Published : 08 Jun 2026, 01:41 PM
পতঙ্গরা কেবলই সহজাত প্রবৃত্তিতে চলাফেরা করা কোনো যন্ত্র নয়, বরং এরা চমৎকার বুদ্ধিমত্তারও অধিকারী– এমনই তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের মৌমাছিরা মানুষের শেখানো কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজেদের উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে ও নির্দিষ্ট সরঞ্জাম বা হাতিয়ার ব্যবহার করে জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে লিখেছে, প্রায় ১০০ বছর আগে এক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথম প্রমাণ হয়েছিল, শিম্পাঞ্জিরা একটার ওপর আরেকটা বাক্স সাজিয়ে উঁচুতে নাগালের বাইরে থাকা কলা পেড়ে খেতে পারে।
মৌমাছিদের ওপর এবার ঠিক তারই এক পরিমার্জিত রূপ প্রয়োগ করেছেন বিজ্ঞানীরা।
আগে কেবল বিভিন্ন প্রজাতির বানর, হাতি ও কাকের মতো প্রাণীরাই এ ধরনের তাৎক্ষণিক বুদ্ধি ও স্বতঃস্ফূর্ত সমস্যা সমাধানের বিশেষ তালিকায় জায়গা পেয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠেছে, মৌমাছিরা এক পলিস্টাইরিনের বল গড়িয়ে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যেতে ও নিচু ছাদে থাকা কৃত্রিম ফুল থেকে খাবার সংগ্রহ করতে সেই বলের ওপর চড়ে বসতে পারে।
এ গবেষণা বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে, যেখানে অনুমান ছিল, পতঙ্গরা কেবল নিজেদের সহজাত প্রবৃত্তি এবং অবচেতনভাবে চেষ্টা ও ভুলের মাধ্যমেই সবকিছু শেখে।
ফিনল্যান্ডের ‘ইউনিভার্সিটি অফ ওলু’র আচরণগত বাস্তুসংস্থানবিদ ও এ গবেষণার প্রধান লেখক ড. ওলি লৌকোলা বলেছেন, “অধিকাংশ মানুষ মনে করেন কীটপতঙ্গরা কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় চলাফেরা করা এক ধরনের যন্ত্রের মতো। তারা ভাবেন এদের কোনো আবেগীয় অনুভূতি বা ব্যথা পাওয়ার সক্ষমতা নেই। কিছু মানুষ তো এটাও জানেন না, এদের মস্তিষ্ক আছে।
“আমার ধারণা, গবেষণার এসব ফলাফল আমাদের আশপাশের জগত সম্পর্কে মানুষের সেই পুরানো দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে।”
এ গবেষণায় মাত্র কয়েক সপ্তাহ বয়সী বিভিন্ন মৌমাছিকে প্রথমে নীল রঙের এক কৃত্রিম ফুলের সঙ্গে চিনিমিশ্রিত পানির বিনিময়ে পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টি শিখিয়ে অভ্যস্ত করেছেন গবেষকরা।
এরপর মূল পরীক্ষার সময়, ফুলটিকে এক স্বচ্ছ পাত্রের সিলিং বা ছাদের কাছাকাছি এমন এক জায়গায় রাখা হয়, যা এদের নাগালের বাইরে এবং সেখানে ওড়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গাও নেই।
পাশাপাশি সেই পাত্রের ভেতরে একটি বলও রাখা হয়েছিল। ফুলটির নাগাল পেতে মৌমাছিটিকে বলটি গড়িয়ে ঠিক তার নিচে নিয়ে গিয়ে সেটির ওপরে চড়তে হত, যা ছিল এমন এক আচরণগত ধারাবাহিকতা, যার মুখোমুখি এরা আগে কখনও হয়নি এবং এর জন্য এদের কোনো প্রশিক্ষণও নেই।
পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপে প্রায় ৭৫ শতাংশ মৌমাছিই সফলভাবে ফুলের নাগাল পেয়েছে।
ড. লৌকোলা বলেছেন, “এমনটা চিরাচরিত বক্স-অ্যান্ড-ব্যানানা সমস্যারই এক পতঙ্গ সংস্করণ। এখানে প্রাণীটিকে অবশ্যই বুঝতে হয়, একটি বস্তুর স্থান পরিবর্তন করা সম্ভব এবং সেটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এমন এক লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়, যা অন্যথায় সম্ভব নয়।
“এ গবেষণার উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এ ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এখন কীটপতঙ্গের মধ্যেও প্রমাণিত হল।”
তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, মৌমাছিরা কি আসলেই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এ সমস্যার সমাধান করছিল? এর বিকল্প সম্ভাবনা এমনও হতে পারে, মৌমাছিরা হয়ত কেবল বল গড়ানোর আনন্দ উপভোগ করেছে এবং আলাদাভাবে সেই নীল রঙের বিন্দুর প্রতি আকর্ষিত হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, এরা আসলে ঘটনাক্রমে বা ভাগ্যবশত বলটিকে সঠিক জায়গায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য বিজ্ঞানীরা মৌমাছিগুলোকে আরও জটিল ও কঠিন পরীক্ষায় ফেলেন। পরীক্ষার চূড়ান্ত ধাপে, বলটি ভেতরে দেওয়ার আগেই মৌমাছিগুলোকে বাম ও ডান পাশের দুটি চেম্বার বা কক্ষ ঘুরে দেখার সুযোগ মেলে, যার একটিতে কৃত্রিম ফুলটি রয়েছে।
এরপর বিজ্ঞানীরা কক্ষটিতে লাল আলো জ্বালিয়ে দেন, যার ফলে মৌমাছিদের জন্য নীল ফুলটি দেখা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং ঠিক তখনই বলটি ভেতরে দেওয়া হয়।
এ কাজটি সফলভাবে করতে মৌমাছিদের স্মৃতি থেকে ফুলটির অবস্থান মনে করে বলটিকে ঠিক তার নিচে নিয়ে বসাতে হত। এক্ষেত্রে ৩০টি মৌমাছির মধ্যে ২৩টিই এ কাজে সফল হয়েছে।
ড. লৌকোলা বলেছেন, “আমরা এমনটা দাবি করছি না, মৌমাছিরা মানুষের মতো চিন্তা করে। তবে আমাদের এ গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মস্তিষ্কও নতুন কোনো সমস্যার এমন সব নমনীয় ও বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান তৈরি করতে পারে, যা আমরা কেবল এখন বুঝতে শুরু করেছি।”
‘কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন’-এর আচরণগত বাস্তুসংস্থানবিদ ও ‘মাইন্ড অফ এ বি’ বইয়ের লেখক অধ্যাপক লার্স চিটকা বলেছেন, “গবেষণাগারে আমরা মৌমাছিদের নানা ধরনের অসাধারণ কাজ করতে দেখেছি, যার মধ্যে গণনা বা নিখুঁতভাবে কোনো বস্তু নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় রয়েছে। এরা প্রতিবারই আমাকে অবাক করেছে।
“কোনো পরিস্থিতিতে ঠিক কী করতে হবে সে বিষয়ে এদের এক ধরনের বোধশক্তি বা বোঝাপড়া যে রয়েছে। আর আমাদের এ গবেষণা তারই সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ।”
তিনি এ গবেষণার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
অধ্যাপক চিটকা বলেছেন, “আমাদের সাধারণ ধারণা, বুদ্ধিমান আচরণের জন্য বড় মস্তিষ্কের প্রয়োজন, কারণ আমরা নিজেরা বড় মস্তিষ্কের অধিকারী ও প্রাণীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি বুদ্ধিমান।
“তবে ক্ষুদ্র স্নায়ুতন্ত্রের ভেতরেও ঠিক কতখানি বুদ্ধিমত্তা ঠাসা বা গুছিয়ে রাখা সম্ভব তার আদর্শ উদাহরণ মৌমাছিরা, যা আমাদের আশপাশের অন্য প্রাণীদের প্রতি কিছুটা শ্রদ্ধা বা সম্মান দেখানো দারুণ স্মারক।”
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ।