Published : 19 May 2026, 03:19 PM
চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত মামলায় হেরে গিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক।
ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের ফেডারেল জুরি স্যাম অল্টম্যান, ওপেনএআই ও কোম্পানিটির প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যানকে মাস্কের আনা অভিযোগগুলো থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন।
মাস্ক দাবি করেছিলেন, তারা অন্যায়ভাবে নিজেরা লাভবান হয়েছেন এবং স্টার্টআপটি প্রতিষ্ঠার সময় তার সঙ্গে করা মূল চুক্তিটি ভেঙেছেন। তার এমন দাবি নাকচ করে দিয়েছেন জুরি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, দুই ঘণ্টারও কম সময় আলোচনা করে জুরি এই রায় দিয়েছেন, যা মাস্ক ও তার আইনজীবীর করা ‘অল্টম্যান ওপেনএআইয়ের নেতৃত্ব হাতিয়ে এক দাতব্য কোম্পানি চুরি করেছেন’ এমন দাবির মুখে বড় চড়।
একইসঙ্গে রায়টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কোম্পানিটিকে এ বছরের শেষদিকে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যায়নে শেয়ার বাজারে যাওয়ার স্পষ্ট পথ তৈরি করে দিল।
জুরির এ সিদ্ধান্তটি একটি অ-বাধ্যতামূলক পরামর্শমূলক রায়, যার ফলে এ মামলায় নিজস্ব চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সম্পূর্ণ সক্ষমতা বিচারক ইভন গঞ্জালেস রজার্সের হাতেই ছিল। তবে রায় আসার সঙ্গে সঙ্গে বিচারক রজার্স বলেছেন, তিনি জুরির সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত এবং মাস্কের দাবিগুলো খারিজ করে দিয়েছেন।
রায় ঘোষণার পর বিচারক রজার্স মাস্কের আইনজীবীকে বলেছেন, “আমার মনে হয় জুরির এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পেছনে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। এ কারণেই আমি মামলাটি খারিজ করছি।”
জুরি বলছে, ২০২৪ সালে দায়ের করা মাস্কের এ মামলাটি আইনি সময়সীমার মধ্যে ছিল না। এ বিচার প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান আইনি বিতর্ক ছিল, মাস্ক যেসব ক্ষয়ক্ষতির দাবি তুলেছেন (যার মধ্যে দাতব্য ট্রাস্টের চুক্তি ভঙ্গের দাবিও রয়েছে) তা নির্দিষ্ট সময়ের আগে ঘটেছিল কি না।
ওপেনএআইয়ের দাবি, মাস্ক ২০১৭ সালের প্রথম দিকেই কোম্পানির ব্যবসায়িক বা লাভজনক কাঠামোতে রূপান্তরের পরিকল্পনা সম্পর্কে পুরোপুরি জেনেছেন। ফলে তিন বছরের আইনি সময়সীমা পার হওয়ার পর তিনি এ মামলাটি করেছেন।
একের পর এক আইনি ধাক্কা ও মোটা অংকের জরিমানার পরও তার স্বভাবসুলভ আগ্রাসী মনোভাব ও বেপরোয়া আইনি লড়াই কি এবার থামবে, নাকি নিজের বিপুল অর্থসম্পদের জোরে তিনি লড়াই চালিয়েই যাবেন তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
ওপেনএআই ও এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে করা মামলায় সোমবার তার হেরে যাওয়ার বিষয়টি আইনি লড়াইয়ে একের পর এক পরাজয় বা সমঝোতার তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
টুইটার (বর্তমানে এক্স) কিনে নেওয়ার পর সেখানকার সাবেক কর্মকর্তা ও হাজার হাজার সাবেক কর্মীকে কোনো অর্থ না দেওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করেছিলেন মাস্ক। তবে গেল বছরের শেষদিকে তিনি তাদের পাওনা মিটিয়ে দিয়ে বিষয়টি রফাদফা করতে বাধ্য হন।
এরপর মার্চে, টুইটারের বিনিয়োগকারীদের করা একটি মামলায় তিনি হেরে যান। বিনিয়োগকারীদের দাবি ছিল, টুইটার কিনে নেওয়ার সময় মাস্কের দেওয়া বিভিন্ন প্রকাশ্য বক্তব্য তাদের বিভ্রান্ত করেছিল।
ঠিক একই মাসে, ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে যাওয়া বিজ্ঞাপনদাতাদের বিরুদ্ধে মাস্ক যে মামলা করেছিলেন সেটিও খারিজ করে দিয়েছেন একজন বিচারক।
মে মাসে এসে আরেকটি ধাক্কা আসে। মাস্কের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা ও গত বছর তার নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারের খরচ কমানোর বিভাগ ‘ডজ’-এর কিছু পদক্ষেপ বাতিল করে দিয়েছেন আরেক বিচারক।
আদালত রায় দিয়েছে, কিছু অনুদান বা ফান্ড কেটে নেওয়ার এ সিদ্ধান্তটি ছিল ‘সংবিধানবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিগত বৈষম্যের এক আদর্শ উদাহরণ’।
এখন ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে এই বহুল আলোচিত মামলায় হেরে যাওয়ার পর মাস্ক কি ভবিষ্যতে এরকম গায়ে পড়ে ঝগড়া বা আইনি লড়াইয়ে জড়ানো কিছুটা কমিয়ে দেবেন?
‘সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটি’র আইন বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক শুভা ঘোষ বলেছেন, “আসলে কেউই অপরাজেয় নয়।”
তবে আদালতে মাস্কের এই আগ্রাসী মনোভাব বা জেদি স্বভাব বদলাতে হয়ত আরও বড় কোনো ধাক্কা বা ক্ষয়ক্ষতির প্রয়োজন হবে।
অধ্যাপক শুভা ঘোষ বলেছেন, “অনেক দিক থেকেই তিনি আর দশটা ব্যবসায়ী মানুষের মতোই নিজের অধিকার দাবি করছেন। আমার মনে হয় না তিনি আইনি ব্যবস্থার কোনো অপব্যবহার করছেন। তবে তিনি এটার সঠিক ব্যবহার করতে পারছেন কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।”
খামখেয়ালি বা প্রথাগত নিয়মের বাইরে চলার প্রবণতার পাশাপাশি মাস্কের রয়েছে বিশ্বে শক্তির সবচেয়ে বড় উৎস, তার অফুরন্ত অর্থসম্পদ। তার মালিকানাধীন মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্স খুব শিগগিরই শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে। যার এর ওপর ভিত্তি করে তিনি খুব দ্রুতই বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার (লাখ কোটি পতি) হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন।
মাস্কের এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের দিকে তাকালে এমনটা ভাবা কঠিন যে, পরপর কয়েকটি মামলায় হেরে যাওয়া, মামলার খরচ বা জরিমানা তাকে ভবিষ্যতে নতুন কোনো আইনি লড়াইয়ে জড়ানো থেকে দূরে রাখতে পারবে।
কলম্বিয়া ল’ স্কুলের আইনের অধ্যাপক ডরোথি লুন্ড বলেছেন, “আমি তার থামার কোনো লক্ষণ দেখছি না। মনে হচ্ছে, এমন কেউ নেই যিনি তার এই খামখেয়ালি কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে বড় কোনো শাস্তির মুখোমুখি করতে পেরেছেন বা এর বাস্তবিক কোনো প্রভাব তার ওপর ফেলতে পেরেছেন।”
টুইটারের শেয়ার প্রাথমিকভাবে কিনে নেওয়ার বিষয়টি গোপন রাখার দায়ে সম্প্রতি মার্কিন ‘সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন’ বা সিইএস তাকে ১৫ লাখ ডলার জরিমানা করেছে। তবে মাস্কের মতো একজন মানুষের কাছে এ অংকের জরিমানা একেবারেই হাতের ময়লা।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে টেসলা কোম্পানি থেকে মাস্কের জন্য নির্ধারিত শত-কোটি ডলারের পারিশ্রমিক বা পে-প্যাকেজটি বাতিল করে দিয়েছিলেন একজন বিচারক। ওই সময় মাস্ক সহজ একটি উপায় বেছে নিয়েছিলেন। তিনি পুরো কোম্পানিটিকে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে নতুন করে নিবন্ধিত করেন ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আগের চেয়েও বড় অংকের সম্ভাব্য পারিশ্রমিক অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন।
অধ্যাপক ডরোথি লুন্ড বলেছেন, “তিনি যা মনে চায় তা-ই করেন এবং বড়জোর মাঝেমধ্যে হালকা একটু ধমক বা সামান্য সাজা পান। তাহলে তিনি কেন নিজের স্বভাব বদলাবেন?”
সোমবার ওপেনএআই মামলার রায় নিজের বিপক্ষে যাওয়ায় মাস্ক তীব্র সমালোচনা করেছেন। নিজের সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ তিনি লিখেছেন, “এ রায়ের মানে দাঁড়ায়, আপনি যদি কয়েক বছর কোনো চুরির ঘটনা চেপে রাখতে পারেন তবে বিভিন্ন দাতব্য কোম্পানি লুটেপুটে খাওয়ার প্রকাশ্য লাইসেন্স পেয়ে গেলেন!”
একইসঙ্গে তিনি মামলাটির দায়িত্বে থাকা বিচারককে একজন ‘ভয়াবহ অ্যাক্টিভিস্ট’ বলে কটাক্ষ করেছেন এবং এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জোরালোভাবে উল্লেখ করেন।
‘তিনি ভয় পান না’
অধ্যাপক শুভা ঘোষ আরও যোগ করেছেন, মাস্কের ব্যক্তিত্ব আর দশজন সাধারণ মানুষের চেয়ে বড় ও ব্যতিক্রমী, যা তাকে প্রচলিত কর্পোরেট দুনিয়ার অন্যান্য নেতৃস্থানীয়র থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে তুলেছে।
একসময় মাস্কের অনুসারী ছিলেন স্যাম অল্টম্যান, পরে প্রতিদ্বন্দ্বী ও সবশেষে এখন প্রকাশ্য শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মাস্কের এই বহুল আলোচিত আইনি লড়াই যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই মাস্ক সিদ্ধান্ত নিলেন তার ‘স্পেসএক্স’ কোম্পানিটিকে শেয়ার বাজারে নিয়ে আসার।
ব্যবসায়িক জগতের সাধারণ নিয়ম অনুসারে, কেবল এ একটি সিদ্ধান্তই তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।
সাধারণত কোনো কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা যখন তাদের কোম্পানিকে শেয়ার বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি নেন তখন তারা ‘কোয়াইট পিরিয়ড’ বা এক ধরনের ‘নীরবতা পালনের সময়সীমা’ মেনে চলেন।
বিষয়টি মার্কিন ‘সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন’ বা এসইসি’র নির্ধারিত এমন এক সময়, যখন শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাওয়া কোনো কোম্পানির শীর্ষ কর্তারা চাইলেই যে কোনো বিষয়ে জনসমক্ষে মন্তব্য করতে পারেন না।
এ সময় প্রধান নির্বাহীরা যতটা সম্ভব কম কথা বলেন। কারণ কোম্পানির প্রবৃদ্ধি বা ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ কোনো বক্তব্য দেওয়াও এ নিয়মের অধীনে নিষিদ্ধ থাকে।
তবে অধ্যাপক ডরোথি লুন্ড বলেছেন, একের পর এক এতগুলো আইনি ধাক্কা খাওয়ার পরেও যেভাবে মাস্ক আদালত ও জনসমক্ষে নিজের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ও প্রবল ইচ্ছা দেখান সেক্ষেত্রে মাস্কের সঙ্গে তুলনীয় মানুষ পৃথিবীতে সত্যিই বিরল।
“তিনি জনমতের পরোয়া করেন না, আবার বড় কোনো ঝুঁকি নিতেও ভয় পান না। এ ধরনের ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা উদ্যোক্তাদের জন্য জরুরি।”
তবে, কোম্পানির বোর্ডরুম আর আদালতের কাঠগড়া এক জিনিস নয়।
লুন্ড আরও বলেছেন, ওয়াল স্ট্রিট চলচ্চিত্রের লোভী চরিত্র ‘গর্ডন গেকো’ যার আদলে তৈরি হয়েছিল সেই কুখ্যাত ও আগ্রাসী করপোরেট ব্যক্তিত্ব কার্ল আইকানও সম্ভবত মাস্কের মতো এতখানি দুঃসাহসী বা বেপরোয়া ছিলেন না।
“আর এসবকিছু কবে বা কীভাবে তার জন্য বড় কোনো বিপর্যয় ডেকে আনবে তা আমি জানি না।”
মাস্কের সমকক্ষ বা তুলনামূলক একমাত্র পরিচিত ব্যক্তিত্ব হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। যিনি জনসমক্ষে আকস্মিক ও বিতর্কিত মন্তব্য করা এবং প্রতিপক্ষ মনে করলেই তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
লুন্ড বলেছেন, “মাস্ক সত্যিই এক অনন্য ও অদ্বিতীয় চরিত্র। তবে কোনো নেতিবাচক বিষয়ই এই দুই জনের কারও গায়ে কখনো দাগ কাটতে পারে বলে মনে হয় না।”