Published : 06 Jun 2026, 02:42 PM
কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের দুনিয়ায় বড় মাইলফলকের দাবি করেছে মার্কিন সফটওয়্যার জায়ান্ট মাইক্রোসফট। তাদের তৈরি নতুন কোয়ান্টাম চিপ আগের সংস্করণের তুলনায় প্রায় এক হাজার গুণ বেশি কার্যকর ও স্থিতিশীল বলে দাবি কোম্পানিটির।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মূল ভিত্তি ‘কিউবিট’। এগুলো বর্তমানের সাধারণ বিভিন্ন কম্পিউটারের পক্ষে অসম্ভব বা কঠিন এমন সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। তবে কিউবিটগুলো সংবেদনশীল ও ক্ষণস্থায়ী বা অস্থিতিশীল হওয়ার জন্য পরিচিত।
সংবেদনশীল কিউবিটগুলোকে দীর্ঘ সময় সচল রাখায় মাইক্রোসফটের এ বিস্ময়কর সাফল্য আগামী তিন বছরের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির পথকে প্রশস্ত করবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
মাইক্রোসফট বলেছে, তাদের তৈরি নতুন কোয়ান্টাম চিপ আগের সংস্করণের তুলনায় নির্ভরযোগ্য, যা আগামী তিন বছরের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে উপযোগী বিভিন্ন জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারে এমন কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির পথ সুগম করবে।
কোম্পানিটির দাবি, তাদের নতুন চিপ ‘মেজোরাঁ ২’র বিভিন্ন কিউবিট গড়ে ২০ সেকেন্ড পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, যেখানে তাদের আগের সংস্করণ ‘মেজোরাঁ ১’ কেবল কয়েক মিলিসেকেন্ড স্থায়ী হত। এর মানে, নতুন চিপটি আগের চেয়ে প্রায় ১ হাজার গুণ কার্যকর।
সক্ষমতার এ বড় উন্নতি বোঝাতে প্রযুক্তি জায়ান্টটি উদাহরণ দিয়ে বলেছে, চিপটি এমন, যেন প্রতিদিন চার্জ দেওয়া ফোনের বদলে এমন এক ফোন হাতে পাওয়া, যা কয়েক বছর পরপর চার্জ দিলেও চলে।
মাইক্রোসফটের কোয়ান্টাম বিভাগের কর্পোরেট ভাইস প্রেসিডেন্ট জুলফি আলম বলেছেন, “২০২৯ সালের মধ্যে আমাদের কাছে এমন এক কোয়ান্টাম মেশিন থাকবে, যা বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সমস্যার সমাধান করবে।”
তবে এ লক্ষ্য ছোঁয়ার জন্য প্রযুক্তি জগতে আরও বড় বড় অগ্রগতির প্রয়োজন হবে। কারণ, বাণিজ্যিকভাবে উপযোগী এমন ডিভাইস তৈরিতে লাখ লাখ কিউবিটের প্রয়োজন পড়বে, যেখানে জুলফি আলমের দেওয়া তথ্য অনুসারে মাইক্রোসফটের বর্তমান নতুন চিপটিতে কিউবিট রয়েছে কেবল ১২টি।
ব্যবসায়িক প্রাইভেসির দোহাই দিয়ে কোম্পানিটি তাদের এ আবিষ্কারের বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ না করায় মাইক্রোসফটের এমন দাবির সত্যতা যাচাই করা বেশ কঠিন।
তবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সনাতন বা সাধারণ কম্পিউটারের পক্ষেও যেসব বড় কাজ করা অসম্ভব, কোয়ান্টাম প্রযুক্তির মাধ্যমে সেগুলো অনায়াসে করে ফেলার অপার সম্ভাবনার কারণে বিশ্বজুড়ে এখন তা তৈরির এক তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে।
মাইক্রোসফট দীর্ঘ ২০ বছর ধরে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের বিশেষ এক পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে, যা ‘টপোলজিক্যাল’ পদ্ধতি নামে পরিচিত।
কোম্পানিটির এ কাজের মূল ভিত্তি প্রচলিত ‘কোয়াসি-পার্টিকেল’ বা ছদ্ম-কণার বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগানো। ১৯৩০-এর দশকে ইতালীয় পদার্থবিদ ইত্তোরে মেজোরাঁ প্রথম এ কণার অস্তিত্বের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তবে এতদিন তা কেবল কাগজে-কলমেই সীমিত ছিল।
এ অসম্ভবকে সম্ভব করতে বিজ্ঞানীদের পদার্থের সম্পূর্ণ নতুন এক অবস্থা তৈরি করতে হয়েছে, যা আমাদের পরিচিত কঠিন, তরল বা গ্যাসীয় অবস্থার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
‘ইউনিভার্সিটি অফ সারে’র পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক পল স্টিভেনসন বলেছেন, প্রযুক্তি জায়ান্টটির গবেষণার ফলাফল যদি তাদের দাবির সঙ্গে মিলে যায়, তবে তাদের বেঁধে দেওয়া এ সময়সীমাটি বেশ বাস্তবসম্মত বলেই মনে হবে।
“টেকসই টপোলজিক্যাল কিউবিট তৈরির লড়াইয়ে মাইক্রোসফট বেশ বড় লাফ দিতে পেরেছে বলেই মনে হচ্ছে। এতে সফল হলে কোয়ান্টাম কম্পিউটার না থাকা এক সাধারণ কোম্পানি থেকে মাইক্রোসফট এক ধাক্কায় পরবর্তী প্রজন্মের ত্রুটিহীন মেশিন তৈরির প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপুর্ণ নাম হিসেবে আবির্ভূত হবে।”
ভুল শুরু ও বিতর্ক
টপোলজিক্যাল কিউবিটের ওপর মাইক্রোসফটের এ অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়াটা বিভিন্ন সময়ে বেশ বিতর্ক তৈরি করেছে। ২০১৮ সালে ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র তারা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল, যেখানে কোম্পানিটি মেজোরাঁ কণার অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছিল।
তবে এ ধাক্কার পরও কোম্পানিটি তাদের গবেষণা চালিয়ে যায় এবং ২০২৫ সালে তাদের প্রথম ‘মেজোরাঁ চিপ’ বাজারে আনে।
এরপরও মাইক্রোসফটকে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের তীব্র সংশয়ের মুখে পড়তে হয়েছিল, বিশেষ করে মেজোরাঁ কণা নিয়ে তাদের দাবির বিষয়ে অনেকেই আশ্বস্ত হতে পারেননি।
ওই সময়ে ‘ইউনিভার্সিটি অফ সেইন্ট অ্যান্ড্রুজ’-এর পদার্থবিদ হেনরি লেগ বলেছিলেন, মাইক্রোসফটের কোয়ান্টাম গবেষণা ‘বিজ্ঞান থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে গিয়ে এখন বিশ্বাসের জগতে প্রবেশ করেছে’।
বর্তমানে মাইক্রোসফট ‘কোয়ান্টাম অ্যান্ড ডিসকভারি’ বিভাগের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট জেসন জান্ডার জোর দিয়ে বলেছেন, “দাবির পেছনে আমরা একশ ভাগ অবিচল আছি। আমরা সবসময় বৈজ্ঞানিক কঠোরতা মেনে চলি ও পদার্থবিজ্ঞানের চিরন্তন অংশ হিসেবে যে কোনো বিতর্ককে স্বাগত জানাই।
“আমি মানুষকে কেবল এটাই বলব, আপনারা আমাদের বিভিন্ন গবেষণাপত্র পড়ুন, সেখানে কী আছে তা দেখুন এবং আমরা যাদেরকে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছি সেসব বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলুন।”
মাইক্রোসফট বর্তমানে মার্কিন প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ‘ডারপা’র এক কোয়ান্টাম উন্নয়ন কর্মসূচির চূড়ান্ত ধাপে জড়িয়ে আছে। যার উদ্দেশ্য কোম্পানিটির এ বাণিজ্যিক-স্কেলের কোয়ান্টাম কম্পিউটার ধারণার সত্যতা ও কার্যকারিতা যাচাই করা।
মাইক্রোসফট বলেছে, তারা মূল্যায়নের জন্য ডারপাকে তাদের ব্যবসায়িক গোপন তথ্যসহ সব ডেটা ও কাজের বিবরণী সরবরাহ করেছে।
তবে এ ঘোষণার সঙ্গে তারা যে গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেছে সেটি এখনও ‘পিয়ার-রিভিউড’ হয়নি। ফলে বিবিসি যে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলেছে তারা এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য জানার অপেক্ষায় আছেন।
মেজোরাঁ চিপের এ দ্বিতীয় সংস্করণটি প্রথম সংস্করণের মূল নীতির ওপর ভিত্তি করেই তৈরি। তবে তা আগের চেয়ে বেশি কার্যকর। যার প্রধান কারণ, বিজ্ঞানীরা এখানে সুপারকন্ডাক্টর হিসেবে অ্যালুমিনিয়ামের পরিবর্তে সীসা ব্যবহার করেছেন।
পুরো কাজটিকে আরও উন্নত ও দ্রুত করতে দলটি এআই ব্যবহার করলেও জান্ডার বলেছেন, উপাদান পরিবর্তনের এ ধারণাটি মানুষের মস্তিষ্ক অর্থাৎ ‘মানব বিজ্ঞানীদের’ কাছ থেকেই এসেছে।
কিউবিট সংকট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
মাইক্রোসফটের এ আশাপ্রদ সময়সীমা কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মাধ্যমে এমন সব জটিল সমস্যার সমাধানের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলছে, যা সাধারণ কম্পিউটারের পক্ষে সমাধান করতে হয়ত কয়েক দশক লেগে যেত।
যেমন, পরিবেশ থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর বা খাবার উৎপাদনের জন্য আরও উন্নত সার তৈরি করা।
জেসন জান্ডার এখানে মানুষ, এআই ও কোয়ান্টাম কম্পিউটারের যৌথ ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরে বলেছেন, “আমরা যদি চিরস্থায়ী ক্ষতিকর রাসায়নিক বা মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করার মতো বিভিন্ন বিষয়ের দিকে তাকাই তবে প্রথাগত উপায়ে এগুলোর সমাধান খুঁজতে ১৫, ২০ বা ৩০ বছর লেগে যাওয়াটা অনেক দীর্ঘ। আমরা এ সময়চক্রকে যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে চাই।
“মানুষ ও এআই একসঙ্গে মিলে দ্রুত কাজ করে এ সময়সীমা কমিয়ে আনতে পারলে তা সত্যিই দারুণ হবে। আর এমনটা মানুষকে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং মানুষকে এমন কিছু হাতিয়ার দেওয়া যা এ প্রক্রিয়াকে বাড়াবে এবং আমি মনে করি তা শেষ পর্যন্ত সমাজেরই উপকারে আসবে।”
তবে এ পুরো প্রক্রিয়াকে আটকে রেখেছে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মূল বা মৌলিক জটিলতা। এসব কিউবিট নাজুক প্রকৃতির হয়ে থাকে। ফলে সামান্য তাপমাত্রা পরিবর্তন বা মৃদু কম্পনও এগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে ও হিসেবে ভুলভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। এসব কিউবিটকে দীর্ঘ সময় সচল ও স্থিতিশীল রাখাটা পুরো কোয়ান্টাম শিল্পের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ।
কোয়ান্টাম মেশিনগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্বজুড়ে অনেক কোম্পানি বড় স্কেলের বা বাণিজ্যিক কম্পিউটার তৈরির প্রতিযোগিতায় নামলেও এখন পর্যন্ত কেউ চূড়ান্তভাবে সফল হতে পেরেছে বলে জানা যায়নি।
এ ছাড়া, কারো কারো ধারণা, তারা হয়ত বর্তমানের সাধারণ বা প্রচলিত কম্পিউটারকে একটু তাড়াহুড়ো করেই বাতিলের খাতায় ফেলে দিচ্ছেন।
এদিকে, গুগল ডিপমাইন্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিস ‘ইনফিনিটি মাইন্ড’ বইয়ে লেখক সেবাস্টিয়ান ম্যালাবিকে বলেছেন, “সাধারণ কম্পিউটারের শেষ সীমানা ঠিক কোথায় তা আমরা এখনও জানি না।”