০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

মহাকাশে গানের ইতিহাস: নক্ষত্রের মাঝে সুরের খোঁজ

পৃথিবীর বাইরে রচিত প্রথম মৌলিক গান কোনটি

মহাকাশে গানের ইতিহাস: নক্ষত্রের মাঝে সুরের খোঁজ

ছবি: বিবিসি স্কাই অ্যাট নাইট ম্যাগাজিন।

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 01 Oct 2026, 01:17 PM

Updated : 01 Oct 2026, 01:26 PM

ভিনাইল রেকর্ডে পিন ছোঁয়ালেই যেমন জাদুকরী সুর বেজে ওঠে, মহাকাশের অনন্ত শূন্যতায়ও ঠিক তেমনি বারবার পৌঁছে গেছে পৃথিবীর গান। পৃথিবী থেকে পাঠানো রেডিও সিগন্যাল হোক বা মহাকাশযানে নভোচারীদের নিয়ে যাওয়া ক্যাসেট—মহাশূন্যের তারায় তারায় যেন মিশে আছে মানুষের তৈরি সুর।

আর্টেমিস-২ মিশনের নভোচারীদের ঘুম ভাঙাতে মিশন কন্ট্রোল থেকে যখন ‘পিংক পনি ক্লাব’ গানটি বাজানো হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, মহাকাশযাত্রার মতো এক অসীম ও গভীর যাত্রার সঙ্গে সংগীতের সম্পর্ক কতটা নিবিড়।

মহাকাশে প্রথম গানের সুরটি কিন্তু কোনো রেকর্ড প্লেয়ার থেকে আসেনি, এসেছিল সরাসরি মানুষের কণ্ঠ থেকে। ১৯৬২ সালের কথা। সোভিয়েত কসমোনট পাভেল পোপোভিচ মহাকাশে বসে গেয়ে ওঠেন ইউক্রেনীয় লোকগান ‘ওয়াচিং দ্য স্কাই অ্যান্ড থিংকিং আ থট’। রকেট ইঞ্জিনিয়ার সের্গেই কোরোলেভের অনুরোধেই তিনি গানটি গেয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের স্মরণে বহু বছর পর, ২০১৭ সালে ইউক্রেন ১২ অগাস্টকে ‘ইউক্রেনীয় সংগীত দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।

এরপর আমেরিকান নভোচারীরাও মহাকাশে সংগীতের ইতিহাস গড়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। ১৯৬৫ সালে জেমিনি সিক্সএ মিশনের দুই নভোচারী ওয়াল্টার এম. শিরা জুনিয়র ও থমাস পি. স্ট্যাফোর্ড মহাকাশে প্রথম বাদ্যযন্ত্র বাজানোর রেকর্ড গড়েন। তারা লুকিয়ে মহাকাশযানে একটি হারমোনিকা আর কিছু ঘণ্টা নিয়ে গিয়েছিলেন। কন্ট্রোল রুমে মজা করে জানান যে, তারা একটি ইউএফও দেখতে পাচ্ছেন যেটি সান্তা ক্লজ চালাচ্ছেন!

এরপরই তারা হারমোনিকা ও ঘণ্টা বাজিয়ে ‘জিঙ্গেল বেলস’ গেয়ে শোনান। স্নায়ুযুদ্ধের সেই গুমোট সময়ে নভোচারীদের এমন নির্ভেজাল মজা পৃথিবীর মানুষদের জন্য দারুণ এক স্বস্তির খবর ছিল।

অ্যাপোলো মিশনগুলোও গানের ইতিহাসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো ১০ যখন চাঁদের উল্টোদিক প্রদক্ষিণ করছিল, তখন নভোচারীরা অদ্ভুত এক শিস দেওয়ার মতো শব্দ শুনতে পান। পরে জানা যায়, লুনার মডিউল এবং কমান্ড মডিউলের যোগাযোগ ব্যবস্থার সিগন্যাল মিলে গিয়েই এই ভৌতিক শব্দের তৈরি হয়েছিল। তবে এর বাইরেও একটি সুন্দর ঘটনা ঘটেছিল। ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রার বিখ্যাত গান ‘ফ্লাই মি টু দ্য মুন’ প্রথমবার চাঁদের কক্ষপথে বেজেছিল এই অ্যাপোলো ১০ মিশনেই।

পরে অ্যাপোলো ১১ মিশনের নভোচারীরাও তাদের সঙ্গে দারুণ সব মিক্সটেপ নিয়ে গিয়েছিলেন। নিল আর্মস্ট্রংয়ের পছন্দের তালিকায় ছিল ১৯৪৭ সালের লেস ব্যাক্সটারের অ্যালবাম ‘মিউজিক আউট অব দ্য মুন’-সহ পেগি লি, বারবারা স্ট্রাইস্যান্ড এবং গ্লেন ক্যাম্পবেলের মতো কিংবদন্তিদের গান।

মহাকাশে কেবল গান শোনা বা বাদ্যযন্ত্র বাজানোই নয়, রীতিমতো নতুন গান রচনা ও রেকর্ডিংও হয়েছে। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে কানাডিয়ান নভোচারী ক্রিস হ্যাডফিল্ড আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) বসে রচনা করেন ‘জুয়েল ইন দ্য নাইট’ নামের একটি গান। মহাকাশ স্টেশনে থাকা একটি অ্যাকোস্টিক গিটার বাজিয়ে ক্রিসমাসের ঠিক আগে তিনি এটি রেকর্ড করেন। এটিই ছিল পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে বসে লেখা ও রেকর্ড করা প্রথম কোনো মৌলিক গান।

নভোচারীদের ঘুম ভাঙাতে মিশন কন্ট্রোল থেকে গান বাজানোর ঐতিহ্যটি বেশ পুরনো। স্পেস শাটল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন—সবখানেই এই রীতি মানা হয়। তবে মহাকাশে প্রথম রক মিউজিক পৌঁছানোর দাবিটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। ১৯৮৮ সালে সোভিয়েত সয়ুজ টিএম-৭ মিশনের নভোচারীরা বিখ্যাত ব্যান্ড পিংক ফ্লয়েডের লাইভ অ্যালবাম ‘ডেলিকেট সাউন্ড অব থান্ডার’ সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। ব্যান্ডের সদস্য ডেভিড গিলমোর দাবি করেছিলেন, এটিই মহাকাশে যাওয়া প্রথম রক অ্যালবাম। যদিও অনেকেই বলেন যে, এর আগেই অ্যাপোলো ১৫ মিশনে নভোচারীদের নেওয়া ক্যাসেটগুলোর মধ্যেই কোনো রক গান প্রথম মহাকাশে পৌঁছে গিয়েছিল।

গান যে শুধু পৃথিবী থেকে মহাকাশযানে গেছে তা নয়, বরং অন্য গ্রহ থেকে পৃথিবীতে গান সম্প্রচারও করা হয়েছে। ২০১২ সালে নাসার কিউরিওসিটি রোভার মঙ্গলগ্রহের বুক থেকে বিখ্যাত গায়ক উইল.আই.অ্যাম-এর ‘রিচ ফর দ্য স্টারস’ গানটি পৃথিবীতে সম্প্রচার করে। প্রায় ৪৮০ মিলিয়ন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসা সেই সুরটিই ছিল অন্য কোনো গ্রহ থেকে সম্প্রচারিত প্রথম গান।

২০০৩ সালে মঙ্গল গ্রহে পৌঁছানো বিগল-২ রোভারেরও বিখ্যাত ব্যান্ড ‘ব্লার’-এর একটি গান বাজানোর কথা ছিল, কিন্তু অবতরণের পর রোভারটির সঙ্গে পৃথিবীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি।

তবে মানুষের পাঠানো সবচেয়ে দূরের গানগুলো সযত্নে রক্ষিত আছে ভয়েজার ১ এবং ২ মহাকাশযানে। সেখানে রাখা সোনার প্রলেপ দেওয়া তামার রেকর্ডে খোদাই করা আছে চাক বেরি, বাখ এবং মোজার্টের মতো কিংবদন্তিদের অমর সব সৃষ্টি। সঙ্গে আছে পৃথিবীর নানা সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় সব সুর।

অসীম মহাবিশ্বের বুকে ভাসতে থাকা এই সুরগুলো হয়তো একদিন ভিনগ্রহের কোনো উন্নত সভ্যতার কাছে পৌঁছাবে। হয়তো তারা আশির দশকের সেই পপ গানগুলো শুনে অবাক হবে, কিংবা হয়তো সেগুলোর অর্থই বুঝবে না। তবে অনন্ত নক্ষত্রবীথির মাঝে মানুষের এই সুরেলা আবেদনগুলো আজও কোনো এক অজানা শ্রোতার অপেক্ষায় মহাকাশেই ভেসে বেড়াচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি স্কাই অ্যাট নাইট ম্যাগাজিন।