Published : 21 Apr 2025, 07:47 PM
পোপ পদে তার অভিষেক ছিল অনেক প্রথমের সমষ্টি।
ফ্রান্সিস ছিলেন আমেরিকা মহাদেশ কিংবা দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে আসা প্রথম পোপ। সিরিয়ায় জন্ম নেওয়া গ্রেগরি তৃতীয় ৭৪১ সালে মারা যাওয়ার পর থেকে রোম কোনো অ-ইউরোপীয় বিশপ দেখেনি। ফ্রান্সিসে এসে সেই রীতি ভাঙে।
সেইন্ট পিটারের উত্তরসূরী হিসেবে ভ্যাটিকানের সিংহাসনের বসা প্রথম জেসুইটও তিনি; জেসুইট- ঐতিহাসিকভাবেই রোম যাদেরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে।
ফ্রান্সিসের পূর্বসূরী ষোড়শ বেনেডিক্ট ছিলেন প্রায় ছয়শ বছরের মধ্যে প্রথম পোপ, যিনি স্বেচ্ছায় অবসরে গিয়েছিলেন। সেই কারণে ভ্যাটিকানের সবুজ বাগান প্রায় এক দশক ধরে একসঙ্গে দুই পোপের পদচারণার সাক্ষী হতে পেরেছে।
বেনেডিক্ট দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর অনেকেই কমবয়সী নতুন পোপ পাবেন বলে আশায় ছিলেন। তাদেরকে হতাশ করে ২০১৩ সালে আর্জেন্টিনার কার্ডিনাল বেরগোলিও যখন ক্যাথলিকদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরুর দায়িত্ব নেন, তখনই তিনি ৭০ এর ঘরে।
নিজেকে তিনি উপস্থাপন করেছিলেন ‘মধ্যপন্থি’ ঘরানার যাজক হিসেবে। রক্ষণশীলদের আকৃষ্ট করেছিলেন যৌনতা বিষয়ক গোঁড়া দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে, আর সামাজিক ন্যায়বিচার বিষয়ে তার উদারনৈতিক অবস্থান টেনেছিল সংস্কারবাদীদের।
তার অ-প্রথাগত অতীত ভ্যাটিকানকে পুনর্যৌবন দিতে ও এর পবিত্র উদ্দেশ্যকে নতুন শক্তি ও উদ্যমে পুনরুজ্জীবিত করতে ভূমিকা রাখবে বলে অনেকে আশা করলেও ফ্রান্সিসের অনেক সংস্কারচেষ্টা ভ্যাটিকানের আমলাতন্ত্রের বাধায় মুখ থুবড়ে পড়ে; এদিকে রক্ষণশীলদের কাছেও ২০২২ সালে মারা যাওয়া তার পূর্বসূরী বেনেডিক্টই এখনও বেশি জনপ্রিয়।
সাদামাটা জীবনযাপন, লক্ষ্য মহান
পোপ হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তিনি যে সবকিছু আলাদাভাবে করবেন তার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। পোপের সিংহাসনে বসে নয়, তিনি তার কার্ডিনালদের অনানুষ্ঠানিকভাবে, দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।
২০১৩ সালের ১৩ মার্চ সেইন্ট পিটারস স্কয়ারের দিকে মুখ করে থাকা ব্যালকনিতে পোপ ফ্রান্সিস হাজির হয়েছিলেন সাদা রঙের সাধাসিধে পোশাকে, ত্রয়োদশ শতকের ধর্মপ্রচারক ও পশুপ্রেমী আসিসির সেইন্ট ফ্রান্সিসের প্রতি সম্মান জানিয়ে নিয়েছিলেন নতুন নাম।
সেদিনেই তাকে দেখা যায়, আভিজাত্য ও বাগাড়ম্বরের বদলে বিনয়কে প্রাধান্য দিতে; লিমুজিন বাদ দিয়ে চড়েছিলেন অন্য কার্ডিনালদের বাড়ি নিয়ে যেতে বরাদ্দ থাকা বাসে।
সেদিন ১২০ কোটি ভক্তের জন্য একটি নৈতিক মিশনও ঠিক করে দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, “ওহ, আমি কতটাই না চাইতাম একটি দরিদ্র চার্চ, দরিদ্রদের জন্য।”
ক্যাথলিক চার্চের প্রধান হিসেবে তার শেষ কাজও দেখেছে সেইন্ট পিটারস স্কয়ারের ব্যালকনি। জোড়া নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কয়েক সপ্তাহ হাসপাতালে কাটানোর পর ইস্টার সানডেতে এ ব্যালকনিতে উপস্থিত হয়ে হাজারো উদ্বিগ্ন ভক্ত সমর্থকের উদ্দেশ্যে হাত নেড়েছিলেন তিনি।
বেরগোলিও থেকে পোপ
হোরহে মারিও বেরগোলিওর জন্ম আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরিসে, ১৭ ডিসেম্বর ১৯৩৬ সালে। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের ৫ সন্তানের মধ্যে সবার বড়। বাবা-মায়ের বাড়ি ছিল ইতালি, কিন্তু ফ্যাসিবাদের কবল থেকে বাঁচতে তারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন।
বেরগোলিও ট্যাঙ্গো নাচ খুব পছন্দ করতেন, ছিলেন স্থানীয় স্যান লরেনজো ফুটবল ক্লাবের সমর্থক।
একবার নিউমোনিয়া তাকে বেশ কাবু করে ফেলেছিল, ভাগ্যগুণে বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন, সেবার অস্ত্রোপচারে ফুসফুসের একাংশ ফেলে দিতে হওয়ায় নিউমোনিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে হয়েছে তার।
বয়সকালে তিনি ডান হাঁটুর ব্যাথায়ও ব্যাপক ভুগেছেন, যাকে তিনি অভিহিত করেছিলেন ‘শারীরিক অসহায়ত্ব’ হিসেবে।
রসায়নে ডিগ্রি নেওয়ার আগে, তরুণ বেরগোলিও কাজ করেছেন নাইটক্লাবের নিরাপত্তাকর্মী ও ঝাড়ুদার হিসেবে।
স্থানীয় এক কারখানায় তিনি কাজ এস্থার বালেস্ত্রিনোর সঙ্গে কাজ করেছিলেন। সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে সরব বালেস্ত্রিনোর ওপর তখনকার শাসকগোষ্ঠী ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়েছিল, এ নারীর মরদেহও কখনো পাওয়া যায়নি।
পরে তিনি সোসাইটি অব জেসাসে যোগ দেন, যার অনুসারীরা জেসুইট নামে সুপরিচিত। দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন, পড়াতেন সাহিত্য ও মনোবিজ্ঞান। এক দশকের মাথায় তিনি যাজক হন। এরপর তার পদোন্নতি হয় দ্রুত, ১৯৭৩ সালে তিনি জেসুইটদের আর্জেন্টিনা প্রদেশের প্রধান হন।
অনেকের মতে, তিনি আর্জেন্টিনার বর্বর সেনাশাসনের সময় জেনারেলদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট সরব ছিলেন না। দেশটিতে ‘ডার্টি ওয়ার’ চলাকালে দুই যাজককে সামরিক বাহিনী অপহরণ করেছিল, বেরগোলির বিরুদ্ধে ওই অপহরণকাণ্ডের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ ওঠে।
১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ‘ডার্টি ওয়ারের’ সময় হাজার হাজার মানুষ গুম, খুন ও নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। অপহৃত দুই যাজকও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তবে তাদেরকে জীবিত পাওয়া যায়, ব্যাপক তন্দ্রাচ্ছন্ন ও অর্ধনগ্ন অবস্থায়।
বেরগোলিওর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, দরিদ্র এলাকায় তাদের কাজ চার্চ কর্তৃক অনুমোদিত, এটা তিনি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেননি। এমনটা হওয়ার অর্থ হচ্ছে, ওই যাজকদের মৃত্যুর হাতে সঁপে দেওয়া।
বেরগোলিও এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছিলেন। জোরের সঙ্গে বলেছিলেন, যাজকদের মুক্ত করতে তিনি পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করেছেন।
সত্যটা হচ্ছে- ৩৬ বছর বয়সে তিনি নিজেকে এমন এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে আবিষ্কার করেছিলেন, যে সেই পরিস্থিতিতে অনেক দক্ষ নেতাও হয়তো কাবু হয়ে যেতেন। এমন না যে বেরগোলিও সেসময় হাত-পা গুটিয়ে বসেছিলেন, অনেককেই তিনি সেসময় দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সাহায্যও করেছেন।
তার সঙ্গে জেসুইটদের অনেকের মতবিরোধ ছিল। অনেকের মতে, খ্রিস্টীয় ভাবাদর্শ ও মার্কসীয় সমাজতত্ত্বের মিশেলে বানানো ‘লিবারেশন থিওলজি’ বা ‘মুক্তির ধর্মতত্ত্বের’ ব্যাপারে বেরগোলিও খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। বরং বেছে নিয়েছিলেন এক শান্ত, হৃদ্যতাপূর্ণ ধর্মপালনের পথ—যেখানে যাজকের দায়িত্ব মানুষের পাশে থাকা, নেতৃত্ব নয়, সান্ত্বনা দেওয়া।
এই মতপার্থক্য একসময় বিরাট আকার ধারণ করেছিল। যে কারণে তিনি যখন ২০০৫ সালে প্রথম পোপ হতে চেয়েও পারেননি, তখন অনেক জেসুইট স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল।
১৯৯২ সালে তিনি বুয়েনস আইরিসের সহকারী বিশপ হন, এরপর ধাপে ধাপে হন আর্চবিশপ।
পোপ দ্বিতীয় জন পল ২০০১ সালে তাকে কার্ডিনাল বানান, বেরগোলিও এরপর ভ্যাটিকানের সচিবালয় ‘কিউরিয়া’-র নানান দায়িত্ব পালন করেন।
সেসময়ও সাদামাটা জীবনযাপনের জন্য তার খ্যাতি ছিল। তিনি সাধারণত বিমানের ইকোনমি ক্লাসে চলাচল করতেন, বেশিরভাগ সময়ই পরতেন সাধারণ যাজকদের জন্য নির্ধারিত কালো রঙের পোশাক, যদিও পদমর্যাদা অনুযায়ী তার পরার কথা ছিল লাল ও বেগুনি রঙের পোশাক।

কিছুটা উদার, বাকিটা গোঁড়া
ধর্মীয় বক্তৃতায় প্রায়ই তিনি সামাজিক অন্তর্ভুক্তির আহ্বান জানাতেন এবং সমাজের দরিদ্র শ্রেণির দিকে নজর না দেওয়া সরকারগুলোর কড়া সমালোচনা করতেন।
“আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে অসম অংশে বসবাস করি। এটি হয়তো অনেক উন্নতি করেছে, কিন্তু দুর্দশা হ্রাস করেছে সবচেয়ে কম,” বলতেন তিনি।
পোপ হয়ে পূর্বাঞ্চলীয় অর্থোডক্স চার্চের সঙ্গে বিরোধ মেটাতেও ব্যাপক চেষ্টা করেছেন তিনি। তার কল্যাণেই, ১০৫৪ সালের মহা বিভাজনের পর প্রথমবার রোমে নতুন বিশপের অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন কনস্তান্তিনোপলের প্যাট্রিয়ার্ক।
তিনি অ্যাংলিকান, লুথেরান ও মেথোডিস্টদের সঙ্গেও কাজ করেছেন। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি দুই প্রেসিডেন্টকে দুই পাশে বসিয়ে করেছেন শান্তির জন্য প্রার্থনা।
ইসলামপন্থি জঙ্গিদের হামলার সমালোচনায় ধর্মকে টেনে আনার ব্যাপারেও সতর্ক করতেন তিনি।
“আমি যদি ইসলামী সহিংসতার কথা বলি, তাহলে তো আমাকে ক্যাথলিক সহিংসতার কথাও বলতে হবে,” বলেছিলেন তিনি।
ফকল্যান্ড দ্বীপ নিয়ে আর্জেন্টিনার দাবির সমর্থক পোপ ফ্রান্সিস কিউবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টায় মধ্যস্থতাও করেছিলেন। স্পেনিশভাষী লাতিন আমেরিকান এই পোপ কিউবায় গিয়ে বসেছিলেন কিংবদন্তি বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে। কোনো ইউরোপীয় পোপকে এমন কূটনৈতিক দায়িত্ব দেওয়ার আগে অন্তত কয়েকশবার ভাবতে হতো।
ক্যাথলিক চার্চের প্রতিনিধিরা নানান দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করেন। সেসব দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় নিলে পোপ ফ্রান্সিসকে বলা যায় ‘ট্র্যাডিশনালিস্ট’ বা প্রথাগত ধারার।
“স্বেচ্ছামৃত্যু, মৃত্যুদণ্ড, গর্ভপাত, জীবনের অধিকার, মানবাধিকার ও যাজকদের ব্রহ্মচর্য নিয়ে তিনি পোপ দ্বিতীয় জন পলের মতোই আপোসহীন,” বলেছিলেন ফ্রান্সিসের সঙ্গে সেমিনারিতে শিক্ষা নেওয়া মনসিনর অসভালদো মুস্তো।
ফ্রান্সিস বলতেন, সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন যা-ই হোক না কেন, চার্চের উচিত সবাইকে স্বাগত জানানো। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি সমকামী দম্পতিদের কাছে শিশু দত্তক দেওয়ার প্রবল বিরোধী ছিলেন।
সমকামী যুগলদের নিয়ে ভালো ভালো কথাও কখনো কখনো বলেছেন, কিন্তু তাদের গাঁটছড়া বাঁধাকে বিবাহ বলতে নারাজ ছিলেন তিনি। তার মতে এটি হচ্ছে ‘ঈশ্বরের পরিকল্পনা ধ্বংসের চেষ্টা’।
২০১৩ সালে পোপ হওয়ার কিছুদিন পর তিনি রোমে গর্ভপাতবিরোধী এক বিক্ষোভেও অংশ নেন। ‘গর্ভধারণের মুহূর্ত থেকেই’ জন্ম না নেওয়াদের অধিকারের পক্ষে ছিলেন তিনি।
তিনি স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের বিবেক খাটানোরও আহ্বান জানিয়েছিলেন। গর্ভপাত নিয়ে আয়ারল্যান্ডে গণভোটের আগে দেশটির জনগণকে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকাদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছিলেন।
ফ্রান্সিস নারীদের যাজক পদ দেওয়ারও ঘোর বিরোধী ছিলেন। পোপ দ্বিতীয় জন পল চিরতরে এই সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়েছেন, এক ঘোষণায় বলেছিলেন তিনি।
রোগ প্রতিরোধে গর্ভনিরোধক ব্যবহারে প্রথম দিকে তার সায় আছে বলে মনে হলেও পরে তিনি এ নিয়ে ষষ্ঠ পলের সতর্কতার প্রশংসাও করেছেন। ষষ্ঠ পল মনে করতেন, গর্ভনিরোধক নারীদেরকে পুরুষের ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করতে পারে।
পোপ পদে থাকার সময় দুটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল ফ্রান্সিসকে। শিশু নির্যাতনের বিষয়টি মোকাবেলায় ব্যর্থতার দায়ে একদল তাকে অভিযুক্ত করেছিলেন। অন্যদিকে রক্ষণশীলদের ভাষ্য ছিল, তিনি ধর্মবিশ্বাসকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছেন। বিচ্ছেদের পর পুনরায় বিয়ের পিডিতে বসা ক্যাথলিকদের ‘কমিউনিয়ন’ গ্রহণের অনুমতি দিয়ে তিনি রক্ষণশীলদের চক্ষুশূলও হয়ে উঠেছিলেন।
২০১৮ সালের অগাস্টে আর্চবিশপ কার্লো মারিয়া ভিগানো অভিযোগ করে বসেন, কার্ডিনাল থমাস ম্যাককারিকের নিপীড়নের ঘটনা জানা সত্ত্বেও তা আড়াল করে পোপ তাতে পদোন্নতি দিয়েছেন।
পোপের পদত্যাগ দাবি করে ভিগানো বলেন, ক্যাথলিক চার্চে ‘সমকামী নেটওয়ার্ক’ বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে।
এই বিতর্ক তীব্র হয়ে উঠলে ভ্যাটিকান তদন্তে নামে, পরে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি ম্যাকক্যারিককে যাজক পদ থেকে থেকে অপসারণ করা হয়।
কোভিড মহামারীর সময় ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ফ্রান্সিস সেইন্ট পিটারস চত্বরে নিয়মিত হাজির হওয়ার কর্মসূচি বাদ দেন। সেসময় তিনি সবাইকে টিকা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছিলেন।
২০২২ সালে তিনি পূর্বসূরী ষোড়শ বেনেডিক্টকে সমাধিস্থ করার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেন, একশ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এমনটা আর দেখা যায়নি। অবশ্য ততদিনে ফ্রান্সিসের শরীরও নানান রোগব্যাধিতে জর্জরিত। বেশ কয়েকবার হাসপাতালেও যেতে হয়েছে তাকে।
অবশ্য অসুখবিসুখ তাকে খুব একটা দমাতে পারেনি। জীবনের একেবারে শেষপ্রান্তেও শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় তিনি দেশে দেশে ছুড়ে বেড়িয়েছেন।
২০২৩ সালে তিনি দক্ষিণ সুদানে গিয়ে সংঘাত বন্ধে সেখানকার নেতাদের প্রতি আকুতি জানিয়েছিলেন। ইউক্রেইনে, গাজায় যুদ্ধ বন্ধে তাগাদাও দিয়েছেন বারবার। অবশ্য যুদ্ধ নিয়ে রুশ ভাষ্যের সঙ্গে পোপের ভাষ্যের মিল নিয়ে ইউক্রেইনীয়রা বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছে।
অসুখ তাকে শেষ পর্যন্ত আর এগুতে দেয়নি। চলতি বছরের মার্চে উভয় ফুসফুসে নিউমোনিয়ার সংক্রমণ নিয়ে ৫ সপ্তাহ হাসপাতালে কাটান তিনি।
এরপর ইস্টার সানডেতে শেষবার ভক্তদের দেখা দিয়ে নেন চিরবিদায়।

বদলে যাওয়া ক্যাথলিক চার্চ
হোরহে মারিও বেরগোলিও সেইন্ট পিটারের সিংহাসনে বসেছিলেন এটি বদলে দেওয়ার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা নিয়ে।
কেউ কেউ হয়তো চেয়েছিলেন বেনেডিক্টের পর ভ্যাটিকানে বসুক আরও উদারনৈতিক কেউ; সমালোচকরা হয়তো যাজকদের যৌন নিপীড়ন নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষায় ব্যর্থতার দায়ও দিতে পারেন তাকে।
তবে ফ্রান্সিস নাম নেওয়া বেরগোলিও ঠিকই ক্যাথলিক চার্চকে বদলে দিয়েছেন।
তিনি অ-ইউরোপীয় দেশ থেকে ১৪৯ জনের বেশি কার্ডিনাল নিয়োগ দিয়েছেন, উত্তরসূরীর জন্য রেখে যাচ্ছেন এমন একটি চার্চ যেটি উত্তরাধিকার তিনি সূত্রে যেমনটি পেয়েছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন।
ছিলেন ক্যাথলিক চার্চের শীর্ষ নেতা, অথচ সাদামাটা জীবনযাপনে উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। পোপের জন্য নির্ধারিত ভ্যাটিকানের ঐতিহাসিক অ্যাপোস্টলিক প্যালেসে (যার সঙ্গে রয়েছে সিস্টিন চ্যাপেল) থাকতেন না তিনি, থাকতেন পাশের আধুনিক ব্লকে, পোপ দ্বিতীয় জন পল যেটি বানিয়েছিলেন অতিথিশালা হিসেবে।
তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্য ছাড়া সবই অসার। সৌন্দর্য বাহ্যিক জাঁকজমক বা আড়ম্বরের মধ্যে থাকে না, থাকে অন্তর্নিহিত সত্য ও আত্মবিশ্বাসের মধ্যে।
“ময়ূরের দিকে তাকাও, সামনে থেকে দেখলে চমৎকার, কিন্তু যদি পেছন থেকে দেখো তাহলে সত্যটা আবিষ্কার করতে পারবে,” বলেছিলেন তিনি।
তার আশা ছিল, তিনি ক্যাথলিক চার্চকে ভেতর থেকে নাড়া দিতে পারবেন; অভ্যন্তরীণ ভেদাভেদ দূর করে, দরিদ্রদের দিকে আরও মনোযোগ দিয়ে, চার্চকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে এর ঐতিহাসিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে এগিয়ে নিতে পারবেন।
“নিজের জগতে আচ্ছন্ন চার্চের আধ্যাত্মিক অসুস্থতা এড়াতে হবে আমাদের,” পোপ নির্বাচিত হওয়ার পরই বলেছিলেন তিনি।
“যদি আমাকে রাস্তায় নেমে আসা আহত চার্চ এবং অসুস্থ চার্চের মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়, আমি প্রথমটা বেছে নেবো,” বলেছিলেন পোপ ফ্রান্সিস, সোমবার যার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভ্যাটিকানের একটি অধ্যায়ের যবনিকাপাত ঘটলো।
আরও পড়ুন
ফ্রান্সিস: প্রায় ১৩০০ বছরের মধ্যে প্রথম অ-ইউরোপীয় পোপ