Published : 02 Feb 2026, 10:40 AM
চ্যাটজিপিটি আসার পর থেকে মানুষের জীবন সহজ হয়েছে। এ সহজলভ্যতা কি অজান্তেই মানুষকে মেধাহীন করে তুলছে? সাম্প্রতিক নানা গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের মস্তিস্কের সক্রিয়তা কমানো ও স্বাভাবিক চিন্তার সক্ষমতাকে ভোঁতা করে দিচ্ছে।
প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার লিখেছে, প্রযুক্তি যখন মানুষের প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে যায় তখন তাদের শেখার আগ্রহ ও সৃজনশীলতা কতটুকু টিকে থাকবে তা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সকলের মনে।
চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার তিন বছরের বেশি সময় পেরিয়েছে। বিশ্বজুড়ে জেনারেটিভ এআইয়ের এক বিশাল জোয়ার তৈরি করেছে অ্যাপটি। ওপেনএআইয়ের দেখানো পথে হেঁটে পরবর্তীতে জেমিনাই, কোপাইলট ও অ্যালেক্সা প্লাস-এর মতো একঝাঁক নতুন এআই অ্যাসিস্ট্যান্টের আবির্ভাব ঘটেছে।
তবে, এসবের পাশাপাশি এআইয়ের প্রাইভেসি লঙ্ঘন, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্য দেওয়া, চাটুকারিতা ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ উসকে দেওয়ার মতো নানা বিষয়ও এখন সবারই জানা।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ বা এমআইটি’র গবেষণাপত্র এক বড় প্রশ্ন তুলেছিল, চ্যাটজিপিটি কি মানুষকে নির্বোধ বানিয়ে দিচ্ছে? গবেষণাপত্রটিতে ‘কগনিটিভ ডেট’ বা ‘মানসিক ঋণ’ নামের এক ধারণার কথা বলা হয়েছে, যা অ্যাপটি ব্যবহারের কারণে তৈরি হচ্ছে মানুষের।
এমআইটি’র বিশেষজ্ঞরা তিনটি দলকে একটি প্রবন্ধ বা রচনা লেখার কাজ দিয়েছিলেন। প্রথম দলটি কেবল নিজেদের মেধা ব্যবহার করে লিখেছে। বাকি দুটি দলের মধ্যে একটি দল ইন্টারনেট সার্চ ও অন্য দলটি চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেছে। মস্তিষ্ক কতটুকু সক্রিয় তা বোঝার জন্য ‘ইইজি’ প্রযুক্তির মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের স্নায়বিক সংযোগ পরীক্ষা করেছেন তারা।
ফলাফলে উঠে এসেছে, যারা চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেছে তাদের মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগ ছিল সবচেয়ে কম, যা নিম্নমানের চিন্তা করার ক্ষমতার লক্ষণ ও এর সঙ্গে দুর্বল স্মৃতিশক্তিরও যোগসূত্র রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, “অংশগ্রহণকারীদের টানা চার মাস পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, যারা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএম ব্যবহার করেছেন তারা স্নায়বিক, ভাষাগত ও আচরণগত সব ক্ষেত্রেই অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন।”
গবেষকদের মতে, এআই ব্যবহারের জন্য আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক মাশুল দিতে হচ্ছে। বিষয়টি কেবল একটি গবেষণার ফলাফল নয়, বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও তথ্য সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
‘মেডিকেল রিসার্চ আর্কাইভ’-এ প্রকাশিত এক গবেষণার সিদ্ধান্ত অনুসারে, চ্যাটজিপিটির মতো এআই টুলের ওপর ‘অতিরিক্ত নির্ভরতা’ মানুষের প্রয়োজনীয় চিন্তাশক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা কমিয়ে দিতে পারে। মানুষের প্রাকৃতিক মেধা ধরে রাখতে হলে প্রচেষ্টা ও মেশিন ব্যবহারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
‘বয়েজি স্টেট ইউনিভার্সিটি’র কগনিটিভ সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ব্রায়ান ডব্লিউ স্টোন লিখেছেন, “শেখা, মনে রাখা এবং মস্তিষ্কের স্নায়বিক বিভিন্ন সংযোগ শক্তিশালী করার জন্য সংগ্রাম, বাধা ও মানসিক পরিশ্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
জীবনকে সহজ করার প্রবণতাই মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতার বিরুদ্ধে কাজ করছে। তবে এ ক্ষতি সবার ক্ষেত্রে সমান নয়।
বাড়তি সুবিধা থেকে অতি-নির্ভরশীলতা
ভাষা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে ভারতের দিল্লিতে কাজ করছেন ২৮ বছর বয়সী একজন পিএইচডি গবেষক। তিনি বলেছেন, “মাঝেমধ্যে আমার মনে হয় এআই ছাড়া আমি প্রায় পঙ্গু। আমার সৃজনশীলতার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি আমি।”
ভারতের শীর্ষস্থানীয় এক ইউনিভার্সিটিতে নিজের থিসিস উপস্থাপনের আগে এ গবেষক বলেছেন, চ্যাটজিপিটির মতো বিভিন্ন এআই টুল তার কাজের চাপ, বিশেষ করে অভিজ্ঞতা বা গবেষণার তথ্য সামলানোর কাজ প্রায় ৬০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।
চ্যাটজিপিটি আসলে তার শেখার বা তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলেননি তিনি। তবে অ্যাপটি ব্যবহারের চরম সহজলভ্যতা ও এর বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার তাকে চ্যাটজিপিটির ওপর ‘পুরোপুরি নির্ভরশীল’ করে তুলেছে।
একাডেমিক আইডির মাধ্যমে বিভিন্ন এআই টুলের পেইড সংস্করণ ফ্রিতে ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ায় এগুলো ব্যবহারে আরও বেশি উৎসাহিত হয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে অন্য একজন শিক্ষার্থী বলেছেন, তাদের ক্লাসের ‘সবাই’ অ্যাসাইনমেন্টের জন্য চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চ্যাটজিপিটি দিয়ে তৈরি লেখা গ্রহণ হবে না বলে নোটিশ টাঙাতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সমাজকর্ম বিষয়ে মাস্টার্স করা ওই শিক্ষার্থী বলেছেন, “আমি একবার চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেছিলাম। এপরপর এখন অ্যাপটি ছাড়া কাজ করা আমার জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।”
অবশ্য ‘ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটি’র এক গবেষণায় বলা হয়েছে, চ্যাটজিপিটি ও জেমিনাইয়ের মতো এআই বট ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল বা পড়াশোনায় মনোযোগের ক্ষেত্রে কোনো ‘উল্লেখযোগ্য প্রভাব’ দেখা যায়নি।
তবে, গবেষণাটি শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়ায় এসব চ্যাটবট ব্যবহারের ভিন্ন ও ক্ষতিকর দিক তুলে ধরেছে, যেমন তথ্য খোঁজা ও কোনো বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য এআই বটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শিক্ষার্থীদেরকে তাদের শিক্ষকদের শেখানো মূল পাঠ্যক্রম থেকে বিচ্যুত বা অন্যমনস্ক করে তুলছে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, পারস্পরিক আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, একজন অভিজ্ঞ শিক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া সাধারণ ধারণা, ব্যক্তিগত মতামত, দিকনির্দেশনা ও ব্যাখ্যা চ্যাটবটের সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ আলোচনার তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর ও সেরা।