Published : 26 Apr 2026, 01:55 PM
আল কায়েদা সংশ্লিষ্ট একটি জঙ্গি গোষ্ঠী এবং টুয়ারেগ বিদ্রোহীদের একটি দল মালিজুড়ে একাধিক স্থানে সমন্বিত হামলার দায় স্বীকার করে নিয়েছে।
দেশটির সামরিক বাহিনী নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে এটিকে এখন পর্যন্ত অন্যতম বড় হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মালির সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা রাজধানী বামাকো ও এর আশপাশে একাধিক স্থানে হামলা চালানো ‘কয়েকশ’ দুর্বৃত্তকে হত্যা করেছে এবং তাদের আক্রমণ প্রতিহত করেছে।
বামাকো, নিকটবর্তী সেনানিবাস এলাকা কাটি ও স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশটির অন্যত্রও বড় আকারের তল্লাশি অভিযান চলছে, তাদের বিবৃতির বরাত দিয়ে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
জঙ্গিদের হামলা কী পরিমাণ সেনা ও বেসামরিক নিহত হয়েছে তা জানা যায়নি। শনিবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে পড়া এক বিবৃতিতে সরকারের মুখপাত্র ইসা উসমান কুলিবালি ১৬ জনের আহত হওয়ার খবর দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, আক্রান্ত সব এলাকার পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। বামাকো কর্তৃপক্ষ টানা তিন রাত কারফিউ জারি থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট জামায়াত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন (জেএনআইএম) কাটি, বামাকো বিমানবন্দর এবং মোপতি, সেভারে ও গাওসহ আরও উত্তরের কিছু এলাকায় হামলার দায় স্বীকার করেছে।
টুয়ারেগদের আধিপত্য আছে এমন বিদ্রোহী গোষ্ঠী আজাওয়াদ লিবারেশন ফ্রন্টের (এফএলএ) সঙ্গে সমন্বিত এক অভিযানে কিদাল শহর ‘দখলে’ নেওয়ারও দাবি করেছে তারা।
এফএলএ-র মুখপাত্র মোহামেদ এলমাউলুদ রামাদানে এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের বাহিনী গাও এবং কিদালের দুটি সেনা ক্যাম্পাসের একটি দখল নিয়েছে বলে দাবি করেছিলেন।
জেএনআইএম এবং এফএলএ-র এসব দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
“কয়েক বছরের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড় সমন্বিত হামলা বলে মনে হচ্ছে,” বলেছেন জার্মানির কনরাদ আদেনাউয়ার ফাউন্ডেশনের সাহেল প্রোগ্রামের প্রধান উলফ লায়েসিং।
বিমানবন্দর বন্ধ, সতর্কতা জারি দূতাবাসগুলোর
মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলেছে। যুক্তরাজ্য মালিতে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে।
বামাকো বিমানবন্দর বন্ধ রাখা হয়েছে, ফ্লাইট ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বা বাতিল হয়েছে। বামাকোর দক্ষিণে, যারা বিমানবন্দরে ঢোকার চেষ্টা করছিল, তারা নিজেদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রের ভেতরে আবিষ্কার করে; মাথার ওপরে হেলিকপ্টার, কাছে গুলির শব্দ, নিজের অভিজ্ঞতা এমনভাবেই তুলে ধরেছেন এক যাত্রী।
কাটিতে সামরিক বাহিনীর মূল ঘাঁটির কাছে স্থানীয় সময় ভোর ৬টার আগে আগে দুটি বিস্ফোরণ ও টানা গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায়, চার ঘণ্টা পরও ওই গোলাগুলির শব্দ ছিল বলে রয়টার্সের এক প্রত্যক্ষদর্শী ও দুই বাসিন্দা জানিয়েছেন।
দুই প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, হামলায় কাটিতে মালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাদিও কামারা’র বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।
মধ্যাঞ্চলীয় শহর সেভারেতে হামলার এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, গুলি শুরু হয় ভোর ৫টার দিকে, সব দিক থেকে গুলির শব্দ আসছিল।
জঙ্গিরা হামলার স্থান হিসেবে যেগুলোকে বেছে নিয়েছিল, তাকে ‘অনবদ্য’ বলেছেন আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্টের হেনি এনসাইবিয়া।
“কাটি আর বামাকো হচ্ছে ‘শাসকগোষ্ঠীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত’, আর কিদাল হল ২০২৩ সালের সামরিক বিজয়ের প্রতীক, সরকার যে ‘ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের বয়ান’ দিয়ে যাচ্ছে এটি তার কেন্দ্রে অবস্থিত,” বলেছেন তিনি।
অস্বস্তিকর নীরবতা, রাতজুড়ে কারফিউ
শনিবার বেলা ১১টার কিছুক্ষণ পর সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি করলেও উত্তরের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক হাব গাও-র এক বাসিন্দা জানান, তিনি বেলা ১২টার দিকেও বিকট বিস্ফোরণ এবং সেনা ও বিদ্রোহীদের মধ্যে গুলি বিনিময়ের শব্দ শুনেছেন।
গভর্নর রাতে কারফিউ জারি করার পর সন্ধ্যার দিকে গাও-তে অস্বস্তিকর এক নীরবতা নেমে আসে, বলেছেন তিনি।
শনিবারের এ সমন্বিত হামলা মালিতে জঙ্গি ও বিদ্রোহীদের যৌথ সক্ষমতা যে বেড়েছে তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০১২ সাল থেকেই দেশটি বিদ্রোহীদের একের পর এক হামলার মুখোমুখি হচ্ছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জেএনআইএম বামাকো বিমানবন্দরের কাছে সরকারি বাহিনীর এক প্রশিক্ষণ স্কুলে হামলা চালিয়ে ৭০ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়। এর এক বছর পর তারা জ্বালানি আমদানিতে অবরোধেরও ঘোষণা দেয়।
দেশের উত্তরে টুয়ারেগ-নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহ দমনেও মালিকে ব্যাপক হিমশিম খেতে হচ্ছে।
২০২০ ও ২০২১ সালে দুটি সেনা অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় বসা আসিমি গোইতার বর্তমান সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
গোইতার সরকার শুরুর দিকে পশ্চিমা দেশগুলোর সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান করে রুশ ভাড়াটে সেনাদের ওপর নির্ভর করলেও সম্প্রতি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে।
জেএনআইএম শনিবার বলেছে, শনিবারের হামলায় তারা মালির সেনাবাহিনীর রুশ অংশীদারদের ‘নিশানা’ বানায়নি এবং রুশদের সঙ্গে তারা একটি ‘ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর ভবিষ্যৎ সম্পর্ক’ গড়ে তুলতে চায়, তাদের বিবৃতির যে অনুবাদ সাইট ইন্টিলিজেন্স দিয়েছে তাতে এমনটাই বলা হয়েছে।
বামাকোর রুশ দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে শনিবারের ‘কাপুরুষোচিত’ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
“সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নির্মূলের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এদের প্রশিক্ষণে সম্ভবত পশ্চিমা নিরাপত্তা বাহিনীগুলো জড়িত ছিল বলে প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যে ইঙ্গিত মিলেছে,” আলাদা বিবৃতিতে বলেছে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সোমবার মালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী রয়টার্সকে বলেছিলেন, তাদের দেশে ক্রিয়াশীল সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে অনেক বিদেশি শক্তি ও প্রতিবেশী কিছু দেশ সহায়তা করছে; যদিও দেশগুলোর নাম বলেননি তিনি।