১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যু: কীভাবে বেছে নেওয়া হবে নতুন পোপ

ক্যাথলিক চার্চের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ। তিনি ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রপ্রধান এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সব ক্যাথলিক চার্চের প্রধান।

পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যু: কীভাবে বেছে নেওয়া হবে নতুন পোপ
তুরস্কের সেইন্ট জর্জ গির্জায় পোপ ফ্রান্সিস। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 21 Apr 2025, 06:31 PM

Updated : 26 Aug 2026, 12:33 PM

রোমান ক্যাথলিকদের শীর্ষ ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যুতে ভ্যাটিকানের আকাশে এখন শোকের ছায়া। রেওয়াজ অনুযায়ী তার শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই শুরু হয়ে যাবে নতুন পোপ বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া।

পোপ ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু। যিনি পোপ নির্বাচিত হন, তিনি ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রপ্রধান এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সব ক্যাথলিক চার্চের প্রধান। পোপ মারা যাওয়ার পরের প্রক্রিয়াগুলো বছরের পর বছর ধরে পরিবরর্তন হয়ে এসেছে।

১৯৯৬ সালে এই প্রক্রিয়াকে সময়োপযোগী করা হয়। আর পোপ ফ্রান্সিসের আমলে ২০১৩ সালে তা আরও পরিমার্জন করা হয়। সর্বশেষ নির্দশাবলী অনুযায়ী, পোপের মৃত্যুর খবর ভ্যাটিকানের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়। একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা করা হয়।

পোপ মারা গেলে ক্যাথলিক চার্চের কার্ডিনাল ক্যামেরলেঙ্গোকে তা নিশ্চিত করতে হয় পন্টিফিকাল লিটারজিকাল অনুষ্ঠানের নতুন মাস্টার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সদস্যের সামনেই। কার্ডিনাল ক্যামেরলেঙ্গো একটি পদ, যার অবস্থান পোপের পরেই।

একজন চিকিৎসক ক্যামেরলেঙ্গোর সামনে পোপের পালস পরীক্ষা করে পোপকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যু নিশ্চিত করতে, কার্ডিনাল ক্যামেরলেঙ্গো পোপের নাম ধরে তিন বার ডাকেন এবং সাড়া পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন।

 পোপের মৃত্যুর পর ভ্যাটিকানের সেইন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা। ছবি: রয়টার্স

পোপের মৃত্যুর পর ভ্যাটিকানের সেইন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা

সাড়া না পেলে তিনি পোপকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করেন। অতীতে পোপের নাম ধরে ডাকার আগে তার মাথায় রূপার হাতুড়ি দিয়ে তিনবার আঘাত করা হত। তবে সে প্রথা এখন আর পালন করা হয় না।

মৃত ঘোষণার পর পোপের হাতের সোনার আংটি আইডেন্টিফিকেশন ‘রিং অব ফিশারম্যান’ খুলে নেওয়া হয় এবং অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে তা নষ্ট করা হয়। এর মানে হচ্ছে, তার ক্ষমতাকালের সমাপ্তি। এটি পোপের ক্ষমতা শেষের একটি প্রতীকী প্রথা।

এরপর পোপের বাসস্থানগুলোও সিল করে দেওয়া হয়। ক্যামারলেঙ্গো রোমের কার্ডিনাল ভিকারকে পোপের মৃত্যুর খবর জানাবেন। এরপর ভিকার প্রথমে রোমবাসীকে তা জানাবেন এবং তারপর বিবৃতি দিয়ে বিশ্ববাসীকে তা জানানো হয়।

পোপের মৃত্যু পর ক্যাথলিক চার্চে ৯ দিনের শোক পালন করে। সাধারণত মৃত্যুর চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ দিনের মধ্যে পোপকে সমাহিত করা হয়।

অধিকাংশ পোপকেই ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় সমাহিত করা হয়। তবে পোপ ফ্রান্সিস ২০২৩ সালে একটি সাক্ষাৎকারে রোমের সান্তা মারিয়া ম্যাগিওর ব্যাসিলিকায় তার দেহ রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তার ইচ্ছানুযায়ী এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো একজন পোপকে এবার ভ্যাটিকানের বাইরে সমাহিত করা হবে।

সান্তা মারিয়া ম্যাগিওর ব্যাসিলিকা রোমের চারটি প্রধান পাপাল ব্যাসিলিকার একটি।  

পোপকে সমাহিত করার আগে তার মরদেহ রাষ্ট্রীয়ভাবে শায়িত রাখা হয়, যাতে মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে পারেন। ঐতিহ্য অনুযায়ী, পোপের মৃতদেহ প্রথমে সাইপ্রেস কাঠের একটি কফিনে রাখা হয়।

এরপর সেটি সীসার তৈরি দ্বিতীয় কফিনে সিলমোহর করা হয়, যেখানে পোপের নাম ও তার কার্যকালের তারিখ খোদাই করা থাকে। সবশেষে, ওক কাঠের একটি তৃতীয় বাইরের কফিনের মধ্যে সেটি স্থাপন করা হয়।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দায়িত্ব পালন করেন কার্ডিনাল ক্যামারলেনগো, যিনি হোলি সি-এর কোষাধ্যক্ষ হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি তিনি নতুন পোপ নির্বাচনের জন্য কার্ডিনালদের সম্মেলন (কনক্লেভ) আহ্বান করেন।

ঐহিত্যগতভাবে পোাপের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বিস্তারিত এসব বিষয়আশয় থাকলেও পোপ ফ্রান্সিস সম্প্রতি এই পুরো প্রক্রিয়াটি আরও সরল করার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন।

আগের পোপদের সাইপ্রেস, সীসা ও ওক কাঠের তিনটি কফিনে মোড়ানো হলেও পোপ ফ্রান্সিস জিঙ্ক দিয়ে মোড়ানো একটি সাধারণ কাঠের কফিনে তাকে সমাহিত করতে বলেছেন। 

সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় জনসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য পোপের মৃতদেহকে ক্যাটাফাল্ক নামে পরিচিত একটি উঁচু প্ল্যাটফর্মে রাখার ঐতিহ্যও বাতিল করেছেন তিনি। তার বদলে মৃতদেহ কফিনে থাকা অবস্থায় ঢাকনা খুলে শোকাহতদের শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ দেওয়া হবে।

ভ্যাটিকানের সেইন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় বড়দিনের প্রার্থনা পরিচালনা করছেন পোপ ফ্রান্সিস। ছবি: রয়টার্স 

ভ্যাটিকানের সেইন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় বড়দিনের প্রার্থনা পরিচালনা করছেন পোপ ফ্রান্সিস

সাদা ধোঁয়া, কালো ধোঁয়া

পোপের মৃত্যু এবং নতুন পোপ নির্বাচনের মাঝের সময়কে বলে ‘সেডে ভেকান্টে’। ল্যাটিন এই শব্দের অর্থ ‘দ্য সিট ইজ ভ্যাকেন্ট’ বা আসন খালি। এ সময়ের মধ্যে মৃত পোপের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পাশাপাশি নতুন পোপ নির্বাচন করা হয়।

এ সময়ে কোনও পোপ না থাকায় চার্চ পরিচালনার ভার থাকে কলেজ অব কার্ডিনালসের হাতে। কার্ডিনাল ক্যামেরলেঙ্গো চার্চের এই সময়ের কাজের দেখাশোনা করেন। কলেজ অব কার্ডিনালসই নতুন পোপ বেছে নেওয়ার জন্য কনক্লেভের আয়োজন করেন।

কনক্লেভে উপস্থিত থাকেন কার্ডিনাল ইলেক্টররা। মৃত পোপকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকেই কার্ডিনালরা এসে পৌঁছান ভ্যাটিকান সিটিতে।

নিয়ম অনুযায়ী, পোপের মৃত্যুর ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে কার্ডিনালদের অবশ্যই ভ্যাটিকানে পৌঁছতে হয়। তারা বিশেষভাবে নির্ধারিত বাসস্থানে অবস্থান করেন। নতুন পোপ নির্বাচনের জন্য সম্মেলন পরিচালনা করেন এবং তারাই ভোট দিয়ে পরবর্তী পোপ নির্বাচিত করেন। কার্ডিনালদের নিয়ে নতুন পোপ নির্বাচনের যে বিশেষ প্রক্রিয়া, সেটি ‘কনক্লেভ’ নামে পরিচিত।

পোপ নির্বাচনের জন্য ভ্যাটিকানে গোপন সম্মেলন বা কনক্লেভ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রায় ১২০ জন কার্ডিনাল ভোটদান প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। যদিও বিশ্বব্যাপী কার্ডিনালের সংখ্যা প্রায় ১৯৫, তবে ৮০ বছরের বেশি বয়সী কার্ডিনালদের ভোট দেওয়ার অনুমতি নেই।

নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন কার্ডিনালরা ভ্যাটিকান প্রাসাদে জড়ো হন। নতুন পোপ নির্বাচিত করতে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। নির্ধারিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ভোট চলতে থাকে।

তবে যদি কার্ডিনালরা একমত হতে না পারেন, তাহলে ভোটগ্রহণ একদিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়, যাতে তারা প্রার্থনা ও আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রস্তুতি নিতে পারেন।

দুই তৃতীয়াংশ ভোট পেলে নির্বাচিত কার্ডিনালকে পোপ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তিনি জয় স্বীকার করলে পরবর্তী পোপ হন। আর যদি কোনও কার্ডিনাল দুই তৃতীয়াংশ ভোট না পান তখন সব ভোটের স্লিপ নির্দিষ্ট চুল্লিতে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

সেই চুল্লির চিমনি দিয়ে কালো ধোঁয়া দেখেই সবাই বুঝতে পারেন পোপ নির্বাচন হয়নি। তখন আবার একই প্রক্রিয়া শুরু হয়। পোপ নির্বাচনের জন্য এই ভোটাভুটি এবং আলোচনা সবই হয় একটি বন্ধ কক্ষে।

পোপ নির্বাচন হয়ে গেলে শুরু হয় নাম ঘোষণার প্রক্রিয়া। ভ্যাটিক্যানে সেই সময়ের মধ্যেই জড়ো হয়ে যান প্রচুর মানুষ। ঊর্ধ্বতন কোনও কার্ডিনাল তখন পোপের নতুন নাম ঘোষণা করেন।

নতুন পোপ নতুন পোশাক পরে জনসম্মুখে আসেন। এরপর পরেন ‘ফিশারম্যান রিং’। ঈশ্বরের নামে শপথ নেওয়ার পর তিনি ভ্যাটিক্যানের ব্যালকনি থেকে ভাষণ দেন।

আরও দেখুন:  

পোপ ফ্রান্সিসের চিরপ্রস্থান