Published : 11 Jun 2026, 04:16 PM
বহু বছর ধরে সিলিকন ভ্যালিতে ক্যারিয়ার গড়তে মরিয়া উচ্চাভিলাষী শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার সায়েন্স, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডেটা অ্যানালিটিক্সের মতো ডিগ্রিগুলোকে বেছে নিতেন।
এক সময় এগুলোকে নিশ্চিত সাফল্যের পথ মনে করা হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের এ যুগে সেই পথ এখন বেশ বদলেছে। অপ্রত্যাশিত এক মোড় নিয়ে প্রযুক্তি শিল্পের বড় পদগুলোতে এখন বিশেষভাবে সাড়া ফেলছে দর্শন ডিগ্রি।
প্রযুক্তি ও দর্শনের এ অভূতপূর্ব মেলবন্ধন চাকরির বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম অবজারভার।
শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন এআই কোম্পানি বাজারে যখন নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার দৌড়ে ব্যস্ত ঠিক তখনই তারা এআই সিস্টেমের এমন কিছু শক্তিশালী জটিলতা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, যার ভেতরের কার্যপদ্ধতি রহস্যময় ও অস্পষ্ট। আর এখানেই প্রবেশ ঘটছে দার্শনিকদের।
অ্যানথ্রপিক ও গুগল ডিপমাইন্ডের মতো প্রযুক্তি কোম্পানিতে দার্শনিকরা এখন বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিচ্ছেন। তাদের মূল কাজ এআই মডেলের আচরণ ব্যাখ্যা করা, এসব প্রযুক্তিকে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে মানানসই করে গড়ে তোলা এবং সিস্টেমের সঙ্গে কেমন আচরণ করা উচিত সেই সিদ্ধান্ত নিতে ‘দিকনির্দেশনা’ দেওয়া।
‘কনশাসনেস’ বা চেতনা নিয়ে গবেষণারত ‘ইউনিভার্সিটি অফ সাসেক্স’-এর নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক অনিল সেথ বলেছেন, “চাকরির বাজারে দার্শনিকদের জন্য সময়টা চমৎকার বলেই মনে হচ্ছে। বিষয়টি ইতিবাচক।
“আরও বেশি কোম্পানির উচিত দার্শনিকদের নিয়োগ দেওয়া। কারণ বর্তমানে ‘সুস্পষ্ট ও গভীরভাবে চিন্তা করার’ প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে।”
অ্যানথ্রপিক ও গুগল ডিপমাইন্ডের দার্শনিকরা
এ খাতের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন স্কটল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী দার্শনিক অ্যামান্ডা আস্কেল। তিনি ‘নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি’ ও ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি’তে পড়াশোনা করেছেন।
চ্যাটিজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআই’তে কাজ করার পর আস্কেল ২০২১ সালে অ্যানথ্রপিকে যোগ দিয়েছেন, যেখানে তার মূল কাজ ক্লড মডেলের আচরণ বা স্বভাব নির্ধারণ করা। তার সঙ্গে রয়েছেন জো কার্লস্মিথের মতো সমমনা দার্শনিকরা।
‘ওপেন ফিলানথ্রপি’তে দীর্ঘ সাত বছর কাটানোর পর গেল বছর অ্যানথ্রপিকে এসেছেন কার্লস্মিথ। তিনিও সেখানে ক্লডের ‘চরিত্র গঠনে’ কাজ করছেন।
অন্যদিকে, গুগল ডিপমাইন্ডে এআই ও নৈতিকতা সংক্রান্ত বিষয়গুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইয়াসন গ্যাব্রিয়েল। তিনি অক্সফোর্ডের রাজনৈতিক দর্শন থেকে আসা একজন সাবেক অধ্যাপক।
এ ছাড়া, ল্যাবটি সম্প্রতি ‘কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক হেনরি শেভলিন’কেও নিয়োগ দিয়েছে। তার ঘোষণা অনুসারে, তিনি ‘মেশিন কনশাসনেস’ বা যন্ত্রের চেতনা, মানুষ ও এআইয়ের মধ্যকার সম্পর্ক ও ‘আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স’ বা এজিআইয়ের প্রস্তুতির মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছেন।
এআই কখনও মানুষের মতো চেতনা পেতে পারবে কি না এবং তা যদি পারে তবে মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর প্রভাব কী হবে সেসব প্রশ্নের উত্তর মেলা এখনো জটিল।
অধ্যাপক সেথ বলেোছন, বিভিন্ন কোম্পানিকে একদিকে যেমন অতীতে করা ‘নৈতিক ভুলগুলোর’ পুনরাবৃত্তি এড়াতে হবে অন্যদিকে তেমনই তাড়াহুড়া করে এআই সিস্টেমগুলোকে মানুষের মতো অধিকার দেওয়া থেকেও দূরে থাকতে হবে।
এর কারণ হিসাবে যুক্তি হচ্ছে , সময়ের আগে অধিকার দিয়ে দিলে তা ‘এসব প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রণাধীন রাখা ও মানব সমাজের সঙ্গে মানানসই করে ধরে রাখার ক্ষেত্রে মানব সক্ষমতাকে বাধার মুখে ফেলতে পারে’।
এদিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা কোম্পানিগুলোর অন্যতম অ্যানথ্রপিক। তারা কেবল দার্শনিকদের নিয়োগ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং মডেলের কল্যাণের জন্য বিশেষায়িত ‘মডেল ওয়েলফেয়ার টিম’ও গঠন করেছে।
মেটা’র প্রধান এআই কর্মকর্তা আলেকজান্দর ওয়াং’ও মডেলের কল্যাণকে ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা নিয়ে আরও ভাবনার অবকাশ রয়েছে বলে দাবি তার।
তবে অনেকেই এ নিয়ে সন্দিহান। মাইক্রোসফট এআইয়ের সিইও মুস্তাফা সুলেইমান সতর্ক করে বলেছেন, এআই সিস্টেমগুলোকে চেতনাওয়ালা হিসেবে বিবেচনা করা সমাজকে ‘বিপজ্জনক এক পরিস্থিতির’ দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তবে আপাতত, প্রযুক্তি শিল্পে দার্শনিকদের নিয়োগের পেছনের উদ্দেশ্যটিকে বেশ অর্থবহ ও বাস্তবসম্মত বলেই অনেকে মনে করছেন।
‘ইউনিভার্সিটি অফ সিডনি’র দর্শনের অধ্যাপক পিটার গডফ্রি-স্মিথ বলেছেন, “তারা যোগ্য মানুষদেরই নিয়োগ দিচ্ছে; এমন কাউকেও নিচ্ছে না যারা কেবল ‘পিআর বা জনসংযোগ টাইপ’ মানুষ হিসেবে কাজ করবে বা সাধারণ জনগণের কাছে কী ঘটছে তা কেবল অনুবাদ করে বুঝিয়ে দেবে।
“দার্শনিকরা যেকোনো সমস্যার ‘গভীরে’ গিয়ে অনুসন্ধান করেন।”
অধ্যাপক গডফ্রি-স্মিথ একসময় ‘সিইউএনওয়াই গ্র্যাজুয়েট সেন্টার’-এ অধ্যাপক শেভলিনের পিএইচডি মেন্টর বা শিক্ষক ছিলেন।
এআই ও দর্শনের এই মেলবন্ধন কেবল সিলিকন ভ্যালিতেই সীমিত নেই। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা অ্যাকাডেমিয়াও খুব দ্রুত এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। কারণ চেতনা, নৈতিকতা, মন ও কম্পিউটেশন বা হিসাব-নিকাশ সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের দার্শনিক বিভিন্ন প্রশ্ন এখন ‘নতুন এক জরুরি রূপ’ ধারণ করেছে।
গডফ্রি-স্মিথ বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে এই দুই ধারার সংযোগস্থলে কাজ করা গবেষকরা এমন এক নতুন ধরনের ভাষা বা পরিভাষা তৈরি করছেন, যা গাণিতিক বিভিন্ন কৌশলকে অন্তর্ভুক্ত করে, যা আজ থেকে এক দশক আগেও কল্পনাতীত ছিল।
তবে এসব পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত দার্শনিকদের ক্যারিয়ারের সম্ভাবনাকে কতটা অর্থপূর্ণভাবে বদলে দেবে তা এখনও অনিশ্চিত।
‘ইউএস ব্যুরো অফ লেবার স্ট্যাটিস্টিকস’-এর ২০২৩ সালের তথ্য অনুসারে, দর্শন ও ধর্মতত্ত্বে ব্যাচেলর ডিগ্রিধারীদের মধ্যম বার্ষিক আয় প্রায় ৬৫ হাজার ডলার, যা সার্বিকভাবে সব বিষয়ে ডিগ্রিধারীদের গড় আয় ৭০ হাজার ডলারের চেয়ে কিছুটা কম। এ হিসাবে এ বিষয়ের স্নাতকদের জন্য সবচেয়ে সাধারণ পেশা হচ্ছে আইন।
দর্শনের পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের জন্য অবশ্য চিরাচরিত পথটি বেশ স্পষ্ট ছিল। এআইয়ের কল্যাণ নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংগঠন ‘এলিওস এআই’-এর প্রধান রবার্ট লং বলেছেন, “বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত যে, আপনার স্বাভাবিক বা ডিফল্ট পরিকল্পনা থাকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে ‘দর্শন পড়ানো’।”
শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন এআই কোম্পানিতে দার্শনিকদের জন্য এসব নতুন পদের তৈরি চাকরির বাজারকে নাটকীয়ভাবে বদলে দেবে, এমনটা মনে করেন না রবার্ট লং।
তবে এআই ও নৈতিকতা নিয়ে কাজ করা গবেষণা কেন্দ্রগুলোর সার্বিক বিকাশ চাকরির বাজারে ‘অর্থপূর্ণ পরিবর্তন’ আনতে পারে। পরিবর্তনটি হবে বেশ ধীরগতির।
রবার্ট লংয়ের ভাষায়, “দর্শন চর্চার মতো জায়গার সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও তা এতটাও বেশি নয় যা এ খাতের চাকরির বাজারকে বহু মানুষের জন্য ‘চরম কঠিন ও মানসিক চাপওয়ালা’ হওয়া থেকে পুরোপুরি মুক্ত করতে পারে।”