Published : 10 Sep 2025, 06:14 PM
যুক্তরাষ্ট্র যেখানে মানুষের লেভেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই তৈরি করতে গিয়ে নিজেদেরই তৈরি করা এক অর্থনৈতিক সংকটের দিকে মাথা গুঁজে ছুটছে ঠিক সে সময় ভিন্ন এক লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগোচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন।
গত সপ্তাহে চীনের রাষ্ট্রীয় কাউন্সিল তাদের দশ বছরের এক পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যার লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতির প্রতিটি খাতে এআইকে পুরোপুরিভাবে একীভূত করা।
‘এআইপ্লাস’ নামের উচ্চাভিলাষী এ পরিকল্পনায় বলা হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা হবে। উদ্যোগটির রূপান্তরকে বিশেষজ্ঞরা তুলনা করছেন ইন্টারনেট যুগের মাধ্যমে আসা আমূল পরিবর্তনের সঙ্গে।
সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রতিবেদনে লিখেছে, এরইমধ্যে দেশের বৃহৎ পরিসরের অবকাঠামোতে এআইয়ের বাস্তব ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে চীন। উৎপাদন খাত থেকে শুরু করে আবহাওয়া পূর্বাভাস ও চীনে তৈরি স্বচালিত টেসলা গাড়িতেও এআই ব্যবহৃত হচ্ছে।
দেখার বিষয় হচ্ছে পুরো বিষয়টি শেষ পর্যন্ত দেশটিতে কীভাবে এগোয় ও এ উদ্যোগ চীনের বাজারে কী প্রভাব ফেলে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, চীন যদি নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থও হয় তবুও সেই ব্যর্থতার ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক কম ক্ষতির হবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে প্রায় সবকিছুর জন্য এআইয়ের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে আছে, সেখানে চীনের প্রযুক্তি কোম্পানি যেমন ডিপসিক তুলনামূলকভাবে অনেক কম সম্পদ ব্যবহার করেও খেলার নিয়মটাই বদলে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট ফিউচারিজম।
এআই উন্নয়নে ২০২৪ সালে চীনের চেয়ে প্রায় বারো গুণ অর্থ ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবুও সাম্প্রতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, এআইয়ের মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র চীনের তুলনায় কেবল কয়েক মাস এগিয়ে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি বাস্তবভিত্তিক কিছু এআই সফটওয়্যার তৈরি করলেও তারা তা করে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর কিছু প্রযুক্তি কোম্পানির নজরদারির মধ্যেই। ফলে যেসব প্রযুক্তি সামনে আসে সেগুলোর বেশিরভাগই বিশাল সংখ্যক ভোক্তাকে টার্গেট করে তৈরি। যেমন– জেনারেটিভ মডেল, যা সাধারণত টেক্সট, ছবি বা ভিডিও তৈরি করতে পারে।
এর মানে হচ্ছে ইন্টারনেট ভরে যাচ্ছে অ্যালগরিদমনির্ভর নিম্নমানের কনটেন্টে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বিশাল এক এআই অবকাঠামো প্রকল্পে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করছে এ আশায় যে, দেশটিকে মানুষের মানের এআই তৈরির আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে এ প্রকল্প।
অন্যদিকে, চীনে এ ধরনের রাষ্ট্রীয় সহায়তা দেওয়া হয় মূলত সেইসব কোম্পানিকে, যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক দিক নিয়ে কাজ করছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রতিবেদনে আরও লিখেছে, এ বছরের শুরুতে প্রায় আটশ ৪০ কোটি ডলার মূল্যের এক এআই বিনিয়োগ তহবিল চালু করেছে চীনের কেন্দ্রীয় সরকার। এ তহবিলের লক্ষ্য, ব্যবহারিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এআই স্টার্টআপকে সহায়তা করা, যেটি স্থানীয় সরকার ও রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন ব্যাংকগুলোর পরিচালিত বিভিন্ন তহবিলের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হচ্ছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনের সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জুলিয়ান গেওয়ার্টজ বলেছেন, “গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এআই প্রয়োগকে ভবিষ্যতের কোনো তাত্ত্বিক বিষয় হিসেবে দেখে না চীন, বরং এখনই এআইয়ের সুবিধা নেওয়াকে একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে দেশটি।”
এ প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় চীনের ‘ভবিষ্যতের শহর’ হিসেবে পরিচিত শিওং’আনে। বেইজিংয়ের বাইরের হ্যবেই প্রদেশে অবস্থিত এ নতুন শহরটি সম্পূর্ণভাবে পরিকল্পিত এক শহর, যেটি শুরু থেকেই গড়ে তোলা হয়েছে ফাইভজি, এআই, অটোনমাস যানবাহন এবং পরিবেশবান্ধব শক্তির সমন্বয়ের ভিত্তিতে।
২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করা শহরটি এরইমধ্যে চীনা এআই কোম্পানি ডিপসিকের প্রযুক্তি প্রায় সব পর্যায়ে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। কৃষি পরিকল্পনা থেকে শুরু করে রোবট বারিস্তা, এমনকি স্থানীয় সরকারের হটলাইনে আসা কল বাছাই ও প্রাথমিক সাড়া দেওয়ার কাজেও এআই ব্যবহৃত হচ্ছে শহরটিতে।
গোটা বিশ্বে এআই নিয়ে যেভাবে উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছে, তা থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই। তবে চীনের এ আগ্রাসী উদ্যোগ সফল হবে কি না তা বলা কঠিন। কারণ দেশটির ইতিহাস থেকে ইঙ্গিত মেলে, নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় বড় পরিকল্পনায় চীনের সাফল্য মিশ্র অবস্থানে রয়েছে।