২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

ব্ল্যাক হোলের মূল উপাদান ডার্ক ম্যাটার নয়, বলছে গবেষণা

ছায়াপথ প্রচণ্ড গতিতে ঘূর্ণনশীল থাকার পরও কেন ছিটকে যায় না তা ব্যাখ্যার জন্য বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বের কথা বলে আসছেন।

ব্ল্যাক হোলের মূল উপাদান ডার্ক ম্যাটার নয়, বলছে গবেষণা

বর্তমানে বিজ্ঞানীদের জানা সবচেয়ে বড় ব্ল্যাক হোলটির ভর আনুমানিক ৩ হাজার ৬০০ কোটি সূর্যের ভরের সমান। ছবি: নাসা

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 26 Oct 2026, 12:04 PM

Updated : 26 Oct 2026, 12:04 PM

মহাবিশ্বের অধিকাংশ পদার্থ যে রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য বস্তু দিয়ে গঠিত তা আস্ত ছায়াপথের চেয়েও বড় ভরের ব্ল্যাক হোলগুলোর প্রধান উপাদান নয় বলে দাবি করা হয়েছে এক নতুন গবেষণায়।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সাইট স্পেস ডটকম প্রতিবেদনে লিখেছে, মহাবিশ্বের বিভিন্ন ছায়াপথ প্রচণ্ড গতিতে ঘূর্ণনশীল থাকার পরও কেন ছিটকে গিয়ে ভেঙে পড়ে না তা ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ডার্ক ম্যাটারের মতো অদৃশ্য পদার্থের অস্তিত্বের কথা বলে আসছেন।

এ অদৃশ্য পদার্থের শক্তিশালী মহাকর্ষীয় টান বিভিন্ন ছায়াপথকে পরস্পরের সঙ্গে একত্র ও সুসংহত রাখতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্বের মোট পদার্থের প্রায় পাঁচ-ষষ্ঠাংশই এই ডার্ক ম্যাটার দিয়ে গঠিত।

তবে ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব নিয়ে এখনো বহু রহস্য অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বাস্তবে আদৌ ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব রয়েছে কি না তা নিয়েও বিজ্ঞানমহলে প্রশ্ন রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে গবেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ব্ল্যাক হোলগুলো ডার্ক ম্যাটারের শক্তিশালী সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে। কারণ এগুলো ভারী ও মহাকাশের সুদূর অন্ধকার গভীরে সহজে দৃশ্যমান হয় না।

সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া নতুন গবেষণায় গবেষক দলটি খতিয়ে দেখেছে, ডার্ক ম্যাটার কি এমন কোনো ‘বড় ব্ল্যাক হোল’ দিয়ে তৈরি হতে পারে যেগুলোর ভর সূর্যের ভরের চেয়েও ১০ হাজার কোটি গুণ বেশি?

সূর্যের ভরের ১ লাখ কোটি থেকে ১০ লাখ কোটি গুণ পর্যন্ত বড় এমন অকল্পনীয় বড় ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব থাকতে পারে, যা আস্ত এক ছায়াপথে ভরের চেয়েও বেশি ভারী।

তবে এখন পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এ ধরনের কোনো অতি-বড় ব্ল্যাক হোলের সন্ধান পাননি। বর্তমানে বিজ্ঞানীদের জানা সবচেয়ে বড় ব্ল্যাক হোলটির ভর আনুমানিক ৩ হাজার ৬০০ কোটি সূর্যের ভরের সমান।

গবেষকরা অসংখ্য ছায়াপথ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পরও এ ধরনের কোনো ব্ল্যাক হোলের উপস্থিতি পাননি। ফলে নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, এগুলো ডার্ক ম্যাটারের সম্পূর্ণ অংশ গঠন করতে পারে না।

এরপরও গবেষণা দলটির মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এসব অদ্ভুত ও রহস্যময় বস্তু অন্তত ডার্ক ম্যাটারের বড় অংশ বা অনুপাত গঠন করতে পারে কি না।

জার্মানির ‘মেইনজ ইনস্টিটিউট অফ থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স’-এর তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ও এ গবেষণার সহ-লেখক ক্রিস্টোফার গেরলাচ বলেছেন, “প্রায়শই ডার্ক ম্যাটারকে সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা এক সূক্ষ্ম ধূলিকণার মতো মনে করা হয়।”

তবে ডার্ক ম্যাটার যদি বড় আকারের ব্ল্যাক হোলের মতো কিছু দানাদার বস্তুর মধ্যে পুঞ্জীভূত থাকে তবে ‘খুব বড় পরিসরে মহাবিশ্বকে দানাদার বলে মনে হবে। আর বিষয়টি আমরা যাচাই করে দেখতে পারি’।

গবেষণার আরেক সহ-লেখক ও ‘মেইনজ ইনস্টিটিউট অফ থিওরেটিক্যাল ফিজিক্সের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ইয়ান গুটেনোয়ার বলেছেন, গবেষকরা মহাবিশ্বের সূচনালগ্ন থেকে আসা আলো নিয়ে গবেষণা করেছেন।

মহাবিশ্ব তৈরির পর প্রথম ৩ লাখ ৮০ হাজার বছর ধরে এর পুরো মহাকাশ একটি উত্তপ্ত প্লাজমায় পরিপূর্ণ ছিল, যার ভেতর আলো আটকে থাকত।

পরবর্তীতে মহাবিশ্বের প্রসারণের ফলে তা পর্যাপ্ত ঠান্ডা হয় ও প্লাজমাগুলো অনেকাংশে বিলীন হয়ে পরমাণু গঠন করে।

ক্রিস্টোফার গেরলাচ বলেছেন, এর ফলে আলো স্বাধীনভাবে ভ্রমণের সুযোগ পায়, “আর সেই আলো আজও আমাদের কাছে এসে পৌঁছাচ্ছে। একে আমরা বলি ‘কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড’ বা মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমি, যা সমগ্র আকাশ জুড়ে শৈশবের মহাবিশ্বের একটি স্থির চিত্র তুলে ধরেছে”।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবু ধাবি’র তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ও গবেষণাটির সহ-লেখক আন্তোনিও ইওভিনো বলেছেন, “কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ডের তাপমাত্রা স্থানভেদে প্রতি ১ লাখের প্রায় ১ ভাগ পরিবর্তিত হয়। এ প্যাটার্নটি আমাদের বলে দেয়, ওই সময় পদার্থ কীভাবে ছড়িয়ে ছিল।”

মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অতি-বড় ব্ল্যাক হোলগুলো থাকলে মহাবিশ্ব যেভাবে দানাদার হওয়ার কথা ছিল আদতে এটা তেমন নয়।

‘মেইনজ ইনস্টিটিউট অফ থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স’-এর তাত্ত্বিক পদার্থবিদ নিকোলাস লেইস্টার বলেছেন, “ফলে এসব ব্ল্যাক হোল ডার্ক ম্যাটারের কোনো উল্লেখযোগ্য অংশ হতে পারে না।”

গবেষকরা বলেছেন, নতুন গবেষণার ফলাফলের মানে এই নয় যে, বড় ব্ল্যাক হোলগুলোর অস্তিত্ব থাকতে পারে না, বরং এর মানে এগুলো ডার্ক ম্যাটারের কোনো বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করে না।

ডার্ক ম্যাটারের আরেকটি সম্ভাব্য প্রার্থী, অর্থাৎ গ্রহাণু আকারের তুলনামূলক ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব থাকতে পারে।

বর্তমানে গবেষকরা খতিয়ে দেখছেন, এসব ছোট্ট ব্ল্যাক হোলকেও ডার্ক ম্যাটারের প্রধান উপাদান নয় বলা যায় কি না।

২৬ অক্টোবর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ পাবে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স’ জার্নালে।