Published : 03 Apr 2026, 04:29 PM
বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক স্থলচর প্রাণী ১৯৪ বছর বয়সী কচ্ছপ জোনাথনের মৃত্যুর ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বজুড়ে তোলপাড় তৈরি হয়েছে।
জোনাথনের চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে ভুয়া এক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে এ খবরটি ছড়ানো হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল ক্রিপ্টোকারেন্সি অনুদান হাতিয়ে নেওয়া।
বিবিসি’সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এ ভুল খবরটি প্রচার করলেও পরে জানা যায়, জোনাথন সেইন্ট হেলেনা দ্বীপে বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে লিখেছে, ১৯৪ বছর বয়সী বিশালকায় কচ্ছপ জোনাথন তখন একেবারেই তরুণ যখন রানি ভিক্টোরিয়া সিংহাসনে বসেছিলেন। সেই জোনাথন এখন এতটাই দীর্ঘজীবী হয়েছে যে, সে এক ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতারণার শিকার হল।
বিবিসি, ডেইলি মেইল ও ইউএসএ টুডে’র মতো সংবাদমাধ্যমগুলো ভুলবশত জোনাথনের মৃত্যুর খবর প্রচার করে। জোনাথনের চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করা এক ভুয়া এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে এ খবর ছড়ানো হয়েছিল।
‘জো হলিন্স’ নামের ওই ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছে, “খুবই ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানাচ্ছি, বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক স্থলচর প্রাণী আমাদের প্রিয় জোনাথন আজ সেইন্ট হেলেনায় শান্তিপূর্ণভাবে মারা গেছে।
“দীর্ঘ বছর ধরে এর চিকিৎসক হিসেবে একে দেখাশোনা করা, নিজের হাতে কলা খাওয়ানো আর রোদে এর বিশ্রাম নেওয়া উপভোগ করা আমার জন্য সম্মানের বিষয় ছিল। সে সহনশীলতা ও দীর্ঘায়ুর এক অনন্য নিদর্শন রেখে গেছে, যা কোটি কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। শান্তিতে ঘুমাও বন্ধু, তোমাকে খুব মনে পড়বে।”
পোস্টটি প্রায় ২০ লাখ মানুষ দেখেছেন ও ব্রিটিশ জাতীয় সংবাদমাধ্যম বিষয়টিকে সংবাদ হিসেবে প্রচার করেছে। তবে গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ওই অ্যাকাউন্টটি আসলে ব্রাজিল থেকে চালানো হচ্ছিল। জোনাথনের মূল চিকিৎসক কোনো এক্স অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন না।
তিনি বলেছেন, জোনাথন কচ্ছপটি বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। আমার ধারণা, এক্স-এ যে ব্যক্তি আমার পরিচয় দিয়ে এ পোস্ট করেছে সে আসলে ক্রিপ্টো অনুদান চাইছে। ফলে বিষয়টি কোনো এপ্রিল ফুল বা নিছক কৌতুক নয়। এমনটি প্রতারণা।”
বিবিসি যখন প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে (যা পরে তারা সরিয়ে নেয়) সেই সময় ওই ভুয়া ব্যক্তিটি আসলেই ক্রিপ্টোকারেন্সি অনুদান চাইছিল।
জোনাথন এক ‘সিশেলস জায়ান্ট টর্টয়েজ’ ও বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক পরিচিত স্থলচর প্রাণী। ১৮৮২ সাল থেকে সে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের সেইন্ট হেলেনা দ্বীপের গভর্নরের বাসভবন প্রাঙ্গণে বসবাস করছে। কচ্ছপটিকে এখানে উপহার হিসেবে সেখানে আনা হয়েছিল।
বুধবার রাতে গভর্নর নাইজেল ফিলিপস ঘুমানোর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এসব খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি বিছানা ছেড়ে উঠে জোনাথনকে খুঁজতে বের হন।
তিনি বলেছেন, “জোনাথন চারণভূমির এক গাছের নিচে ঘুমাচ্ছিল।”
ফিলিপস নিশ্চিত করেছেন, কচ্ছপটি ‘জীবিত’ আছে।
বৃহস্পতিবার সকালে ফিলিপস কৌতুক করে বলেছেন, জোনাথন এক সংবাদ বিবৃতি দিয়েছে, যেখানে কচ্ছপটি বলেছে, “আমার মৃত্যুর খবরটি অতিরঞ্জিত... কথাটি মার্ক টোয়েনের ছিল, অস্কার ওয়াইল্ডের নয়। জোনাথনের অবশ্য এ দুই লেখকেরই মূল প্রথম সংস্করণ পড়ার সুযোগ ছিল।”
ছানি পড়ার কারণে জোনাথন অন্ধ ও সে তার ঘ্রাণশক্তিও হারিয়েছে। এরপরও সে বেশ সুস্থ সবল। এর এখনও কলার প্রতি বেশ ঝোঁক রয়েছে ও এর যৌন আকাঙ্ক্ষাও অটুট। সে গভর্নরের বাসভবনে থাকা অন্য দুটি অপেক্ষাকৃত তরুণ কচ্ছপের সঙ্গে প্রজননের চেষ্টা চালায়।
বৃহস্পতিবার সকালে গভর্নরের দল বৃষ্টির মধ্যে কাদা মাড়িয়ে বাইরে বের হয় জোনাথনের একটি ছবি তুলতে। ১১ ঘণ্টার দীর্ঘ ঘুম থেকে তখন কেবলই জেগেছে তন্দ্রাচ্ছন্ন কচ্ছপটি। তারা জোনাথনকে একটি আইপ্যাডের সামনে রেখে ছবি তোলেন, যার স্ক্রিনে বিবিসির হোমপেইজ দেখা যাচ্ছিল। এমনটি করার কারণ, যেন সবাই নিশ্চিত হতে পারে সে বেঁচে আছে।
ঝোপঝাড়ের আড়ালে মাটিতে শুয়ে থাকা জোনাথনকে দেখে মনে হচ্ছিল এর মৃত্যু নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে তোলপাড় চলছে সে সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। সকালের বৃষ্টিতে তার খোলসটি চকচক করছিল। তবে এর মনটা সম্ভবত একটু খারাপ ছিল। কারণ জোনাথন রোদ বেশি পছন্দ করে। রোদ পেলে সে নিজের পাগুলো ছড়িয়ে দিয়ে আর চোখ আধবোজা করে শুয়ে থাকে।
এ প্রতারণার ঘটনাটি প্রায় ৪ হাজার ৪৪০ জন মানুষের ছোট্ট এই দ্বীপের বাসিন্দাদের বেশ নাড়িয়ে দিয়েছে। জোনাথন সেখানে একজন স্থানীয় মহাতারকা, যার ছবি সেন্ট হেলেনার ৫ পেন্সের মুদ্রার উল্টো পাশেও রয়েছে।
জোনাথনের এ দীর্ঘ জীবনের রুটিন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দিয়ে গভর্নর ফিলিপস বলেছেন, “জোনাথনের দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে ঘাস খেয়ে। সপ্তাহে একদিন একে ফল, সবজি ও সালাদ দেওয়া হয় যাতে সে প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান পায়। সে মিষ্টি জাতীয় খাবার খুব পছন্দ করে। মাঝেমধ্যে পর্যটকরা একে দেখতে আসেন। তবে প্রাণীদের যাতে কোনো মানসিক চাপ না হয় সেজন্য বিষয়টি খুব সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
“এর বাইরে জোনাথনের দৈনন্দিন রুটিন নিয়ে বলার মতো আসলে তেমন কিছু নেই। সম্ভবত এই সাদাসিধে জীবনই এর দীর্ঘায়ুর রহস্য!”
আসল জো হলিন্স তার পরিচয় ব্যবহার করে ছড়ানো এ ভুয়া খবরে কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ দ্বীপবাসীরা জোনাথনের মৃত্যুর দিনটিকে সত্যিই খুব ভয় পান। তিনি বলেছেন, “তার বয়স যে ১৯৪ বছর, সেটা বিবেচনা করলে এ ধরনের খবর আমাদের কিছুটা দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়।”