Published : 29 Sep 2025, 05:06 PM
অনেকেই মনে হরেন অর্থের ইতিহাসটা খুব সহজ এক সরলরেখা, যেখানে মানুষ শুরুতে জিনিসপত্র বিনিময় করত, এরপর মুদ্রা আবিষ্কার করল, তারপর কাগজের অর্থ এল, এরপর কার্ড ও ডিজিটাল লেনদেনের যুগে প্রবেশ করল মানুষ।
কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, এই পরিচিত গল্পটি বাস্তবতার চেয়েও বেশি মিথের মতো। কারণ, অর্থের ইতিহাসকে নতুন করে লিখেছে তিনটি প্রাচীন সভ্যতার টালি স্টিক বা খোঁচানো কাঠের ছড়ি।
‘ইউনিভার্সিটি অফ অ্যালবানি’র অ্যানথ্রোপোলজি বিভাগের অধ্যাপক রবার্ট এম. রোজেনসউইগের পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রাচীন কাঠ ও হাড়ের তৈরি বিভিন্ন টালি স্টিক, যেগুলো সাধারণত ইংল্যান্ড, চীন ও মায়া সভ্যতায় আলাদাভাবে ব্যবহার হত এগুলো অর্থের এক অন্যরকম গল্প বলছে।
পণ্য বিনিময় থেকে অর্থ আবিষ্কারের পরিবর্তে এ গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে, অর্থের ব্যবহার শুরু হয়েছিল বিভিন্ন দেশের সরকারের হাতিয়ার হিসেবে, যেমন– কর, ভাতা হিসাব করা এবং তা আদায়ের জন্য।
‘জার্নাল অফ ইকোনমিক ইস্যুজ’-এ প্রকাশ পাওয়া রোজেনসউইগের গবেষণাটি প্রচলিত অর্থনৈতিক মডেলকে চ্যালেঞ্জ করেছে, যা বইপত্র এবং প্রাথমিক অর্থনীতির কোর্সে সাধারণত পড়ানো হয় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
বইপত্রে পড়ানো মডেল অনুসারে, প্রথমে বিনিময় শুরু হয়েছিল ও অর্থ এসেছে ‘ডাবল কোইনসিডেন্স অফ ওয়ান্টস’ সমস্যার সমাধান হিসেবে।
‘ডাবল কোইনসিডেন্স অফ ওয়ান্টস’ হচ্ছে, আপনার যদি কোনো জিনিস অন্য কারো কাছ থেকে পেতে চান তখন সেই অন্যজনেরও আপনার যা আছে সেটি পেতে চাইতে হবে। আর দুইজনের এভাবে ঠিক একই সময়ে একে অপরের পছন্দের জিনিস থাকা বা মেলা খুব কঠিন। এজন্য অর্থের ধারণা এল, যাতে সবাই সহজে ব্যবসা করতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী কিছু জিনিস যেমন সোনা, লবণ বা রূপা ধরা হয়েছিল এ কাজে ব্যবহারের জন্য, অর্থাৎ এগুলো ছিল পণ্য মুদ্রা, যা পরে ধীরে ধীরে আজকের আর্থিক ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে।
তবে রোজেনসউইগের মতে, নৃবিজ্ঞান থেকে ইঙ্গিত মেলে, বিনিময় কখনও প্রাক-আর্থিক সমাজের পর্যায় ছিল না, বরং বিনিময়ে কেবল সেইসব সমাজে মাঝেমধ্যে হত যাদের এরইমধ্যে অর্থ রয়েছে। যখন তাদের অর্থের অভাব হত তখনই কেবল বিনিময় হত, যা কখনোই পুরো অর্থনীতির ভিত্তি ছিল না।
গবেষণায় টালি স্টিকের প্রমাণ এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে সাহায্য করেছে। এসব সরল যন্ত্র ছিল কাঠ বা হাড়ের ছোট টুকরা, যেগুলোতে কর বা ঋণ আদায়ের হিসাব রাখতে ছেদ বা চিহ্ন দিতেন প্রাচীন মানুষেরা।
এগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ হল টালি স্টিক সব সময়ই সরকারের, আদালত বা শাসনগোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত বিষয়, যেগুলো বিভিন্ন সংস্থাকে কর বা দেনা আদায় করতে সাহায্য করত।
মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডে রাজকীয় অর্থদপ্তরের জন্য করের পরিমাণ নথিভুক্ত করতে হেজেল গাছের কাঠের টালি স্টিক ইস্যু করতেন শেরিফ বা ওই সময়ের সরকারি কর্মকর্তারা।
সময় গড়িয়ে কিছু টালি স্টিক কেবল হিসাব রাখার জিনিসই ছিল না, অনেক সময় এগুলোকে ঋণের নথি হিসেবে ধরা হত এবং তা অন্য কারো কাছে স্থানান্তর করা যেত। এ নিয়ে এক বিখ্যাত ঘটনা রয়েছে। একবার ৮ ফুট লম্বা টালি স্টিকে লেখা ছিল, রাজা তৃতীয় উইলিয়ামের কাছ থেকে কেউ ১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড ঋণ নিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত পরিশোধ হয়নি।
চীনে খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী থেকে বাঁশের তৈরি টালি স্টিক দিয়ে ধান, সিল্ক ও মুদ্রার লেনদেন হিসাব রাখা হত। এক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তার বিভিন্ন টালি স্টিককে দু’ভাগে ভাগ করতেন, যাতে নকল করা না যায়, যার এক ভাগ রাখত সরকার। এই রীতি প্রচলিত ছিল ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মার্কো পোলোর ভ্রমণের সময়ও।
মায়া সভ্যতায় খ্রিস্টাব্দ ৬০০ থেকে ৯০০ সালের হাড়ের বিভিন্ন টালি স্টিকে আদালতের দৃশ্য ও রাজকীয় আনুষ্ঠানিকতার ছবির দেখা মেলে, যেগুলো শাসকদের কাছে দেওয়া কর, শ্রম বা উপহারের হিসাব রাখার জন্য ব্যবহার হত। ইংরেজি ও চীনা টালি স্টিকের মতো এগুলো রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের হিসাব রেকর্ডের জন্যই ব্যবহার হত, মুক্ত বাজারের লেনদেনের জন্য নয়।
রোজেনসউইগ বলেছেন, এ তিনটি উদাহরণ এমন সভ্যতা থেকে এসেছে যাদের মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক ছিল না, তবুও তারা টালি স্টিক খুব মিল রেখে ব্যবহার করত, যা থেকে ইঙ্গিত মেলে, অর্থের মূল উৎস বিনিময় নয়, বরং ছিল রাষ্ট্রের হিসাবরক্ষণ এবং কর আদায়ের ব্যবস্থা।
গবেষকরা বলছেন, আমাদের আজকের অর্থনীতি ও অর্থ ব্যবস্থাকে বোঝার ধরন বদলাতে পারে এই ধারণা।
কোনো জিনিস বিক্রি-ক্রয়ের মাধ্যম না, বরং এটা সরকার বা রাষ্ট্রের ক্ষমতা দেখানোর এক হাতিয়ার। ফলে বিভিন্ন সরকারকে যতটা আর্থিকভাবে সীমাবদ্ধ আমরা ভাবি তারা ততটা নন।
রোজেনসউইগ বলেছেন, যে কঠোর অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে আমরা ভাবি, যেখানে সরকারদের বাড়ির মতো নিজেদের হিসাব-নিকাশ ঠিক রাখতে হয় সেই চিন্তাভাবনা এই ইতিহাসকে অগ্রাহ্য করে।
আসলে সরকার আগে খরচ করে যাতে প্রয়োজনীয় সম্পদ সংগ্রহ করতে পারে, তারপর চাহিদা ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কর বসান।
রোজেনসউইগ বলেছেন, “অর্থ কখনো স্থায়ী বা সর্বজনীন কিছু নয়। এটি এক রাজনৈতিক হাতিয়ার, আর আমরা কীভাবে এটি ব্যবহার করি তা নীতিনির্ধারণের বিষয়, কোনো প্রাকৃতিক নিয়মের নয়।”
তিন মহাদেশের টালি স্টিকের গল্প উন্মোচনের মাধ্যমে এই গবেষণা আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করেছে, অর্থ আসলে কী এবং ভবিষ্যতে তা কী হতে পারে।