Published : 10 Jul 2026, 09:02 AM
ছোটবেলায় তিনি উইংয়েও খেলেছেন। এক ম্যাচে তো আছে ৬ গোল করার গল্প! কিন্তু পেদ্রো পররো এখন স্পেনের রক্ষণের নির্ভরতার নাম। কদিন আগেও, বলতে গেলে যিনি ছিলেন আড়ালে। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে, ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ২৬ বছর বয়সী এই রাইট-ব্যাক উঠে এসেছেন পাদপ্রদীপের আলোয়।
এবার, বিশ্বকাপ অভিযানে প্রথম পাঁচ ম্যাচে এখনও স্পেন গোল হজম করেনি একটিও। দৃঢ় রক্ষণে পেদ্রো সামনের দিকের সারথি। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেস্তে দেওয়া মূল দায়িত্ব হলেও, গোল করতে জানেন পররো। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে শেষ বত্রিশের ম্যাচে স্পেনের ৩-০ ব্যবধানের জয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেছিলেন তিনি। ওই ম্যাচে ‘লা রোজা’দের হয়ে ব্যক্তিগত গোলের খাতাও খোলে পররোর।
অথচ, এই বিশ্বকাপের আগে পররো ছিলেন না খুব একটা আলোচনায়। রাইট-ব্যাক পজিশনে এতদিন দানি কারভাহালের সরব উপস্থিতির কারণে, তিনি ছিলেন আড়ালে। বিশ্বকাপ দলে ৩৪ বছর বয়সী কারভাহাল জায়গা না পাওয়ায়, লুইস দে লা ফুয়েন্তে আস্থা রাখেন পররোর কাঁধে, তুলে দেন ১২ নম্বর জার্সি। এক্সত্রেমাদুরের ছোট শহর দন বেনিতো থেকে উঠে আসা পররোর ফুটবলে শুরুটাও এখান থেকে।
মাত্র ৪০ হাজার মানুষের বসতি দন বেনিতোয়। স্থানীয় কোচ কার্লোস মরেনোর স্মৃতিতে পররোর শৈশব-কৈশর উঠে এলো দারুণভাবে। ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসার টান এতটাই ছিল যে, অনুশীলন না থাকলেও চলে আসতেন মাঠে!
“যদি অনুশীলন নাও থাকত, সে সবসময় মাঠে চলে আসত। ঘন্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাত। অনেক সময়, অন্য দলের কোচদের কাছে সে জিজ্ঞেস করত, তাদের দলের হয়ে খেলতে পারবে কিনা।”
পরিবারের অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। মা ইভা সুপারমার্কেটে কাজ করতেন। বাবা লুইস অনেকটা ছিলেন ‘সব কাজের কাজী’ টাইপের। কৈশরের অনেকটা সময় তার কেটেছে নানা আন্তোনিওর কাছে। তার নানা সবসময় সঙ্গে আসতেন- অনুশীলনে ও ম্যাচে- ঠাণ্ডা, গরম বা বৃষ্টিতে, সবসময়।”
কোনো ম্যাচে পররো যখন গোল পেতেন, নানা তাকে মিষ্টি খাওয়াতেন। গোল নিয়েও মজার স্মৃতি ঘটনা আছে তার। ৭-৬ গোলে হেরে যাওয়া এক ম্যাচের গল্প পেড়ে বসলেন মরেনো।
“যে দিকটি অন্যদের চেয়ে তাকে বাকিদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল, সেটা হচ্ছে তার জয়ী মানসিকতা, লড়াকু মনোভাব। কখনও কখনও সে অভিযোগ করত, তর্কে জড়াত; কেননা, সে নিজে যতটা মাঠে দিত, সতীর্থদের কাছ থেকেও ততটাই চাইত।”
মরেনো জানালেন, এক ম্যাচে ছয় গোল করেছিল পররো, তবুও ম্যাচ ৭-৬ ব্যবধানে হেরে যাওয়ায় রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাড়ি ফিরেছিল সে।
জিমনাস্টিকো দন বেনিতো, রায়ো ভাইয়েকানোর যুব দল ঘুরে, একটা সময় পররোর পা পড়ে জিরোনার সিনিয়র দলে। প্রথম তিনি গোল পেলেন রেয়াল মাদ্রিদের জালে। ২০১৯ সালের কোপা দেল রের ম্যাচে। ২০১৮-১৯ মৌসুমে জিরোনার হয়ে লা লিগায় ৩২ ম্যাচ খেলেছিলেন, এর মধ্যে তিনি ২৫টিতেই ছিলেন শুরুর একাদশে।

এরপর, পররো যোগ দিলেন ম্যানচেস্টার সিটিতে, কিন্তু ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দলটিতে থিতু হতে পারলেন না সেভাবে। ধারে খেলে বেড়ানোর ‘ক্লান্তি’ তার দূর হলো ২০২২ সালে, স্পোর্তিং সিপিতে পাকাপাকি চুক্তি করে। এই দলেও অবশ্য আগে ধারে খেলেছিলেন তিনি।
সেখানেও অবশ্য স্থায়ী হতে পারেননি, পরের বছর পররো ধারে খেলতে যান টটেনহ্যাম হটস্পার্সে। শেষ পর্যন্ত, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের এই দলে ২০২৩ সালে স্থায়ী হলেন তিনি। স্পার্সের হয়ে প্রিমিয়ার লিগে এখন পর্যন্ত খেলে ফেলেছেন ১১৭টি ম্যাচ, ৯টি গোলও করেছেন, দলটির ২০২৫ ইউরোপা লিগ জয়েও রাখেন দারুণ অবদান।
ইতোমধ্যে স্পেনের হয়ে বয়সভিত্তিক দলে তার খেলা হয়ে যায়। ২০২১ সালে জর্জিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে জাতীয় দলে হয়ে অভিষেক। বিশ্বকাপে দলের দুয়ার খোলে গত মে মাসে, দে লা ফুয়েন্তের ডাকে।
সর্বোচ্চ মঞ্চে প্রথম ম্যাচ বেঞ্চে কাটানোর পর, সৌদি আরবের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপের আঙিনায় প্রথম পা পড়ে তার। ওই ম্যাচে ৪-০ গোলের জয়ের আনন্দ সঙ্গী হয় পররোর।
এরপর, এক ম্যাচ বিরতি দিয়ে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোয় আবার তিনি খেলেন শুরুর একাদশে। জাতীয় দলের হয়ে প্রথম গোলের দেখাও তিনি পেয়ে যান সেদিন।
রক্ষণ আগলে রাখার মূল কাজটি তিনি শুরু থেকেই করে চলেছেন সুচারুভাবে। শিরোপা পুনরুদ্ধারের অভিযানে আসা স্পেনের কোনো গোল হজম না করাটা দেখাচ্ছে, লাপোর্ত, কুবার্সি, কুকুরেইয়াদের সাথে তিনি ঠিকই চলছেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। তাতে আড়াল থেকে উঠে আসছেন পাদপ্রদীপের আলোয়।