Published : 17 Jul 2026, 12:05 PM
যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন ইসরায়েলি ‘ডিপ স্টেট’এর কিছু অংশের পাশাপাশি ‘আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থার সর্বোচ্চ স্তরের’ সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে ‘মনে হওয়ার’ কথা জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
পডকাস্টার জো রোগানকে বুধবার দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স এও স্বীকার করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন এপস্টেইন ফাইল নিয়ে মানুষকে তথ্য দেওয়ার বিষয়ে ‘গণ্ডগোল বাধিয়েছিল’।
আল জাজিরা লিখেছে, এপস্টেইন যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কয়েকটি যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে একজন অর্থলগ্নিকারী এবং অভিজাত সমাজের চেনা মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
বিশ্বের অভিজাতদের সঙ্গে বিস্তৃত যোগাযোগ নেটওয়র্কের জন্য পরিচিত এই ব্যক্তিকে ২০১৯ সালে নিউ ইয়র্ক সিটির কারা কক্ষে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়; তখন তিনি বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন।
এপস্টেইন ফ্লোরিডা রাজ্যের একটি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ২০০৮ সালে একজন নাবালিকাকে যৌনপেশায় আনার জন্য দণ্ডিত হন।
তবে সমালোচকরা অপেক্ষাকৃত এ লঘু সাজাকে ‘গোপন আঁতাত’ বলে বর্ণনা করেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এপস্টেইন একটি বিস্তৃত যৌন বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন, যার খদ্দের ছিলেন অভিজাতরা।
ভ্যান্স তার সাক্ষাৎকারে এপস্টেইন মামলা ছাড়াও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, ইরান যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রায় তিন ঘণ্টার এ আলোচনা ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে ইউটিউবে এক মিলিয়নের বেশি বার দেখা হয়েছে।

এপস্টেইন সম্পর্কে ভ্যান্স কী বলেছেন?
সঞ্চালক রোগান সাক্ষাৎকারের প্রায় ১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিটের মাথায় ভ্যান্সকে জিজ্ঞেস করেন, “আচ্ছা, বেশিরভাগ মানুষই তো মনে করে যে, তিনি (এপস্টেইন) মোসাদের লোক ছিলেন।”
জবাবে ভ্যান্স বলেন, “হ্যাঁ, মোসাদ বা সিআইএ অথবা অন্য কোনো ডিপ স্টেট, তা আমেরিকায় হোক বা ইসরায়েলে কিংবা অন্য কোনো দেশে। আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চ স্তরের সঙ্গে স্পষ্টতই তার যোগাযোগ ছিল। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সর্বোচ্চ স্তরের সঙ্গেও তার স্পষ্ট যোগাযোগ ছিল।”
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট এরপর দাবি করে বসেন, এপস্টেইনের সঙ্গে ইসরায়েলি ডিপ স্টেটের বামপন্থি অংশের যোগাযোগ ছিল বলে তার মনে হয়।
তিনি বলেন, “এমনটা নয় যে তিনি ইসরায়েলি রাজনীতির ডানপন্থিদের সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ ছিলেন।”
মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে বাম ও ডান—উভয় পক্ষেই এই ঘৃণিত যৌন অপরাধীর বন্ধু ছিল।”
তবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনজুড়ে এপস্টেইনের যত বন্ধু ছিল, ইসরায়েলে তত ছিল না বলে মনে করেন ভ্যান্স।
তিনি বলেন, এপস্টেইনের সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা বা কোনো বিদেশি সংস্থার যোগসূত্রের বিষয়ে কোনো নথি নেই।
“যদি তেমন কোনো (নথি) থেকে থাকে, তবে তা ২০২৬ সালে টিকে থাকবে না।”

এপস্টেইনের ইসরায়েল যোগের কোনো প্রমাণ আছে?
মার্কিন বিচার বিভাগ চলতি বছরের জানুয়ারিতে এপস্টেইন সংক্রান্ত ৩৫ লাখ ফাইল প্রকাশ করে, যা ‘এপস্টেইন ফাইল’ নামে পরিচিত। এ নথিগুলোর কোনোটিতেই স্পষ্ট করে বলা নেই যে, তিনি কোনো গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট ছিলেন। তারপরও প্রচুর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।
এফবিআইয়ের ২০২০ সালের একটি স্মারকে বলা হয়, তাদের এক সূত্রের বিশ্বাস ছিল, প্রয়াত এ যৌন অপরাধী ‘মোসাদের একজন গোপন চর’ ছিলেন এবং তাকে ‘গোয়েন্দা হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল’।
ফাইলগুলো থেকে জানা যায়, ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এহুদ বারাক, মোসাদের প্রবীণ কর্মকর্তা ইয়োনি কোরেনসহ শীর্ষস্থানীয় ইসরায়েলি রাজনীতিকদের সঙ্গে এপস্টেইনের নিয়মিত ই-মেল যোগাযোগ ছিল। কোরেন নিউ ইয়র্কে এপস্টেইনের বাসভবনে নিয়মিত যাতায়াত করতেন।
আল জাজিরা লিখেছে, এসব ই-মেইল চালাচালি তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। বলা হয়, এপস্টেইন ২০১২ সালে কোরেনের ক্যান্সারের চিকিৎসার খরচ বহন করেছিলেন।
এপস্টেইন তার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ইসরায়েলি সংস্থাগুলোকে অর্থায়নও করেছিলেন, যার মধ্যে ফ্রেন্ডস অব দ্য ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেসকে (ইসরায়েলি সেনাবাহিনী) ২৫ হাজার ডলার এবং জুইশ ন্যাশনাল ফান্ডকে ১৫ হাজার ডলারের অনুদান রয়েছে।
আল জাজিরা লিখেছে, এপস্টেইন ইসরায়েলের হয়ে কাজ করতেন—এমন অভিযোগ এতটাই জোরালো ছিল যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ বিষয়ে সোশাল মিডিয়ায় কথা বলেন।
নেতানিয়াহু গত ফেব্রুয়ারিতে লিখেছিলেন, “এহুদ বারাকের সঙ্গে জেফ্রি এপস্টেইনের অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এটি প্রমাণ করে না যে, এপস্টেইন ইসরায়েলের জন্য কাজ করেছিলেন। এটি বরং এর উল্টোটা প্রমাণ করে।”
পাম বন্ডি সম্পর্কে ভ্যান্স কী বলেছেন?
সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স বলেন, সাবেক মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডির অধীনে বিচার বিভাগে কোনো বিদ্বেষমূলক বা খারাপ কিছু ঘটছিল বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।
‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’অনুসারে, এপস্টেইন সংক্রান্ত সব নথি গত নভেম্বরে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা ছিল বিচার বিভাগের, কিন্তু বন্ডি ও তার বিভাগ এপস্টেইন সংক্রান্ত কিছু ফাইল আটকে রেখেছিলেন।
তিনি দাবি করেছিলেন, এপস্টেইনের একটি কথিত ‘গ্রাহক তালিকা’ তার ডেস্কে রয়েছে, যা পরে অসত্য প্রমাণিত হয়। এপস্টেইন ফাইল ঘিরে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলার মধ্যে গত এপ্রিলে বন্ডিকে বরখাস্ত করা হয়।
ভ্যান্স বলেন, “আমি পামকে চিনি। আমি পামকে পছন্দ করি। আমি মনে করি না সেখানে কোনো বিদ্বেষমূলক কিছু ঘটছিল।”
তিনি বলেন, “আমার মনে হয় পাম সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া জানানোর চেষ্টা করছিলেন। আমার মনে হয়, আমাদের কাছে কী ছিল এবং কী ছিল না, তা নিয়ে তিনি কিছু অতিরঞ্জিত কথা বলে ফেলেছেন।”
ভ্যান্স বলেন, এর ফলে বন্ডিকে প্রকাশ্যে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল এবং এপস্টেইন ফাইল ঘিরে প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে মানুষের মনে ‘অবিশ্বাস’ তৈরি করেছিল।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমরা এপস্টেইন ফাইল নিয়ে মানুষকে তথ্য দেওয়ার বিষয়ে পুরোপুরি ভুল করেছিলাম। হ্যাঁ, আমরা সত্যিই ভুল করেছিলাম। কিন্তু আমি কি মনে করি যে, আমাদের তথ্য দেওয়ার ভুলের কারণ আমরা কিছু লুকাতে চেয়েছিলাম? না।”