Published : 01 Jan 2026, 10:36 AM
২০২৫ সাল পেরিয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সুনজর বছরান্তে এই খাতের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত হয়নি। অথচ একসময় পুরো বাজারে ব্যাপক আশা ও উদ্দীপনার উৎস ছিল এই খাত।
অক্টোবরে ১ লাখ ২৬ হাজার ডলারের রেকর্ড সর্বোচ্চ দাম স্পর্শ করেছিল বিটকয়েন। তবে সেই সর্বোচ্চ দাম খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
১২ অক্টোবর চীনের ওপর ট্রাম্পের ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা পুরো বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। ফলে কেবল কয়েক দিনের ব্যবধানেই বিটকয়েনের দাম হুড়মুড় করে পড়ে যায়।
এ বছরের শেষ কয়েক মাসে ডিজিটাল সম্পদের বাজার থেকে এই ডিজিটাল মুদ্রাটি প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্য হারিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান।
ক্রিপ্টো বাজারে কেবল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের সম্পদ উধাও হয়ে যায়, যা এখন পর্যন্ত রেকর্ডকৃত সবচেয়ে বড় ক্ষতি। পরবর্তী এক মাসে দ্বিতীয় বড় ক্রিপ্টোমুদ্রা ইথেরিয়ামের বা ইথারের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়। ডিসেম্বরে ট্রাম্পের ছেলে এরিক ট্রাম্পের নিজস্ব ক্রিপ্টো কোম্পানির মূল্যেও একই ধরনের ধস নামে।
ট্রাম্পের মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্প এমন একজন বিটকয়েন-বান্ধব প্রেসিডেন্ট পেয়েছে যার প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী প্রচারণার সময়ই দিয়েছিলেন তিনি। দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতা গ্রহণের কেবল কয়েক দিনের মধ্যেই এক নির্বাহী আদেশ জারি করেন ট্রাম্প।
ওই আদেশের মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপর থাকা আগের সব বিধিনিষেধ বাতিল করা ও নতুন কিছু অনুকূল নীতিমালা করেন এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেইসঙ্গে ডিজিটাল সম্পদ নিয়ে কাজের জন্য বিশেষ এক প্রেসিডেন্সিয়াল ওয়ার্কিং গ্রুপও গঠন করেন তিনি।

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, “ডিজিটাল সম্পদ শিল্প যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এবং আমাদের দেশের আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
এর মাধ্যমেই ক্রিপ্টোকারেন্সিকে আমেরিকার মূল নীতিমালার একদম কেন্দ্রে নিয়ে আসেন ট্রাম্প।
এ বছরের মার্চে আবারও নতুন এক ‘স্ট্র্যাটেজিক ক্রিপ্টোকারেন্সি রিজার্ভ’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। এ ঘোষণার ফলে বিটকয়েন মজুদের জন্য মনোনীত পাঁচটি মুদ্রার মধ্যে তিনটির বাজারমূল্য ৬২ শতাংশ বেড়ে যায়। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনের দাম এই রিজার্ভ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ১০ শতাংশ বেড়ে ৯৪ হাজার ১৬৪ ডলারে পৌঁছায়।
অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ ‘বিটিসি মার্কেটস’-এর বিপণন ও যোগাযোগ প্রধান রাচেল লুকাস বলেছেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি মূলত বিভিন্ন আলোচনা ও বিশ্ববাজারের আস্থার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। বিষয়টিকে বলে ‘রিস্ক-অন অ্যাসেট, অর্থাৎ এ ধরনের বিনিয়োগ তখনই ভালো পারফর্ম করে যখন বিনিয়োগকারীরা অর্থনীতি নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকেন এবং বেশি ঝুঁকি নিতে রাজি হন।
“ট্রাম্প প্রশাসন ক্রিপ্টো-বান্ধব হতে পারে তবে বাজারের ওপর শুল্ক আরোপ ও কঠোর মুদ্রানীতির প্রভাব ইতিবাচক মনোভাবের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। আর এটি ক্রিপ্টো দুনিয়ার মানুষের জন্য সতর্কবার্তা যে, রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়ে বড় বিভিন্ন অর্থনৈতিক শক্তি আসলে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
নভেম্বরে বিটকয়েনের দামে ২০২১ সালের পর সবচেয়ে বড় ধস নামে। এর ফলে বিটকয়েনের দাম ৮১ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসে। পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে বিটকয়েন হারানো মূল্যের কিছুটা ফিরে পেলেও ডিসেম্বরের শুরুতেই আবার বড় ধাক্কার মুখে পড়ে।
বিটকয়েনের সবচেয়ে বড় হোল্ডার ‘স্ট্র্যাটেজি’ ক্রিপ্টোকারেন্সির দাম কমে যাওয়ার কারণে তাদের আয়ের পূর্বাভাস কমিয়ে দিলে বিটকয়েনের দাম আরও ৬ শতাংশ পড়ে যায়। বর্তমানে বিটকয়েনের দাম ৯০ হাজার ডলারের আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় বেশি হলেও এর সর্বোচ্চ দামের শিখর থেকে অনেক কম।
ডিসেম্বরের প্রথম কয়েক দিনেই এরিক ট্রাম্পের ক্রিপ্টো কোম্পানি ‘আমেরিকান বিটকয়েন কর্পোরেশন’-এর মূল্যের ৪০ শতাংশ উধাও হয়ে যায়। এ কোম্পানির দাম প্রায় ১০০ কোটি ডলার।
ক্রিপ্টো বাজারে দরপতনের পরও বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে ট্রাম্প পরিবারের এই উত্তরসূরি ঘোষণা দিয়েছেন, এই মন্দা কাটিয়ে উঠবেন তিনি।
ওই সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে এরিক ট্রাম্প বলেছেন, “আমি আমার কোম্পানির সব শেয়ার ধরে রাখছি এবং এই শিল্পকে নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যাপারে আমি ১০০ শতাংশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
কিছু বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন, এ শিল্পটি এখন প্রচলিত ‘ক্রিপ্টো উইন্টার’ বা ক্রিপ্টো শীতকালে প্রবেশ করছে, যা মূলত দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা বা লোকসানের সময়।
এর আগে ২০২১ সালের শেষ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ক্রিপ্টো শীতকাল স্থায়ী হয়েছিল। এ সময় ‘এফটিএক্স’-এর কর্ণধার স্যাম ব্যাঙ্কম্যান-ফ্রিড বিচারের মুখে পড়েছিলেন ও দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। ওই বছরগুলোতে বিটকয়েনের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গিয়েছিল।
‘ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ বা এমআইটির ‘ক্রিপ্টোইকোনমিক্স ল্যাব’-এর প্রতিষ্ঠাতা ক্রিশ্চিয়ান ক্যাটালিনি বলেছেন, ট্রাম্পের জয়ের ফলে বাজারে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হলেও বর্তমান মন্দা প্রমাণ করেছে, ক্রিপ্টো-বান্ধব প্রশাসন থাকাই ২০২১ সালের সেই ‘রিটেইল ম্যানিয়া’ বা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উন্মাদনা ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট নয়।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে সাধারণ মানুষ বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে শেয়ার ও ক্রিপ্টো লেনদেনে এক বিশাল জোয়ার দেখা গিয়েছিল।
“সাম্প্রতিক এই ধসটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কারণে হয়নি, বরং তিনটি কাঠামোগত কারণে এই সংঘাত তৈরি হয়েছে। প্রথমত, অক্টোবরে ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের ঋণে জর্জরিত বিনিয়োগ ধসে পড়ার পরবর্তী প্রভাব। দ্বিতীয়ত, আমেরিকা ও চীনের মধ্যে শুল্ক নিয়ে উত্তেজনার কারণে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকির বদলে নিরাপদ অবস্থানে চলে যাওয়া এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বড় কোম্পানির বিটকয়েন মজুদ বা ট্রেজারি বাণিজ্যে সম্ভাব্য বড় ধরনের বিপর্যয়।”
লুকাস বলেছেন, ক্রিপ্টো বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলার পেছনে আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া’র মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম কমে যাওয়া।
“বিটকয়েন কেন এআই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার অন্যতম কারণ অনেক বিটকয়েন মাইনার আসলে নিজেদের শক্তি বা বিদ্যুৎ সরবরাহ এখন নতুন বিভিন্ন ডেটাসেন্টারের দিকে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি কেবল একটি প্রযুক্তিগত সম্পদই নয়, বরং বিটকয়েন মাইনাররা সরাসরি এআই ডিভাইসের ক্রমাগত প্রসারের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। ফলে এআই খাতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়লে তা ক্রিপ্টো বাজারেও ছড়িয়ে পড়ে।”