Published : 18 May 2026, 10:18 AM
ক্যালিফোর্নিয়ার রোদে গায়ের ত্বক পুড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বিশেষ এক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন রসায়নের এক অধ্যাপক।
রোদে ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ অণুর আকৃতি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এ প্রযুক্তিটি তৈরি করেছেন তিনি, যা ভবিষ্যতে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব তাপ সরবরাহের সুযোগ তৈরি করবে বলে দাবি তার।
বিবিসি লিখেছে, এ প্রযুক্তি লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চেয়েও বেশি শক্তি-ঘনত্ব দিতে এবং তা বহু বছর পর্যন্ত শক্তি জমা রাখতে পারে।
কয়েক বছর আগে ওই রসায়নের অধ্যাপক গ্রেস হ্যান যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব পাশের বস্টন থেকে পশ্চিমে প্রথমবার দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া ভ্রমণে আসার পরই রোদের পার্থক্যটা টের পেয়েছিলেন। বাইরে কেবল কয়েক ঘণ্টা কাটানোর পরই তার ত্বকে এক ধরনের অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়া শুরু হত।
গত বছর তিনি ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা বারবারা’তে শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে আসার পর থেকেই নিয়মিত বড় হ্যাট, সানগ্লাস ও সানক্রিম ব্যবহার করতে শুরু করেছেন।
বিষয় রসায়ন হওয়ায় এ রোদের তীব্রতা নিয়ে আগে থেকেই পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেছেন, “অবসর সময়ে আমি কেবল ‘ডিএনএ ফটোকেমিস্ট্রি’ নিয়ে পড়েছিলাম।”
এক সময় তিনি বুঝতে পারেন, রোদে পুড়ে যাওয়া মানুষের ত্বকের ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ অণুগুলোই তাকে এক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। সূর্যের আলো বা বিকিরণের সংস্পর্শে এলে এসব অণু আকৃতি পরিবর্তন করে স্বাভাবিক রূপ থেকে সংকুচিত বা বিকৃত রূপ ধারণ করে।
বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরেই এমন কিছু অণুর সন্ধান করছেন, যা নিজেদের আকৃতি বাঁকিয়ে শক্তি জমা রাখতে এবং পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুসারে উদ্দীপনা দিয়ে আবার আগের আকৃতিতে ফিরিয়ে এনে সেই জমা রাখা শক্তি ছেড়ে দিতে পারে।
বিষয়টি অনেকটা ইঁদুর ধরার ফাঁদ পাতা ও পরে সঠিক সময়ে তা ট্রিগার করার মতো, যেটিকে বলা হয় ‘মলিকিউলার সোলার থার্মাল’ বা সহজ ভাষায় ‘মোস্ট এনার্জি স্টোরেজ’। প্রক্রিয়াটি সাশ্রয়ী ও সম্পূর্ণ কার্বন নির্গমনহীন উপায়ে তাপ সরবরাহ করার সম্ভাব্য দারুণ এক মাধ্যম। এ ‘মোস্ট’ প্রযুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘ কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর্যন্ত শক্তি জমা রাখা সম্ভব।
এর আগে, এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে সীমিত সাফল্য পেয়েছিলেন গবেষকেরা। তবে ক্যালিফোর্নিয়ার কড়া রোদ থেকে হ্যান বুঝতে পেরেছিলেন, এবার কী চেষ্টা করে দেখতে হবে।
শক্তি সঞ্চয়কারী এসব অণুর আকৃতি পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি মসৃণ ও বারবার ব্যবহারযোগ্য উপায়ে সক্রিয় করা গুরুত্বপূর্ণ। লাখ লাখ বছরের বিবর্তন নির্দিষ্ট কিছু উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে এ প্রক্রিয়াটিকে নিখুঁত করে তুলেছে।
এক অর্থে, সব জীবন্ত প্রাণীই একেকটি রসায়নাগার। কিছু কিছু জীব এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যে এরা ‘ফটোলাইয়েজ’ নামের এক এনজাইমের সাহায্যে সূর্যের আলোয় বিকৃত হয়ে যাওয়া বিভিন্ন অণুকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারে।
হ্যান বুঝতে পেরেছিলেন, এ ধরনের বিভিন্ন অণু চমৎকার শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থার জন্য উপযোগী উপাদান। তিনি বলেছেন, “এগুলো আকারে খুবই ছোট, অথচ প্রতিটি নিজের ভর অনুপাতে বিপুল পরিমাণ শক্তি জমা রাখতে পারে।”
গেল ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে তিনি ও তার সহকর্মীরা এ যাবৎকালের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন, বিশেষ করে শক্তি ঘনত্বের দিক থেকে।
হ্যান বলেছেন, এমনটি ছোট কাঁচের পাত্রে থাকা ‘একেবারে পুঁচকে কেটলি’র সামান্য পানি খুব দ্রুত ফুটিয়ে বাষ্প করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল।
তার যে শিক্ষার্থীরা গবেষণার এ অংশটি পরিচালনা করছিলেন তারা ফলাফল দেখেই ছুটে আসেন হ্যানকে জানাতে। হ্যান সেই মুহূর্তটির কথা মনে করে বলেছেন, “আমি যখন ভিডিওতে পুরো তরলটি এত দ্রুত ফুটতে দেখলাম তা সত্যিই আমার জন্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা ছিল।”
‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস’ বা ইউসিএল-এর অধ্যাপক ক্যান্ডাল হাউক ও তার দলের করা কম্পিউটার বিশ্লেষণ এ কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ কম্পিউটার বিশ্লেষণের মাধ্যমেই আগে থেকে ধারণা মিলেছিল, এসব অণু কেমন আচরণ করবে।
‘মোস্ট’ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা আরেকজন গবেষক ক্যাসপার মথ-পলসেন স্পেনের ‘পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি অফ বার্সেলোনা’সহ অন্যান্য কোম্পানির গবেষণা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি এ গবেষণার সঙ্গে ছিলেন না তবে এর ফলাফল দেখে মুগ্ধ হয়েছেন।
হ্যান ও তার সহকর্মীদের এ শক্তির ঘনত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “আমার জানামতে আমাদের সেরা বিভিন্ন সিস্টেমের সক্ষমতা ছিল প্রতি কেজিতে ১ মেগাজুল বা শক্তি। তবে তাদের তৈরি সিস্টেমে এমনটি ছিল ১.৬ মেগাজুল, যা সত্যিই অসাধারণ।”
ফেব্রুয়ারির গবেষণাপত্রে রেকর্ড করা প্রতি কেজিতে ১.৬৫ মেগাজুল শক্তির এ ঘনত্ব লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চেয়েও বেশি, যা বর্তমানে ফোন ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাটারি।
হ্যান ও তার সহকর্মীদের উদ্ভাবিত এ ‘মোস্ট’ সিস্টেমের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ‘ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটি’র জন গ্রিফিন বলেছেন, এ ব্যবস্থার মূল অণুগুলোর আকৃতি পরিবর্তন করার জন্য যে তরঙ্গের আলোর প্রয়োজন তার দৈর্ঘ্য হলো ৩০০ ন্যানোমিটার, যা আসলে এক ধরনের “তীব্র আল্ট্রাভায়োলেট বা অতিবেগুনি রশ্মি। এ আলো সূর্য থেকে আমাদের কাছে আসে ঠিকই তবে তা খুবই সামান্য পরিমাণে।”
পাশাপাশি, শক্তি মুক্ত করার জন্য বিকৃত অণুটিকে আবার আগের আকৃতিতে ফিরিয়ে নিতে যে ট্রিগার ব্যবহৃত হয়েছিল তা ছিল ‘হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড’, যা ক্ষয়কারী পদার্থ ও ব্যবহারের পর এটিকে নিষ্ক্রিয় করতে হয়।
হ্যান নিজেও স্বীকার করেছেন, “এটি খুব একটা আদর্শ সমাধান নয়।”
তবে তিনি আশাবাদী, প্রাকৃতিক আলোর প্রতি এ সিস্টেমের কার্যকারিতা আরও বাড়ানো সম্ভব এবং কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক ছাড়াই শক্তি মুক্ত করার প্রক্রিয়াটি ট্রিগার করা যাবে।
এ ধরনের গবেষণার মূল লক্ষ্য ঘরবাড়ি ও কলকারখানা গরম রাখার ক্ষেত্রে কার্বন নির্গমন পুরোপুরি বন্ধ করা, যা কঠিন কাজ হিসেবে পরিচিত।
তাপ উৎপাদনের জন্য বিশ্ব এখনও বহুলাংশে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ‘মলিকিউলার সোলার থার্মাল সিস্টেম’ ও জীবাশ্ম জ্বালানি উভয়ই রাসায়নিক শক্তির একেকটি রূপ।
তবে মথ-পলসেন জোর দিয়ে বলেছেন, “মোস্ট প্রযুক্তিটি কোনো কিছু না পুড়িয়েই কাজ করে।”
এ ছাড়া, নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকা জীবাশ্ম জ্বালানির মতো নয় এটি। কারণ ‘মোস্ট’ প্রযুক্তি পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তেই সহজলভ্য করা সম্ভব। ঠিক এ কারণেই সম্প্রতি হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে এত বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে। কারণ, বিশ্বের ওই অংশে উৎপাদিত জ্বালানি মানুষের প্রয়োজন অনুসারে সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পারছে না।
মথ-পলসেন বলেছেন, একটি ‘মোস্ট’ এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম দীর্ঘ মেয়াদে বা কয়েক দশক পর্যন্তও শক্তি জমা রাখতে পারে। অথচ সাধারণ তাপীয় শক্তি হিসেবে জমা রাখা উত্তাপ বড়জোর কয়েক ঘণ্টা, দিন বা কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এ প্রযুক্তি নিয়ে নতুন নতুন উদ্ভাবন ও গবেষণা সম্ভবত চলতেই থাকবে। তবে মনে রাখা জরুরি, এ ক্ষেত্রটি বর্তমানে বেশ ছোট বা সীমিত পরিসরে রয়েছে।