Published : 23 May 2026, 10:45 AM
অটোকারেক্ট ঝামেলা পাকিয়েছে মানুষের সঠিক বানান লেখার ক্ষমতায়, জিপিএস মানুষের দিকনির্ণয় ক্ষমতায় প্রভাব ফেলেছে। আর এখন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের চিন্তাশক্তি, স্মৃতি ও সৃজনশীলতাকেও দুর্বল করে দিতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।
বিবিসি’র প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চ্যাটজিপিটির মতো এআই টুল নিয়মিত ব্যবহার করলে মানুষের মনোযোগ, সূক্ষ্ণ চিন্তার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি ও সৃজনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে, গবেষকেরা একইসঙ্গে বলছেন, বিষয়টি এখনও একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণার মধ্যে রয়েছে।
আত্মকথন রীতিতে লেখা ওই তিবেদনটির লেখক বলছেন, প্রযুক্তি সাংবাদিকতার কারণে তিনি নিজেও সচেতনভাবে এআই ব্যবহার শুরু করেছিলেন। কিন্তু গত এক বছরে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা তাকে ভাবতে বাধ্য করেছে, এভাবে কি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্ক?
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির ‘ল্যাবরেটরি ফর রিলেশনাল কগনিশন’-এর পরিচালক ও স্নায়ুবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যাডাম গ্রিন বলেন, “সার্বিকভাবে দেখলে, উত্তরটি হ্যাঁ।”
তার ভাষায়, “এআই এখন এমন কাজ করছে, যেগুলোর জন্য আগে মানসিক শ্রম দরকার পড়ত। আপনি যদি নিজের চিন্তাশক্তি কম ব্যবহার করেন, তাহলে সেই ধরনের চিন্তার সক্ষমতাও ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে।”
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চাইলেও এখন এআই এড়িয়ে চলা কঠিন। গুগল সার্চের ওপরে এআই উত্তর দেখানো হচ্ছে, আবার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো স্মার্টফোনেও আরও বেশি এআই জুড়ে দিচ্ছে।
তবে টেক্সাস ইউনিভার্সিটি অ্যাট অস্টিনের ‘ডেল মেডিক্যাল স্কুল’-এর ক্লিনিকাল নিউরোসাইকোলজিস্ট জ্যারেড বেঞ্জ মনে করেন, এআই ব্যবহার করলেই তা ক্ষতিকর হবে, এমন নয়।
তিনি বলেন, “আমাদের মস্তিষ্ক আগেও নানা প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। তাহলে এআইকে আলাদা করে কেন ভাবছি?”
তার মতে, “টুলটি নিজে ভালো বা খারাপ নয়।”
গবেষকরা বলছেন, প্রযুক্তির প্রভাব নির্ভর করে সেটি মানুষ কীভাবে ব্যবহার করছে তার ওপর। তবে, উদ্বেগের জায়গা যথেষ্ট গুরুতর হওয়ায় এখনই এআই ব্যবহারের ধরন নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দুই দশক আগে ‘ডিজিটাল ডিমেনশিয়া’ ধারণা সামনে আসে। তখন বলা হয়েছিল, প্রযুক্তির ওপর অতিনির্ভরতা মানুষের স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিশক্তি দুর্বল করে দিতে পারে।
তবে বেঞ্জ ও তার সহলেখকের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে ৪ লাখ ১১ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে করা ৫৭টি গবেষণা পর্যালোচনা করে ডিজিটাল ডিমেনশিয়ার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং প্রযুক্তি ব্যবহারে মানসিক সক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি কমতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।
তারপরও উদ্বেগ পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না গবেষকেরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, জিপিএসের ওপর নির্ভরশীল মানুষ নিজের মনে আশপাশের এলাকার মানচিত্র তৈরি করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে হারাচ্ছেন। একইভাবে সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহারের কারণে মানুষ তথ্য কম মনে রাখছেন, কারণ তথ্য খুঁজে পেতে তাদের খুব বেশি মানসিক পরিশ্রম করতে হচ্ছে না।
গ্রিন বলেন, “এআই প্রথমবারের মতো আমাদের এমন সুযোগ দিচ্ছে, যেখানে প্রক্রিয়ার বদলে শুধু ফলাফল পেতে চাইছি।”
তার মতে, প্রবন্ধ আরও সুন্দর হতে পারে, উপস্থাপনাও আরও ঝকঝকে হতে পারে। কিন্তু ভুল করা, আটকে যাওয়া, চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং হঠাৎ করে কোনো বিষয় বুঝে ফেলার যে মানসিক প্রক্রিয়া, সেটিই আসলে মস্তিষ্কের জন্য প্রয়োজনীয় অনুশীলন।
তিনি বলেন, “এটা যেন জিমে গিয়ে আপনার বদলে রোবটকে দিয়ে ভার তোলানোর মতো। এতে আপনি কিছুই পাচ্ছেন না।”
গবেষকেরা তাই এআইয়ের উত্তরের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর না করার পরামর্শ দিচ্ছেন।
কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক হ্যাঙ্ক লি বলেন, “যদি ব্যবহারকারীর নিজেরই বোঝার ক্ষমতা না থাকে যে উত্তরটি ঠিক কি না, সেটাই বিপদের কথা।”
তার পরামর্শ, কোনো বিষয়ে আগে নিজে একটি ধারণা তৈরি করতে হবে। এরপর এআই ব্যবহার করে নিজের চিন্তাকে যাচাই করা যেতে পারে। এতে এআই চিন্তার বিকল্প না হয়ে চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করবে।
গবেষকরা আরও বলছেন, তথ্য মনে রাখতে চাইলে এআইয়ের উত্তর ধীরে ও মনোযোগ দিয়ে পড়া দরকার। নোট নেওয়া, প্রশ্নোত্তর তৈরি করা বা ফ্ল্যাশকার্ড বানানোর মতো কাজ স্মৃতিকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে।
সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সৃজনশীল কাজে এআই ব্যবহারকারীদের ধারণা তুলনামূলকভাবে কম মৌলিক ও বেশি অনুমাননির্ভর হয়ে থাকে।
গ্রিন বলেন, “আমরা আশঙ্কা করছি, মানুষ তার সৃজনশীল হওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছে।”
তার মতে, মানুষের মস্তিষ্ক অপ্রত্যাশিত সংযোগ তৈরি করে নতুন ধারণা বের করে। কিন্তু সেই কাজ যদি এআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে মস্তিষ্কের ওই দরকারি অনুশীলনটি আর হয় না।
গবেষকরা তাই প্রথমে নিজের চিন্তাগুলো কাগজে লিখে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন, তা যত অপরিণতই হোক না কেন। এরপর সেই ধারণাকে উন্নত করতে এআই ব্যবহার করা যেতে পারে।
মনোযোগ নিয়েও সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের মনোযোগ কমিয়ে দিচ্ছে, আর এআই এ সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তাই ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। দীর্ঘ লেখা নিজে পড়ে শেষ করা, কঠিন সমস্যার সমাধান নিজে ভাবা এবং কিছুটা অস্বস্তি সহ্য করার মধ্য দিয়েই গভীর চিন্তার ক্ষমতা তৈরি হয় বলে মত তাদের।
সবশেষে গ্রিন বলেন, মানুষের মস্তিষ্কের বিশেষত্ব এখনও এআইয়ের নাগালের বাইরে।
তার ভাষায়, “মানুষ এমন সংযোগ তৈরি করতে পারে, যা ব্যক্তিগত, অপ্রত্যাশিত এবং সত্যিকার অর্থেই নতুন। ডিজিটাল সম্ভাবনানির্ভর যন্ত্র সেটি অনুকরণ করতে পারে না।”
বেঞ্জও মনে করিয়ে দেন, মানুষ সব সময়ই প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।
তিনি বলেন, “গাড়ি এসেছে বলে কি মানুষ দৌড়ানো ভুলে গেছে? না। মানুষ এখনও দৌড়ায়, কারণ তারা চায়।”