Published : 17 Jan 2026, 03:54 PM
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে এমন কিছু অদ্ভুত রোগীর কথা বলে আসছেন চিকিৎসকরা, যারা কোনো অ্যালকোহল বা মদ পান না করেও সাধারণ খাবার খাওয়ার পর মাতালের মতো আচরণ করেন।
বিরল ও বিরক্তিকর সমস্যাটি ‘অটোব্রুয়ারি সিনড্রোম’ বা এবিএস নামে পরিচিত।
দীর্ঘদিন ধরে গবেষকদের ধারণা ছিল, কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবারকে গাঁজন প্রক্রিয়ায় অ্যালকোহলে রূপান্তর করে পেটের ভেতরে থাকা অতিরিক্ত ছত্রাক, যার ফলে এমনটি ঘটে। তবে ২০১৯ সালের যুগান্তকারী এক গবেষণায় দেখা মেলে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইথানল তৈরি করতে পারে এমন ‘ব্যাকটেরিয়া’ও এর জন্য দায়ী।
সম্প্রতি ‘নেচার মাইক্রোবায়োলজি’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় পরিসরে এবিএস রোগীদের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে, এ সমস্যার মূল কারণ আসলে ব্যাকটেরিয়া।
গবেষণার ফলে ভবিষ্যতে এমন চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন সম্ভব হতে পারে, যা রোগীর পেটের অণুজীবের অ্যালকোহল তৈরির সক্ষমতাকে বদলে দেবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট সায়েন্স।
বেইজিংয়ের ‘ক্যাপিটাল ইনস্টিটিউট অফ পেডিয়াট্রিক্স’-এর অণুজীববিজ্ঞানী জিং ইউয়ান বলেছেন, গবেষণাটি ‘ছত্রাক তত্ত্বকে’ বাতিল করে দেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ দিয়েছে। ২০১৯ সালের গবেষণাটির নেতৃত্বে ছিলেন ইউয়ান। তবে বর্তমান এ গবেষণার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে নন তিনি।
ইউয়ান বলেছেন, গবেষকরা সফলভাবে প্রমাণ করেছেন ‘এ সমস্যাটি মূলত ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে তৈরি হওয়া অ্যালকোহল বা ইথানল গাঁজনের কারণেই ঘটে’।
‘অটোব্রুয়ারি সিনড্রোম’ সম্পর্কে যা জানা গেছে তার বেশিরভাগই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা থেকে জানা। এর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, শর্করা জাতীয় খাবার খাওয়ার পরই রোগীরা মাতাল হয়ে পড়েন।
যেমন একজন তরুণী ডায়াবেটিস পরীক্ষার জন্য গ্লুকোজ খাওয়ার পর আর হাঁটতেই পারছিলেন না। এ রোগের কারণে রোগীদের মারাত্মক সামাজিক সমস্যার মুখে পড়তে হয়, যেমন দিনের বেলা মাতাল থাকার অপবাদে চাকরি হারানো।
‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া স্যান ডিয়েগো’র গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ও এ গবেষণার প্রধান গবেষক বার্নড শ্নাবল বলেছেন, “রোগটি পরিবারের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে।” রোগীরা যখন দাবি করেন, তারা মদ পান করেননি তখনও কেউ, এমনকি চিকিৎসকরাও তা বিশ্বাস করতে চান না।
এসব রোগীদের গ্লুকোজ খাইয়ে, এরপর ব্রেথলাইজার বা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি শনাক্ত করেন চিকিৎসকরা। এ সময় সাধারণত ছত্রাকনাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করানো হয় তাদের। সেইসঙ্গে শর্করা কম আছে এমন খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা, যাতে অ্যালকোহল তৈরি করা বিভিন্ন অণুজীব খাবার না পায়। তবে এত কিছুর পরও বছরের পর বছর এ সমস্যার হঠাৎ পুনরাবৃত্তি বা প্রকোপ নিয়ে লড়াই করছেন রোগীরা।
নতুন গবেষণাপত্রে ২২ জন এবিএস আক্রান্ত রোগীর তথ্য তুলে ধরেছেন শ্নাবল ও তার সহকর্মীরা। গবেষণার ফলাফল নির্ভুল করতে তাদের পরিবারের সদস্যদেরও এই পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন তারা। কারণ, যেন একই ধরনের খাবার খাওয়া বা একই পরিবেশে থাকার মতো বিভিন্ন বিষয় গবেষণার ফলাফলে বিভ্রান্তি তৈরি করতে না পারে।
এবিএস বিরল রোগ হওয়ায় ‘ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি’র যকৃৎ বিশেষজ্ঞ জাসমোহন বাজাজ বলেছেন, “এ রোগের ক্ষেত্রে ২২ জন রোগীর এ দলটি বড় সংখ্যা। আমার পুরো জীবনে এ পর্যন্ত কেবল একজন এমন রোগী শনাক্ত করতে পেরেছি।”
গবেষণায় উঠে এসেছে, এবিএস রোগীদের মলের নমুনায় কৃত্রিম পরিবেশে অ্যালকোহল তৈরি হয়েছে। তবে তাদের পরিবারের সুস্থ সদস্যদের নমুনায় তা হয়নি। সুস্থ মানুষের পেটেও খুব সামান্য পরিমাণে অ্যালকোহল তৈরি হয়, যা শরীর সহজেই হজম বা বিপাক করে ফেলে।
এ ছাড়া, এবিএস রোগীদের শরীরে এমন কিছু এনজাইমের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে, যা যকৃতের বা লিভারের ক্ষতির লক্ষণ প্রকাশ করে। একজন রোগীর যকৃতে স্থায়ী ক্ষত বা দাগ দেখা গেছে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সিরোসিস’ বলা হয়।
পরিবারের অন্য সদস্যদের তুলনায় এবিএস রোগীদের অন্ত্রে ‘ক্লেবসিয়েলা’ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি অনেক বেশি দেখা গেছে। সেইসঙ্গে ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়ার মাত্রাও ছিল চোখে পড়ার মতো। ই-কোলাই অ্যালকোহল তৈরি করতে পারে বলে আগে থেকেই জানা ছিল। তবে, এ রোগের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা যে এত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তা গবেষকরা আগে ভাবেননি।
গবেষক শ্নাবল বলেছেন, যারা ওই সময়ে রোগের তীব্র লক্ষণগুলোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন তাদের শরীরে ই-কোলাইয়ের মাত্রা সুস্থ থাকা রোগী বা পরিবারের অন্য সদস্যদের তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাদের শরীরে ‘ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা বাড়া বা কমার সঙ্গে সঙ্গে রোগের বিভিন্ন লক্ষণও পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল বা কমছিল’।
গবেষকরা বলছেন, এবিএস রোগীদের অন্ত্রে ইস্ট বা অন্যান্য ছত্রাকের উপস্থিতির সঙ্গে সুস্থ ব্যক্তিদের কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী অনেক রোগী আগে থেকেই ছত্রাকনাশক চিকিৎসা গ্রহণ করেছিলেন।
শ্নাবল বলেছেন, “ইস্ট বা ছত্রাকের কারণে অটোব্রুয়ারি সিনড্রোম হওয়া কোনো মানুষ থাকতে পারে না, এমন সম্ভাবনা আমি পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে চাই না।”
যকৃৎ বিশেষজ্ঞ বাজাজ বলেছেন, নতুন গবেষণাটি যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ার পরও এবিএস সম্পর্কে আমাদের বোঝার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে। বছরের পর বছর পর্যবেক্ষণের পরেও গবেষকরা এমন কোনো ‘অকাট্য প্রমাণ’ খুঁজে পাননি, যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, কেন মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হন।
‘ক্লেবসিয়েলা’ ও ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া যে কেবল এবিএস রোগীদের দেহেই থাকে বিষয়টি এমন নয়। এসব ব্যাকটেরিয়া সাধারণ মানুষের শরীরেও থাকে।
“ফলে আমরা এখনও এ দ্বন্দ্বে আছি, অন্ত্রের এসব অণুজীবই এ রোগের সবকিছুর মূলে নাকি আরও অন্য কারণ আছে। আমরা এখনও জানি না কেন আরও হাজার হাজার মানুষ যাদের শরীরে সবসময় এসব ব্যাকটেরিয়া থাকে তারা এই সিনড্রোমে আক্রান্ত হন না।”