স্পেসএক্সের স্টারশিল্ড কতটা আলাদা স্টারলিংক থেকে?
স্পেসএক্সের বাণিজ্যিক সেবা স্টারলিংক মানুষের উচ্চগতির স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সুবিধা দিলেও এর সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে তৈরি বিশেষ সংস্করণ হচ্ছে স্টারশিল্ড।
রাশিয়ার ক্রমাগত বিমান হামলার মুখে সামরিক ক্ষেত্রে বিশেষ প্রযুক্তি পরিষেবা ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে স্পেসএক্স।
ইলন মাস্কের কোম্পানিটির এ পদক্ষেপে ইউক্রেইনের প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ায় স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ‘স্টারশিল্ড’-এর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা কার হাতে তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইউক্রেইন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, কোনো ধরনের আগাম সতর্কতা ছাড়াই স্পেসএক্স তাদের সামরিক কাজে ব্যবহারের উপযোগী স্টারশিল্ড পরিষেবায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
এ সপ্তাহে রাশিয়ার তীব্র হামলার মুখে নাগরিকদের সুরক্ষা ও সামরিক অভিযান পরিচালনায় এই সিদ্ধান্ত বড় ধরনের বাধা তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন কিইভের কর্মকর্তারা।
ইউক্রেইনের এমন অভিযোগের জবাবে স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী মাস্ক স্টারশিল্ড ব্যবহারের ওপর আরোপিত যে কোনো পরিবর্তনের দায় যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপিয়েছেন।
তার দাবি, স্টারশিল্ড সিস্টেমের আসল মালিক ও নিয়ন্ত্রক ওয়াশিংটন। ফলে এ পরিষেবার ব্যবহার সীমা বা শর্তাবলী নির্ধারণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ইউএস মিলিটারির ও শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র এখতিয়ার।
মাস্কের মন্তব্যের বিষয়ে সিএনবিসির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি হোয়াইট হাউস বা পেন্টাগন।
কী এই স্টারশিল্ড ও কীভাবে কাজ করে?
স্টারশিল্ড হচ্ছে স্পেসএক্সের নির্মিত বিশেষ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক, যা সরকারি ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়েছে। এটা স্পেসএক্সের বাণিজ্যিক সেবা স্টারলিংকের মূল প্রযুক্তি ও রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে তোলা হয়েছে।
স্পেসএক্সের তথ্যমতে, স্টারশিল্ড বর্তমানে তিনটি প্রধান কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, সরকারি গ্রাহকদের জন্য নিরাপদ বৈশ্বিক যোগাযোগ নিশ্চিত করা ও গোয়েন্দা বা সামরিক ব্যবহারের জন্য গ্রাহকদের বিশেষ সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি স্যাটেলাইটে বহন করা।
গ্রাহক ও বাণিজ্যিক কোম্পানির জন্য ব্যবহৃত স্টারলিংকের তুলনায় স্টারশিল্ডে উচ্চমাত্রার সুরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল গোপন তথ্য আদান-প্রদানের জন্য উচ্চমানের ক্রিপ্টোগ্রাফিক সক্ষমতা।
কোম্পানিটি বলেছে, তাদের এসব স্যাটেলাইট সামরিক সরঞ্জাম বহন ও লেজার যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে অন্যান্য স্যাটেলাইটের সঙ্গেও সংযোগ করতে পারে।
স্পেসএক্সের সাম্প্রতিক আয় প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছ থেকে স্টারশিল্ড প্রকল্পের জন্য ৬০০ কোটি ডলারেরও বেশি দামের চুক্তি পেয়েছে।
এই অর্থায়নের বড় অংশ এসেছে মার্কিন ‘স্পেস ফোর্স’-এর দুটি প্রধান চুক্তি থেকে, যার লক্ষ্য নিম্ন ভূ-কক্ষপথে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ ও সেন্সিং নেটওয়ার্ক তৈরি করা।
স্পেসএক্সের বাণিজ্যিক সেবা স্টারলিংক ও সরকার পরিচালিত স্টারশিল্ডের মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট করে মাস্ক বলেছেন, বাণিজ্যিক স্টারলিংক সেবা কেবল বেসামরিক ও আত্মরক্ষামূলক কাজে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত। আক্রমণাত্মক কোনো সামরিক অভিযানে স্টারলিংক ব্যবহার করা যাবে না।
স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
স্পেসএক্সের বাণিজ্যিক সেবা স্টারলিংক মানুষের উচ্চগতির স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সুবিধা দিলেও এর সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে তৈরি বিশেষ সংস্করণ হচ্ছে স্টারশিল্ড।
কাজের উদ্দেশ্যে ভিন্নতা থাকলেও প্রযুক্তিগতভাবে দুটি সেবা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। স্টারলিংক স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ভিত্তিক সেবা। এটা বিশ্বজুড়ে গ্রাহক, বেসামরিক খাত ও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হয়।
পৃথিবীর দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চল, যেখানে কেবল ইন্টারনেট পৌঁছায়নি সেখানে উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করাই স্টারলিংকের মূল উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে, স্টারশিল্ড সাধারণ সেবার বাইরে সরকারি গোপন যোগাযোগ ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিশেষভাবে তৈরি। এটা ব্যবহার করে শক্তিশালী বা এনক্রিপ্টেড ডেটা নিরাপত্তা প্রযুক্তি ও এনক্রিপশনওয়ালা বিশেষ টার্মিনাল।
তবে কাজ পরিচালনার জন্য এটা স্টারলিংকের বড় ও বিস্তৃত স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক বা অবকাঠামোর ওপরই নির্ভর করে।
স্পেসএক্সের তথ্য অনুসারে, বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশ, অঞ্চল ও বিভিন্ন বাজারে বর্তমানে স্টারলিংকের বাণিজ্যিক সেবা চালু রয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের জন্য যার সর্বনিম্ন মাসিক চার্জ শুরু হয় ৫৫ ডলার থেকে।
কোম্পানিটির দাবি, বেশিরভাগ অঞ্চলে এই সংযোগে প্রতি সেকেন্ডে ৪০০ মেগাবিটেরও বেশি ডাউনলোড স্পিড পাওয়া যায়।
