Published : 14 Aug 2025, 03:15 PM
চীনে রপ্তানি করা কিছু নির্দিষ্ট মডেলের চিপ থেকে যত আয় হবে তার একটা অংশ ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে দেবে’ বলে এক রফায় রাজি হয়েছে মার্কিন বড় দুটি চিপ কোম্পানি এনভিডিয়া ও অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেস বা এএমডি।
সোমবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে হোয়াইট হাউস। এরইমধ্যে এ সিদ্ধান্ত ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছে। এতে কি এসব চিপ নির্মাতা কোম্পানির ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে? ভবিষ্যতে মার্কিন সরকার কি একই ধরনের চুক্তি অন্য কোম্পানির সঙ্গেও করতে চাইবে?
ব্রিটিশ দৈনিক ফাইনান্সিয়াল টাইমস প্রতিবেদনে লিখেছে, চিপ বিক্রির আয়ের ১৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে দেবে এনভিডিয়া ও এএমডি। এর বদলে, চীনে নিজেদের শক্তিশালী ‘এইচ২০’ ও ‘এমআই৩০৮’ নামের চিপ বিক্রির অনুমতি বা লাইসেন্স পাবে কোম্পানি দুটি।
এক বিবৃতিতে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি’কে এনভিডিয়া বলেছে, “আমরা বিশ্ববাজারে অংশগ্রহণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলি। গত কয়েক মাস ধরে চীনে এইচ২০ চিপ সরবরাহ না করলেও আমরা আশাবাদী, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের নিয়ম এমন হবে যাতে চীন ও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে আমেরিকা।
“আমেরিকা ফাইভজি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যেমন নেতৃত্ব হারিয়েছিল সেটি যেন আবার না হয়। আমরা যদি প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকি তবে আমেরিকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিই বিশ্বমানের হতে পারে।”
অন্যদিকে এক বিবৃতিতে এএমডি বলেছে, নিজেদের ‘এমআই৩০৮’ নামের চিপ চীনে রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে অনুমতির আবেদন করেছিল তারা। সম্মতি মিলেছে সেই আবেদনে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের তৈরি এ ব্যবস্থা ‘অস্বাভাবিক’ হলেও তা বর্তমান হোয়াইট হাউস নেতার ‘আর্ট অফ ডিল’কেই তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপকে সার্বিবভাবে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন বিনিয়োগকারীরা। কারণ, এর ফলে আবারও চীনা বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছে এনভিডিয়া ও এএমডি।
এনভিডিয়া ও এএমডি’র এ বোঝাপড়ার মানে কী?
এনভিডিয়ার ‘এইচ২০’ মডেলের চিপটি বিশেষভাবে চীনে রপ্তানির জন্যই তৈরি হয়েছিল, যেন তা যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি বাধ্যবাধকতা মেনে চলে। আগে এ চিপটি রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও গত মাসে এনভিডিয়া বলেছে, চীনে এ চিপ পাঠানোর জন্য শিগগিরই লাইসেন্স পাচ্ছে তারা।
এ ছাড়া, জুলাইয়ে এএমডি বলেছিল, তারাও আবার চীনে নিজেদের ‘এমআই৩০৮’ মডেলের চিপ বেচতে শুরু করবে।
তবে সেই সময়ে, চীনে চিপ বিক্রি পুনরায় শুরুর সঙ্গে কোনো শর্ত বা আয়ের অংশ তুলে দেওয়ার কথা ছিল না। বাজারও সিদ্ধান্তটিকে খুবই ইতিবাচকভাবে নিয়েছিল। কারণ, এতে চীনে কোটি কোটি ডলারের সম্ভাব্য ব্যবসা আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
এদিকে, উভয় কোম্পানির শেয়ারের দাম সোমবার সামান্য কমেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে সিএনবিসি।
‘কুইলটার চেভিওট’-এর গ্লোবাল প্রযুক্তি বিশ্লেষক বেন বারিঞ্জার বলেছেন, “একজন বিনিয়োগকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এখনও মোটের উপর ইতিবাচক বিষয়, বিশেষ করে আয় যদি ৮৫ শতাংশ হয় তবে সেটি অবশ্যই শূন্যের চেয়ে তো ভালো।
“এখানে প্রশ্নটা হচ্ছে এনভিডিয়া ও এএমডি কি ওই শুল্কের কারণে নিজেদের দাম ১৫ শতাংশ বাড়াবে কি না। তবে শেষ পর্যন্ত ভালো দিক হল, তারা অন্তত চীনের বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারছে, যেখানে পুরো বাজারটা হুয়াওয়ের হাতে তুলে দেওয়ার চেয়ে এটি অনেক ভালো পদক্ষেপ।”
হুয়াওয়ে হচ্ছে এনভিডিয়া ও এএমডি’র সবচেয়ে কাছের চীনা প্রতিদ্বন্দ্বী। বলা চলে, এনভিডিয়ার ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে আহত এই চীনা সিংহ।
তবে দীর্ঘমেয়াদে দুই মার্কিন কোম্পানির জন্যই অনিশ্চয়তা এখনও রয়ে গিয়েছে।
‘এশিয়া গ্রুপ’-এর পার্টনার ও ডিজিটাল প্র্যাকটিসের কো-চেয়ার জর্জ চেন বলেছেন, “স্বল্পমেয়াদে এই চুক্তি দুটি কোম্পানিকেই চীনে চিপ রপ্তানি নিয়ে কিছুটা নিশ্চয়তা দিচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে, যদি তাদের চীনে বিক্রি ক্রমাগত বাড়তেই থাকে তাহলে প্রশ্ন হল, মার্কিন সরকার চীনভিত্তিক ব্যবসা থেকে আরও বড় অংশ নিতে চাইবে কি না।”
ট্রাম্পের এ ধরনের চুক্তি অন্য কোম্পানির সঙ্গে করার সম্ভাবনা কম
একাধিক বিশ্লেষক সিএনবিসিকে বলেছেন, এ চুক্তি ‘অস্বাভাবিক’ হলেও ট্রাম্পের জন্য এমন কিছু ‘প্রায় স্বাভাবিক বিষয়ই’।
বারিঞ্জার বলেছেন, “ভালো অগ্রগতি হলেও কিছুটা অদ্ভুত এবং ঠিক এ ধরনের চুক্তিই আপনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছ থেকে আশা করতে পারেন। কারণ, তিনি মূলত একজন চুক্তিপ্রিয় ব্যক্তি। তিনি ছাড় দিতেও রাজি, তবে কেবল তখনই যখন তার বিনিময়ে তিনি কিছু পান। আর তার এমন বিষয় অবশ্যই এক ধরনের অস্বাভাবিক নজির স্থাপন করেছে।”
‘কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ’-এর পার্টনার নিল শাহ বলেছেন, আয়ের কাটছাঁট বা কমতি আসলে এক ধরনের ‘পরোক্ষ শুল্ক’ বা করের মতো কাজ করছে, যেটি ‘পণ্যের উৎসেই’ বসানো হচ্ছে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে ‘ফিউচুরাম গ্রুপ’-এর সিইও দ্যানিয়েল নিউম্যান বলেছেন, ট্রাম্পের এ পদক্ষেপকে চীনে ব্যবসা করার জন্য এক ধরনের ‘কর বা ট্যাক্স’ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

কিন্তু অন্য কোম্পানির সঙ্গে ট্রাম্পের এমন চুক্তি করার সম্ভাবনা কম।
‘ফিউচুরাম গ্রুপ’-এর এআই প্র্যাকটিস লিড নিক প্যাশেন্স বলেছেন, “আমার ধারণা, ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপ অন্যান্য ক্ষেত্র যেমন সফটওয়্যার ও সার্ভিসের মতো মার্কিন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতে প্রয়োগ করা হবে।”
সেমিকন্ডাক্টরকে একটি কৌশলগত প্রযুক্তি হিসেবে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স ও সামরিক কাজে ব্যবহৃত হয় এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের ভিত্তি চিপ। তাই ওয়াশিংটন চিপের ওপর এমন এক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়েছে, যা অন্য কোনো পণ্যের চেয়ে আলাদা ও কঠোর।
‘এশিয়া গ্রুপ’-এর চেন বলেছেন, “সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসা খুবই বিশেষ ধরনের এবং ট্রাম্পের এই ‘পে-টু-প্লে’ পদ্ধতিটি এনভিডিয়া ও এএমডির ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে। কারণ এখানে মূলত মার্কিন সরকারের রপ্তানি অনুমোদন পাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
“অ্যাপল ও মেটার মতো অন্যান্য ব্যবসার ক্ষেত্রে তাদের ব্যবসার ধরন এবং চীনের জন্য বিভিন্ন সেবা আরও জটিল হতে পারে “
চীন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে?
বর্তমানে অত্যন্ত সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে সেমিকন্ডাক্টর। গত দুই সপ্তাহে এনভিডিয়ার চিপের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চীন।
গত মাসের শেষ দিকে চীনের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ এনভিডিয়াকে অনুরোধ করেছিল, কোম্পানিটি যেন তাদের চিপ নিয়ে নিরাপত্তা দুর্বলতা ও ‘ব্যাকডোর’ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যগুলো ‘স্পষ্ট করে’।
তবে সেই সম্ভাবনাকে অস্বীকার করে উড়িয়ে দিয়ে এনভিডিয়া বলেছে, তাদের চিপে এমন কোনো ‘ব্যাকডোর’ নেই যা কারো জন্য চিপে প্রবেশাধিকার বা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ করে দিতে পারে।
রোববার আবারও যখন চীনের রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত এক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট এ ধরনের অভিযোগ করে তখনও তা অস্বীকার করেছে মার্কিন চিপ নির্মাতা কোম্পানিটি।
একজন বিশেষজ্ঞের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াশিংটনের এ কৌশলের তীব্র নিন্দা করেছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘গ্লোবাল টাইমস’।
গ্লোবাল টাইমসের লেখায় উল্লেখ রয়েছে, “এমন পদক্ষেপের মানে হচ্ছে, মার্কিন সরকার তাদের মূল নিরাপত্তা যুক্তি থেকে সরে এসেছে। কারণ প্রথমে তারা বলেছিল, চীনে চিপ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের পেছনে মূল কারণ নিরাপত্তা। এখন অর্থনৈতিক চাপ ও প্রভাব দেখিয়ে বিভিন্ন চিপ কোম্পানিকে চীনে রপ্তানির জন্য লাইসেন্স নিতে বাধ্য করছে তারা।”
তবে ট্রাম্পের এমন চুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনো মন্তব্য করেনি চীনা সরকার।
সিএনবিসি লিখেছে, ট্রাম্পের এনভিডিয়া ও এএমডি’র সঙ্গে চুক্তি চীনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে। একদিকে চীন এই চুক্তি নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকবে। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা আরও উন্নত করতে এসব চিপ পেতে চাইবে বিভিন্ন চীনা কোম্পানি।
‘কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ’-এর শাহ বলেছেন, “চীনের জন্য বিষয়টি জটিল এক ধাঁধা। কারণ নিজেদের এআই উন্নয়নের জন্য এসব চিপ দরকার চীনের। তবে মার্কিন সরকারের আরোপিত শুল্ক চিপের খরচ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্যাকডোর’ থাকার ভয় তো রয়েছেই তাদের মধ্যে।”