মহাবিশ্বের প্রচলিত নিয়ম ভেঙে উল্টো পথে ঘুরছে এই ভিনগ্রহ
মিল্কি ওয়ে ছায়াপথে বহুল প্রচলিত এ ধরনের গ্রহের দেখা মিললেও সম্প্রতি আবিষ্কৃত গ্রহটির কক্ষপথের অস্বাভাবিকতা বিজ্ঞানীদের হতবাক করেছে।
দূরবর্তী এক ভিনগ্রহ মহাবিশ্বের প্রচলিত নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের তারার ঘূর্ণনের ঠিক বিপরীত দিকে প্রদক্ষিণ করছে বলে দাবি বিজ্ঞানীদের।
তাদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ ব্যতিক্রমী গ্রহটির সন্ধান মিলেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট স্পেসডটকম।
‘জিজে ৩০৯০ বি’ নামের বহির্গ্রহটির কক্ষপথ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০২২ সালে আবিষ্কৃত ভিনগ্রহটি সম্পর্কে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, গ্রহটি কেবল হেলে থাকা কক্ষপথে ঘুরছে তা নয়, বরং এর মূল তারার ঘূর্ণনের বিপরীত দিকেও ঘুরছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, কোনো বড় আকারের সহচর গ্রহ, বাদামী বামন বা অন্য কোনো তারার মহাকর্ষীয় টানের কারণে এমন বিপরীতমুখী ঘূর্ণন তৈরি হতে পারে। তবে গ্রহটির ক্ষেত্রে সেটার কোনো বালাই নেই। এটা মহাকাশে সম্পূর্ণ একা বা এককভাবে অবস্থান করছে।
গবেষণা দলটির সদস্য ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ জেনিভা’র জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের গবেষক ইয়ান কার্তেরে বলেছেন, “আমাদের চরম অবাক করে দিয়ে গ্রহটি কেবল অসামঞ্জস্যপূর্ণ কক্ষপথেই নেই, বরং এটা তারার ঘূর্ণনের ঠিক বিপরীত দিকে অর্থাৎ প্রতিমুখী হয়ে প্রদক্ষিণ করছে।”
বিজ্ঞানীরা বলছেন, নবজাতক তারাকে ঘিরে থাকা গ্যাস ও ধূলিকণার চাকতি থেকেই এসব গ্রহের জন্ম হয়। এসব উপাদান কেন্দ্রীয় তরুণ তারার ঘূর্ণনের একই দিকে ঘুরতে থাকে। যার মানে সেখান থেকে জন্ম নেওয়া গ্রহগুলোরও একই দিকে ঘোরার কথা। একইভাবে গ্রহগুলোরও এদের তারার সঙ্গে একই সমতলীয় কক্ষপথ ভাগ করে নেওয়ার কথা।
তারার কৌণিক সমতল ও এর প্রতিটি গ্রহের অবস্থানের এই কোণগত পার্থক্যকে ‘সাই’ বলে, যা গ্রহ গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন বিঘ্ন বা আকর্ষণের ফলে তৈরি হয়। যেমন, পৃথিবীর ‘সাই’ কোণের মান ৭ ডিগ্রি।
ইয়ান কার্তেরে বলেছেন, “এ সাই কোণ পরিমাপ করা গ্রহজগতের গঠন ও বিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য গ্রহজগতের ক্ষেত্রেও এটা পরিমাপ করার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।”
পৃথিবীর চেয়ে প্রায় আড়াই গুণ বড় ও সাড়ে চার গুণ ভারী দূরবর্তী সাব-নেপচুন গোত্রীয় ভিনগ্রহটি মহাবিশ্বের প্রচলিত সব নিয়মকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
মিল্কি ওয়ে ছায়াপথে বহুল প্রচলিত এ ধরনের গ্রহের দেখা মিললেও সম্প্রতি আবিষ্কৃত ‘জিজে ৩০৯০ বি’ গ্রহটির কক্ষপথের অস্বাভাবিকতা বিজ্ঞানীদের রীতিমতো হতবাক করেছে।
৭৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত গ্রহটির কক্ষপথের কোণ বা ‘সাই’-এর মান ১৩৬ ডিগ্রি।
চিলির ‘লা সিলা অবজারভেটরি’র শক্তিশালী এনআইআরপিএস ইনফ্রারেড ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করে গ্রহটির এ তথ্য উদ্ঘাটন করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
‘ইউনিভার্সিটি অফ জেনিভা’র গবেষক লেনা পার্ক বলেছেন, “এনআইআরপিএস এর অসাধারণ ইনফ্রারেড সক্ষমতার কারণেই এত ছোট গ্রহের কক্ষপথ ও তারার বিষুবীয় তলের মধ্যবর্তী কোণ নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছে।”
মহাবিশ্বে এ পর্যন্ত ৭০ ডিগ্রির বেশি ‘সাই’ কোণওয়ালা যে কয়েকটি গ্রহ মিলেছে এর মধ্যে এটি একটি। তবে ব্যতিক্রম হল, অন্যান্য গ্রহজগতে বড় আকারের সহচর তারা বা মহাজাগতিক বস্তুর উপস্থিতি রয়েছে, যার মহাকর্ষীয় টানে এমন উল্টো বা হেলে থাকা কক্ষপথ তৈরি হয়।
তরে ‘জিজে ৩০৯০ বি’র ক্ষেত্রে বড় কোনো অভিভাবক গ্রহের অস্তিত্ব মেলেনি।
এ অদ্ভুত কক্ষপথের রহস্য নিয়ে ‘ইউনিভার্সিটি অফ জেনিভা’র আরেক গবেষক ভিনসেন্ট বুরিয়ার বলেছেন, “এ অস্বাভাবিক কক্ষপথ ব্যাখ্যা করার মতো কোনো বড় সহচর না থাকায় আমাদের নতুন সব অনুমানের দিকে তাকাতে হচ্ছে।
“জিজে ৩০৯০-এর ক্ষেত্রে হয়ত তারাটি অতীতে এক ভিন্নমুখী ও বিপরীতমুখী দ্বিতীয় চাকতি বা ডিস্ক নিজের মধ্যে টেনে নিয়েছিল, যার ভেতর থেকেই এ গ্রহের জন্ম হয়েছে।”
সোমবার গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল ‘অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস’-এ।
