গঠন অনেকটা পৃথিবীর মতো পাথুরে হলেও আকৃতিতে কিছুটা ছোট শুক্র গ্রহ ঘন ও বিষাক্ত বায়ুমণ্ডলে আবৃত। ছবি: নাসা
Published : 16 Sep 2026, 03:18 PM
পৃথিবীর আকার ও গঠনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল থাকার পরও শুক্র গ্রহের নিজস্ব কোনো চাঁদ নেই কেন– বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞানীদের মনে ঘুরপাক খাওয়া এ বড় প্রশ্নের সম্ভাব্য এক সমাধান মিলেছে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া’র গবেষকদের নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, শুক্র গ্রহের অত্যন্ত ধীরগতির ঘূর্ণন ও মহাজাগতিক নানা সংঘর্ষের ইতিহাসই এর চাঁদ না থাকার মূল কারণ।
এ নতুন তত্ত্বটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকাশনা ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল’-এ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, শুক্র গ্রহের নিজ অক্ষে ধীরগতির ঘূর্ণনই এর চাঁদ না থাকার মূল কারণ।
এ মন্থর গতির কারণে একসময়ের কোনো প্রাকৃতিক উপগ্রহ বা চাঁদ ক্রমান্বয়ে এর মূল গ্রহের আরও কাছাকাছি চলে আসতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে এক ধ্বংসাত্মক সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে সেই চাঁদ গ্রহের মধ্যেই পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়।
শুক্র গ্রহের চাঁদ না থাকার প্রচলিত বিভিন্ন ব্যাখ্যার তুলনায় এ ‘মহাজাগতিক নরখাদক’ বা গ্রহের চাঁদ গিলে ফেলার তত্ত্বটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধারার জন্ম দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
গবেষণা দলের অন্যতম জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্টিফেন ক্রেন বলেছেন, “শুক্রের যদি কোনো চাঁদ থেকে থাকে আর এমনটা খুব সম্ভব অতীতে ছিলও। তবে তা ধরে রাখা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কারণ সেই চাঁদ তুলনামূলকভাবে কম সময়ের মধ্যেই গ্রহের ওপর আছড়ে পড়ে ধ্বংস হয়ে যেত।”
গ্রহের পদার্থবিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে ও কাল্পনিক শুক্রীয় বিভিন্ন চাঁদের মহাকর্ষীয় গতিবিধি অনুকরণ করে বিভিন্ন কম্পিউটার মডেল তৈরি হয়েছিল।
ওইসব মডেলের তথ্যে দেখা গেছে, যে কোনো আকৃতির চাঁদই শেষ পর্যন্ত একই পরিণতির মুখে পড়েছিল, অর্থাৎ সময়ের ব্যবধানে তা নিজের মাতৃগ্রহের বুকেই ভেঙে পড়ত।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাঁদ গিলে ফেলার ঘটনাটি সম্ভবত শুক্রের ইতিহাসের প্রথম একশ কোটি বছরের মধ্যেই ঘটেছিল। সৌরজগতের বাকি অংশের মতো শুক্র গ্রহের বয়সও প্রায় সাড়ে চারশ কোটি বছর।
এর আগে, বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন তত্ত্ব দিয়ে বলেছিলেন, পৃথিবীর এ ‘জমজ’ গ্রহটি হয় শুরু থেকেই কোনো চাঁদ পায়নি বা বড় কোনো মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে এর আগের চাঁদটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
নতুন তত্ত্বটি সেই ধারণার বাইরে গিয়ে মহাকর্ষীয় ও ঘূর্ণন গতির নতুন এক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সামনে এনেছে।
শুক্রের চেয়ে পৃথিবী দ্রুত ঘোরে
পৃথিবী ও চাঁদের গতির গতিপ্রকৃতির ওপর পরিচালিত ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড’-এর গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রহের ঘূর্ণন গতিই এর মূল চাবিকাঠি।
শুক্র গ্রহ নিজের অক্ষে একটি আবর্তন সম্পন্ন করতে পৃথিবীর ২৪৩ দিনের সমান সময় নেয়, যা সূর্যের চারপাশে এর েআবর্তনের সময়ের চেয়েও কিছুটা বেশি।
এর বিপরীতে, পৃথিবী প্রতি ২৪ ঘণ্টায় নিজের অক্ষে একবার ঘোরে, যা শুক্রের তুলনায় ২০০ গুণেরও বেশি দ্রুতগতিসম্পন্ন বলে জানিয়েছেন গবেষক স্টিফেন ক্রেন।
পৃথিবীর দ্রুত ঘূর্ণনের ফলে যে শক্তি স্থানান্তরিত হয় তা ক্রমান্বয়ে চাঁদকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে চাঁদ প্রতি বছর ৪ সেন্টিমিটার করে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, যা ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো ১১-এর নভোচারীদের চাঁদের মাটিতে রেখে আসা আয়নার সাহায্যে নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা হয়েছে।
সূর্য ও চাঁদের পর রাতের আকাশে তৃতীয় উজ্জ্বলতম বস্তু হিসেবে শুক্র গ্রহ পৃথিবীর ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যয়নের বিষয়।
গঠন অনেকটা পৃথিবীর মতো পাথুরে হলেও আকৃতিতে কিছুটা ছোট শুক্র গ্রহ ঘন ও বিষাক্ত বায়ুমণ্ডলে আবৃত। ফলে সেখানে তৈরি হয়েছে তীব্র গ্রিনহাউস এফেক্ট, যার কারণে গ্রহটির পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৮৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছে যায়, যা সিসা গলানোর জন্য যথেষ্ট।
শুক্র গ্রহের কোনো চাঁদ অতীতে সত্যিই অস্তিত্বশীল ছিল কি না তার কোনো প্রমাণ নেই। তবে গবেষক ক্রেন বলেছেন, শুক্র গ্রহ তার শৈশবে অন্য কোনো ‘প্রোটো-প্ল্যানেট’ বা আদি-গ্রহের সঙ্গে বিশ্বস্তূপ সংঘর্ষ এড়িয়ে গেছে এমনটা ভাবাটা অসম্ভব।
পৃথিবীর চাঁদ যে ধরনের বড় ধাক্কায় তৈরি হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়, শুক্র হয়ত তার চেয়েও বেশি মহাজাগতিক আঘাতের মুখে পড়েছিল। কারণ তা সূর্যের আরও কাছাকাছি অবস্থিত।
বিজ্ঞানীদের অনুমান, ২০৩০-এর দশকের শেষদিকে বা ২০৩০-এর দশকের শুরুতে নাসার মাধ্যমে নির্ধারিত ‘ডেভিনসি প্লাস’ ও ‘ভেরিটাস’ নামের দুটি আসন্ন মিশনের মাধ্যমে গ্রহটির বায়ুমণ্ডল ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও অজানা রহস্য উন্মোচন সম্ভব হবে।