Published : 09 Dec 2025, 01:12 PM
রকেট উৎক্ষেপণের কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আগুন আর ধোঁয়ার এক বিশাল বিস্ফোরণ, যেখানে রকেটের ইঞ্জিন হাজার হাজার টন ধাতব কাঠামোকে মহাকাশে ঠেলে দেয়।
কিন্তু অনেকেই হয়ত জানেন না রকেট ছোড়ার ঠিক আগে রকেটের নিচে এক বিশাল ‘জলপ্রপাত’ ছেড়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। রকেট উৎক্ষেপণের কয়েক সেকেন্ড আগে নাসা প্রায় সাড়ে চার লাখ গ্যালন পানি পাম্প করে, যা একটি অলিম্পিক মানের সুইমিং পুলের দুই-তৃতীয়াংশের সমান বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
রকেট উৎক্ষেপণের সময় দুইশো ডেসিবল পর্যন্ত তীব্র শব্দ তৈরি হয়, যা জেট ইঞ্জিন বা বজ্রপাতের শব্দের চেয়েও অনেক বেশি। ফলে রকেট ছোড়ার সময় কেবল তাপই নয়, শব্দের কম্পনও এত প্রবল হয় যে তা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি নষ্ট করে দিতে, এমনকি রকেটের ক্ষতিও করতে পারে।
এ কারণে নাসা তৈরি করেছে ‘সাউন্ড সাপ্রেশন সিস্টেম’, যা রকেট উৎক্ষেপণের আগে লঞ্চপ্যাডে বিপুল পরিমাণ পানি ছড়িয়ে দেয়। এ পানি বিভিন্ন শব্দ তরঙ্গকে শোষণ করে নেয়। ফলে সেগুলো রকেট বা যন্ত্রপাতির ক্ষতি করতে পারে না।
রকেট উৎক্ষেপণ ব্যয়সাপেক্ষ। মহাকাশে যেতে নাসাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। আর এই পানিনিক্ষেপ বা শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও সেই খরচেরই একটি অংশ।
তবে মিশনের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাসার ‘সাউন্ড সাপ্রেশন সিস্টেম’। রকেট যত বড়, শক্তিশালী ও শব্দময় হচ্ছে নাসাও ততই এই সিস্টেমকে উন্নত করছে। সম্প্রতি সংস্থাটির আর্টেমিস মিশনের বিভিন্ন পরীক্ষায় তারই ঝলক মিলেছে।
এ মিশনের উদ্দেশ্য একটাই, ভবিষ্যতের বিভিন্ন মহাকাশ মিশন যেন উৎক্ষেপণের প্রথম কয়েকটি ভয়ংকর সেকেন্ড নিরাপদে সহ্য করতে পারে।
যেভাবে কাজ করে এই সিস্টেম
উৎক্ষেপণের কয়েক সেকেন্ড আগে বিশাল হোল্ডিং ট্যাঙ্ক থেকে রকেটের নিচে বিপুল পরিমাণ পানি ছোঁড়া হয়। ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ বা এসএলএস নামে নাসার সাম্প্রতিক এক পরীক্ষায় এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে সাড়ে চার লাখ গ্যালন পানি ছেড়েছিল সংস্থাটি।
রকেট ইঞ্জিনের জ্বালানি পোড়ার তাপ তৎক্ষণিকভাবে বাষ্পে পরিণত করে পানি, যা ঘন এক বাষ্পীয় মেঘের আকারে রকেটের নিচের পুরো লঞ্চপ্যাডকে ঢেকে ফেলে। ফলে উৎক্ষেপণের সময় উৎপন্ন শব্দ প্রায় একশ ৪০ ডেসিবেল পর্যন্ত কমে আসে। এতেও মানুষের কানে ব্যথা হতে পারে। কারণ জেট ইঞ্জিনের শব্দের সমান এ শব্দ।
পানি কেবল শব্দ কমাচ্ছে না, বরং উৎক্ষেপণের সময় উৎপন্ন প্রচণ্ড তাপও কমাচ্ছে, যাতে রকেট ও লঞ্চপ্যাড ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। রকেটের বুস্টার থেকে যে তাপ তৈরি হয় তা তিন হাজার তিনশ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে এবং এ উচ্চ তাপ রকেট উৎক্ষেপণের পরে অনেকক্ষণ লঞ্চপ্যাডে থেকে যেতে পারে।
সাধারণ গাড়ির চেয়ে ২০ লাখেরও বেশি গুণ হারে জ্বালানি খরচ করে রকেটের বুস্টার। এর জন্য কোনো ব্যবস্থা না নিলে এই তাপ আগুন লাগাতে বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে। এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রক্ষাকবচ এই পানি।