০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

সুপারনোভার ছবি তোলা ‘সুইফট’ বিদায় নিল অগ্নিসমাধিতে

সুপারনোভা বিস্ফোরণ, সৌরজগতের ধূমকেতু ও গ্রহাণুর মতো মহাবিশ্বের অসংখ্য মহাজাগতিক বস্তু ও ঘটনা সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে এই টেলিস্কোপ।

সুপারনোভার ছবি তোলা ‘সুইফট’ বিদায় নিল অগ্নিসমাধিতে

দুই দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি দুই হাজারটিরও বেশি গামা-রে বার্স্ট শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ করেছে। ছবি: নাসা

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Nov 2026, 09:30 AM

Updated : 05 Nov 2026, 09:30 AM

মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরণগুলোর ওপর দুই দশকের বেশি সময় ধরে নজর রাখার পর এবার যেন নিজের বিদায়ী আতশবাজি জ্বালিয়েই অভিযানের ইতি টানল নাসার ‘নিল গেহরেলস সুইফট’ মহাকাশ পর্যবেক্ষণযান।

যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্স জানিয়েছে, বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল ৭টা ৩৯ মিনিটে ইন্দোনেশিয়ার উত্তর সুমাত্রা অঞ্চলের ওপর দিয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে মহাকাশযানটি। সে সময় এর অবস্থান ছিল উত্তর অক্ষাংশের প্রায় ৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি এবং পূর্ব দ্রাঘিমাংশের ৯৮ দশমিক ৬ ডিগ্রিতে।

নাসার ধারণা, বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে নামার সময় মহাকাশযানটির বেশিরভাগ অংশই প্রচণ্ড তাপে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তবে কিছু যন্ত্রাংশ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পরও অক্ষত থাকতে পারে, বিশেষ করে যেগুলো অসম্ভব মজবুত ও তাপসহ্যক্ষমতাসম্পন্ন ধাতুতে তৈরি।

প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে মহাবিশ্বের অজানা বিস্ময় খুঁজে বেড়ানো সুইফটের এই প্রত্যাবর্তন তাই কেবল একটি মহাকাশযানের যাত্রার সমাপ্তি নয়, মহাবিশ্বকে আরও ভালোভাবে জানার মানুষের দীর্ঘ অভিযাত্রারও এক স্মরণীয় অধ্যায়।

এর আগে, ‘নিল গেরেলস সুইফট অবজারভেটরি’ বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ঘর্ষণে স্যাটেলাইটটি সম্পূর্ণ পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।

তিনটি শক্তিশালী টেলিস্কোপ নিয়ে কেবল দুই বছরের মিশনের জন্য নকশা করা স্যাটেলাইটটি তার জীবনকালের শেষ প্রান্তে এসে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় ছিল, যা দিয়ে আর কোনো পর্যবেক্ষণ চালনা বা এর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্স পূর্বাভাস দিয়েছিল, ৩ হাজার ২০০ পাউন্ড ভরের এই মহাকাশযানটি মার্কিন পূর্বাঞ্চলীয় সময় ৪ নভেম্বর ভোররাত সাড়ে ৩টার দিকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আঘাত করতে পারে।

আগেই নাসা সুরক্ষার বিষয়ে নাসা বলেছে, “টেলিস্কোপটি পড়ার ফলে পৃথিবীতে কারো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ক্ষীণ, আনুমানিক ২ হাজার ১০০ জনের মধ্যে ১ জন। নাসা ও স্পেস ফোর্স বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে এবং নতুন তথ্য অনুসারে তাদের পূর্বাভাস আপডেট করবে।”

মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরণ, যাকে সংক্ষেপে ‘কসমিক গামা-রে বার্স্ট’ বলা হয় সেগুলোর রহস্য উন্মোচন এবং তাৎক্ষণিকভাবে পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের কাছে স্থান ও তীব্রতার ডেটা পাঠাতে ২০০৪ সালে টেলিস্কোপটি উৎক্ষেপিত হয়।

দুই দশকের দীর্ঘ এই পর্যবেক্ষণটি দুই হাজারটিরও বেশি গামা-রে বার্স্ট শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ করেছে।

Image

টেলিস্কোপটি উৎক্ষেপিত হয়েছিল ২০০৪ সালে। ছবি: রয়টার্স

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাবিশ্ব তৈরির সূচনা বা ‘বিগ ব্যাং’-এর পর থেকে এগুলোই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে বিধ্বংসী বিস্ফোরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

নাসার তথ্য অনুসারে, এ ধরনের শক্তিশালী শক্তির বিস্ফোরণ প্রায় প্রতিদিনই মহাবিশ্বের নানা দিক থেকে ঘটে থাকে। ক্ষণস্থায়ী হলেও তীব্র এই গামা রশ্মির বিকিরণ কয়েক মিলি-সেকেন্ড থেকে শুরু করে কয়েকশ সেকেন্ড পর্যন্ত স্থায়িত্ব পায়।

তবে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় এত বড় বিস্ফোরণ ঘটে সে বিষয়ে নিশ্চিত নন বিজ্ঞানীরা।

তাদের ধারণা, কোনো বড় তারার চরম বিস্ফোরণের মাধ্যমে ব্ল্যাক হোলের জন্মকালে বা দুটি নিউট্রন তারার মুখোমুখি সাংঘর্ষিক সংঘর্ষের ফলে এ ধরনের অতি-উচ্চমাত্রার শক্তি উৎপন্ন হতে পারে।

নাসার ‘মিডিয়াম এক্সপ্লোরার’ বা ‘মিডেক্স’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল সুইফট টেলিস্কোপ।

এ বছরের জুলাইয়ে এটা মহাকাশে এক অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হয়, যেখানে একটি যাযাবর দানবীয় ব্ল্যাক হোলের মাধ্যমে একটি তারাকে টুকরা টুকরা করে গ্রাস করার দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করে সুইফট।

কোনো তারা যখন অতিভারী ব্লাক হোলের কাছাকাছি চলে আসে তখনই এমন ভয়ংকর ঘটনা ঘটে।

গেল বছর এক বেসরকারি মহাকাশ ঠিকাদারের সাহায্যে সুইফটকে এর অবস্থান থেকে উচ্চতর কক্ষপথে পাঠানোর চেষ্টা করেছিল নাসা। তবে কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ায় সেই মিশন সফল হয়নি।

গত মাসে সুইফট পৃথিবীর প্রায় ১৭১ মাইল ওপর দিয়ে প্রদক্ষিণ করছিল বলে অনুমান করা হয় ও বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের প্রস্তুতি নিতে অক্টোবরের ২৩ তারিখে এর কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

নাসা বলেছে, সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের মাধ্যমে চলা সক্রিয় ছায়াপথ ও এক্স-রে রশ্মির শিকার তারা থেকে শুরু করে সুপারনোভা বিস্ফোরণ এবং সৌরজগতের ধূমকেতু ও গ্রহাণুর মতো মহাবিশ্বের অসংখ্য মহাজাগতিক বস্তু ও ঘটনা সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞানকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে সুইফট অবজারভেটরি।