Published : 02 Oct 2025, 03:35 PM
প্রথমবারের মতো মানুষের ত্বকের কোষ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে সেটিকে শুক্রাণুর সঙ্গে নিষিক্ত করানোর মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ের মানব ভ্রূণ তৈরির দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা।
এ পদ্ধতির মাধ্যমে বয়স বা রোগজনিত বন্ধ্যাত্বের সমস্যাও দূর করা যেতে পারে। কারণ এ পদ্ধতিটি শরীরের প্রায় যে কোনো কোষকে জীবনের সূচনা বিন্দু হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে, যেটিকে কাজে লাগিয়ে সমলিঙ্গ দম্পতিদেরও নিজেদের জিনগত বৈশিষ্ট্যওয়ালা সন্তান পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
তবে পদ্ধতিটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং তা ব্যবহার উপযোগী করতে আরও গবেষণা ও পরিমার্জনের প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পদ্ধতি বাস্তব চিকিৎসায় ব্যবহারের উপযোগী হতে এক দশক পর্যন্ত লাগতে পারে। আর যথাযথ অনুমোদনের আগে কোনো বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা কেন্দ্র এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে না।
মানব জীববিজ্ঞানে এক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে এ পদ্ধতির প্রশংসা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা বলেছেন, বিজ্ঞানের মাধ্যমে যা সম্ভব হচ্ছে, তা নিয়ে জনসাধারণের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা হওয়াও জরুরি।
এক সময় প্রজননের গল্পটি ছিল একেবারে সরল এক প্রক্রিয়া, যেখানে পুরুষের শুক্রাণু নারীর ডিম্বাণুর সঙ্গে মিলিত হয়ে তা থেকে ভ্রূণ গঠিত হয় এবং নয় মাস পর জন্ম হয় একটি শিশুর।
এখন প্রজননের সেই পরিচিত নিয়মগুলোই পরিবর্তন করছেন বিজ্ঞানীরা। এ নতুন পরীক্ষাটি শুরু হয় মানুষের ত্বকের কোষ থেকে, যা আগের ধারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
গবেষণাটি করেছে ‘ওরিগন হেলথ অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি’র একদল গবেষক। তাদের পদ্ধতিতে ত্বকের একটি কোষ থেকে নিউক্লিয়াস, যেখানে পুরো শরীর গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনগত কোডের একটি সম্পূর্ণ কপি থাকে, তা বের করে এনেছে গবেষণা দলটি।

এখন পর্যন্ত এ পদ্ধতিটি ১৯৯৬ সালে জন্ম নেওয়া ‘ডলি’ নামের এক মেষশাবককে ক্লোন করার জন্য ব্যবহৃত পদ্ধতির মতোই, যেটি ছিল বিশ্বের প্রথম ক্লোন করা স্তন্যপায়ী।
তবে এ ডিম্বাণুকে এখনই শুক্রাণুর সঙ্গে নিষিক্ত করা সম্ভব নয়। কারণ এতে এরইমধ্যে সম্পূর্ণ ক্রোমোজোমের সংখ্যা বা জিনগত তথ্য রয়েছে। সাধারণত একটি ডিম্বাণুতে মাত্র অর্ধেক ক্রোমোজোম থাকে যাতে যখন শুক্রাণু ডিম্বাণুর সঙ্গে মিলিত হয় তখন পুরো ক্রোমোজোমের সংখ্যা পূরণ হয়।
মানুষ সাধারণত তার মা-বাবার কাছ থেকে ২৩টি করে ক্রোমোজোম পেয়ে থাকেন, যা মোট মিলে ৪৬টি ক্রোমোজোম হয়। আর এ ডিম্বাণুতে সেই পুরো ৪৬টি ক্রোমোজোম আগে থেকেই রয়েছে।
ফলে পরবর্তী ধাপে ডিম্বাণুটির তার ক্রোমোজোমের অর্ধেক অংশ ফেলে দিতে হবে, আর এ প্রক্রিয়াটিকে গবেষকরা বলছেন ‘মাইটোমিওসিস’, যা মাইটোসিস ও মিওসিস নামের দুটি কোষ বিভাজন পদ্ধতির মিলিত শব্দ।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার কমিউনিকেশন্স’-এ। গবেষণায় উঠে এসেছে, মানুষের ত্বকের কোষের ডিএনএ থেকে মোট ৮২টি কার্যকরী ডিম্বাণু তৈরি হয়েছে। এসব ডিম্বাণুকে শুক্রাণুর সঙ্গে নিষিক্ত করা হলে কিছু ডিম্বাণু প্রাথমিক ভ্রূণ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছায়। তবে কোনোটিই ছয় দিনের বেশি বেঁচে থাকতে পারেনি।
‘ওরিগন হেলথ অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি’র এমব্রায়নিক সেল ও জিন থেরাপি কেন্দ্ৰের পরিচালক অধ্যাপক শৌখরাত মিতালিপোভ বলেছেন, “আমরা এমন এক সাফল্য অর্জন করেছি, যা আগে অসম্ভব বলে ধরা হত।”
এ পদ্ধতিটি এখনও পুরোপুরি ব্যবহার উপযোগী নয়। কারণ এখানে ডিম্বাণুটি এলোমেলোভাবে সিদ্ধান্ত নেবে যে, কোন কোন ক্রোমোজোম ছেড়ে দেবে। ডিম্বাণুটিতে ২৩ ধরনের প্রতিটি ক্রোমোজোমের একটি করে থাকতে হবে, যাতে রোগ প্রতিরোধ সম্ভব হয়। কিন্তু এখানে দেখা গেছে, অনেক সময় কিছু ক্রোমোজোমের দুটোই থাকে আবার কিছুর একটিও থাকে না।
এ ছাড়াও, এ পদ্ধতির সাফল্যের হার খুবই কম, কেবল ৯ শতাংশ এবং এসব ক্রোমোজোম ‘ক্রসিং ওভার’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করতে পারে না। ‘ক্রসিং অভার’ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ক্রোমোজোম নিজেদের ডিএনএ-এর কিছু অংশ একে অপরের সঙ্গে বিনিময় করে, যা জিনগত বৈচিত্র্য ও সঠিক জিনগত তথ্যের জন্য জরুরি।
অধ্যাপক মিতালিপোভ বলেছেন, “আমাদের এ প্রযুক্তি নিখুঁত করতে হবে। তবে আমার ধারণা, এটিই হবে ভবিষ্যতের পথ। কারণ বর্তমানে অনেক মানুষ সন্তান লাভে অক্ষম হয়ে পড়ছেন।”
এ পদ্ধতি এমন এক ক্ষেত্রের অংশ, যার লক্ষ্য মানুষের দেহের বাইরে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করা, যাকে ‘ইন ভিট্রো গ্যামেটোজেনেসিস’ বলা হয়। এর মাধ্যমে বন্ধ্যাত্ব সমস্যার নতুন সমাধান সম্ভব হতে পারে।
বয়স্ক নারীদেরও সন্তান লাভে সাহায্য করতে পারে এ পদ্ধতি, বিশেষ করে যাদের দেহে আর কার্যকর ডিম্বাণু না থাকার কারণে টেস্ট টিউব শিশুর জন্ম দিতে পারেন না। আবার, এমন পুরুষদের বেলাতেও এ পদ্ধতি সাহায্য করতে পারে, যাদের দেহ পর্যাপ্ত শুক্রাণু তৈরি করতে পারেন না, এমনকি যাদের ক্যান্সার চিকিৎসার ফলে বন্ধ্যাত্ব হয়েছে তাদেরকেও সাহায্য করবে পারে এ পদ্ধতি।