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য বিক্ষোভস্থল ফাঁকা করতে সেখানে হানা দেওয়ায় এই আন্দোলনকারীদের টিকে থাকার সত্যিকারের পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে।
আন্দোলনকারীদের নেতা অভিজিৎ দিপকে ও তার সমর্থকরা বিক্ষোভস্থলেই তাঁবু গেড়ে অবস্থান করছিলেন। দিনের তীব্র গরম সহ্য করে এবং রাতে খোলা আকাশের নিচে মাটিতে ঘুমিয়ে তারা পুলিশের নির্দেশ অমান্য করে নিজেদের দাবিতে অনড় অবস্থান জানান।
গত শনিবার রাতে পুলিশ আন্দোলনস্থলের সব বাতি নিভিয়ে দিলে এবং ভেতরে খাওয়ার পানি ঢোকার পথ বন্ধ করলে ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’ পত্রিকাকে দিপকে বলেন, “আমরা আমাদের দাবিতে অবিচল। আমরা এ বিক্ষোভ চালিয়ে যাব। সরকার ভাবছে আমাদেরকে এভাবে ক্লান্ত, দুর্বল করে দেওয়া যাবে, কিন্তু তারা ভুল ভাবছে।”
দিপকে আরও বলেন, “১ কোটির বেশি শিক্ষার্থী প্রশ্নফাঁসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে কোনও রাজনৈতিক আদর্শের প্রয়োজন হয় না। আদর্শের ভেদাভেদ ভুলে সব মানুষের উচিত এই আন্দোলনে যোগ দেওয়া।”
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করলেই আন্দোলন শেষ হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে দিপকে সাফ জানিয়ে দেন, “এ আন্দোলন চলতেই থাকবে।”
তেলাপোকা আন্দোলনকারীরা তাদের লড়াইকে ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে প্রস্তুত কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “আমরা তো এরই মধ্যে রাজপথে নেমে গেছি। আমাদের আর কোথায়ই বা যাওয়ার আছে?”
তবে রাজপথে নেমেও আন্দোলনকারীরা এখন পর্যন্ত নিজেদের দাবি কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে না পেরে হতাশাগ্রস্ত।
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এখনও এ বিক্ষোভকে স্বীকৃতি দেননি, আবার আন্দোলনকারীদের সমালোচনারও কোনো জবাব দেননি। এতে এ ধারণাই জোরাল হচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শাসনামলে ভারত সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীদের জবাবদিহি তেমন নেই।
সাংবাদিক থেকে ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের মুখপাত্র হওয়া সৌরভ দাস বলেন, “আমরা চাই, সরকার সিজেপির (ককরোচ জনতা পার্টি) প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনার একটি পথ খুলে দিক।”
তবে এ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেবে, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অনেকের মতো তিনিও অনিশ্চয়তা প্রকাশ করে বলেন, “আপাতত আমরা এখানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছি। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়।”
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক তরুণী বলেন, তিনি প্রয়োজনে পুলিশের হাতে আটক হওয়া কিংবা বিক্ষোভ কর্মসূচিকে নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে নিয়ে যেতে মানসিকভাবে প্রস্তুত। তবে এ আন্দোলনের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনও আদর্শগত ভিত্তি না থাকাকে তিনি বড় একটি সমস্যা বলে মনে
করেন। তারপরও ন্যায়বিচার আদায়ের এই লড়াই গুরুত্বপূর্ণ বলেই মত তার।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) মূল সমন্বয়ক দলের সদস্য ৩০ বছর বয়সী বিজয় রেড্ডি আন্দোলনে সংহতি জানাতে হায়দরাবাদ থেকে ৯ জনকে নিয়ে দিল্লিতে আসেন।
দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-কে তিনি বলেন, “আমার রাজনৈতিক পরিচয় হায়দরাবাদে রেখে আমরা এখানে এসেছি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এবং সিজেপি’র আন্দোলনে সহায়তা করতে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আরও অনেকে এ বিক্ষোভে যোগ দিতে এসেছে।
সিজেপির দাবিগুলো মূলত শিক্ষা খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও তা ভারতের তরুণ সমাজে সাড়া ফেলেছে।
সিজেপি’র মাঠপর্যায়ের আন্দোলনের সাফল্য মূলত দক্ষিণ এশিয়ায় একটি বড় প্রবণতাকে তুলে ধরে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা তরুণদের আন্দোলন কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তার প্রমাণ দেখা গেছে এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশে।
অতি সম্প্রতি শ্রীলংকা, বাংলাদেশ কিংবা নেপালে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু হওয়া তরুণদের আন্দোলন বড় বড় সরকার পতনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
ভারতের মতো বিশাল দেশে সিজেপি’র অনলাইন জনপ্রিয়তার জোয়ার রাজপথে কতটা বিশাল আকার ধারণ করতে পারবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের সংশয় রয়েছে। তাছাড়া, অন্য দেশগুলোর মতো একইরকম রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরিস্থিতি হয়ত ভারতে তৈরি হবে না।
কিন্তু যন্তর মন্তরের তপ্ত পিচঢালা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা তরুণেরা একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে যাচ্ছে। আর তা হল, আমাদের অবহেলা করলে তার খেসারত দিতে হবে।