Published : 12 Jun 2026, 01:43 PM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আশপাশে এখন কেবলই পরস্পরবিরোধী আলোচনা, যা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। কেউ বলছেন, এআই ভয়ানক, পৃথিবীটাকে ধ্বংস করে দেবে। আবার কেউ বলছেন, এআই চমৎকার ও ভবিষ্যৎ বদলে দেবে, যা গ্রহণ করা জরুরি।
প্রযুক্তি দুনিয়ার পুঁজিপতিরা এ আতঙ্ক আর অন্ধ উন্মাদনাকে পুঁজি করে নিজেদের পকেট ভারী করছেন এবং মানুষদের বিশ্বাস করাচ্ছেন, এআইয়ের আধিপত্য অনিবার্য। কিন্তু আসলেই কি তাই?
এআইয়ের এ চরমপন্থা ও অলীক আতঙ্কের পেছনের আসল উদ্দেশ্য ও এর বাস্তব রূপটি চিনে নেওয়ার সময় এখনই বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
এআই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব তৈরি করবে। ২০১৫ সালের শেষ প্রান্তিকে আমেরিকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রায় ৬০ শতাংশ এসেছে এআইয়ের হাত ধরে। এরমধ্যেই পণ্ডিত ও অর্থনীতিবিদরা চিন্তায় পড়েছেন, কখনও যদি এআইয়ের এ বুদ্বুদ ফেটে যায় তবে মানুষের ওপর কী ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে।
২০২২ সালের শেষদিকে প্রথম লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল হিসেবে চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার পর থেকে কেবল প্রযুক্তি খাতেই পাঁচ লাখেরও বেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন।
এখন এআইয়ের যে কোনো আলোচনার সঙ্গেই এ সতর্কবার্তা জুড়ে দেওয়া হয় যে, আরও অনেক শিল্পখাতে এর চেয়েও বড় আকারে ছাঁটাই আসছে, যা সবার ওপর প্রভাব ফেলবে।
২০২৫ সালে মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া’র সিইও জেনসেন হুয়াং বলেছিলেন, “প্রত্যেকটি চাকরির ওপরই এআই প্রভাব ফেলবে এবং এখনই তা হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এক্ষেত্রে আপনি কোনো এআইয়ের কাছে চাকরি হারাবেন না, বরং চাকরি হারাবেন এমন একজন মানুষের কাছে যিনি এআই ব্যবহার করতে জানেন।”
এ বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেই বলেছিলেন, “এআই নির্দিষ্ট কোনো মানুষের চাকরির বিকল্প নয়, বরং সার্বিকভাবে মানুষের শ্রমেরই বিকল্প।”
দিন দিন তরুণ থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ সিলিকন ভ্যালির নতুন কাফেলায় শামিল হচ্ছে, যাতে তারা এআইভিত্তিক বিভিন্ন স্টার্টআপে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে পারেন।
তাদের অনেকের এ ছুটে চলার পেছনে কোনো আদর্শিক উৎসাহ নেই, বরং রয়েছে তীব্র এক ভয়, যেখানে সম্পদশালী হওয়ার শেষ ট্রেনে চড়ার টিকিটটা যদি তারা মিস করে ফেলেন, সেই ভয়! তারা ভয় পাচ্ছেন সেই ‘স্থায়ী নিম্নবিত্ত’ শ্রেণীতে আটকে যাওয়ার, যা হয়ত ভাগ্যের জোরে তারা নিজেরাই একদিন তৈরি করবেন।
তবে এসব পরস্পরবিরোধী ও ধ্বংসাত্মক ধারণার মধ্যে একটি সাধারণ মিলও রয়েছে, সেটি হচ্ছে এআই নিয়ে তাদের ‘চরমপন্থা ভাবনা’। এ ভাবনাটি হচ্ছে এআইকে ঈশ্বরতুল্য বা অলৌকিক শক্তি হিসেবে দেখার মানসিকতা, যা হয় উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনের এক সুবর্ণ যুগের সূচনা করবে, নয়ত মানবজাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।
এ ভাবনাটি বর্তমান যুগের রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ধর্মীয় উগ্রপন্থার অন্ধ আবেগের সঙ্গেও মেলে। আর এমনটা এমনি এমনি হয়নি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই করা হয়েছে।
যতই বৈপরীত্য থাকুক না কেন এসব যুক্তি ও উদ্বেগ এ প্রযুক্তি তৈরি করা মানুষদের মূল বার্তার সঙ্গে মিলেই যাচ্ছে। বার্তাটি হল, এআইয়ের আধিপত্য অনিবার্য। এতে শামিল হোন, নয়ত পিছিয়ে পড়ুন। এ যুগের আধুনিক পুঁজিপতিরা কেবল তাদের এ সেরা পণ্যটির প্রতি মানুষের উৎসাহ থেকেই নয়, বরং এ নিয়ে মানুষের মনে থাকা ভয় ও আতঙ্ক থেকেও মুনাফা লুটে নিচ্ছে।
‘কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি’র অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সুরেশ নাইডু বলেছেন, “আপনি যদি আইপিওর বড় আর্থিক মূল্যায়নকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে চান তবে আপনাকে দেখাতে হবে যে ভবিষ্যতে এখান থেকে আপনার কী পরিমাণ আয়ের ধারা তৈরি হবে।
“আপনাকে কেবল এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করতে হবে যেন মনে হয় আপনার কাছে এমন কিছু আছে, যা পৃথিবীর সব কাজ একাই করে ফেলতে পারে। এতে করে একজন বিনিয়োগকারী ভাববেন, ‘আরে! আমি তো কোনোভাবেই এ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাই না’।”
নাইডু এসব দাবিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না যে, এআই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে বা নির্দিষ্ট কিছু শিল্পখাতকে ওলটপালট করে দেবে। তিনি এ প্রযুক্তিকে ‘রূপান্তরকারী’ হিসেবেই বর্ণনা করে বলেছেন, একজন গবেষক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি নিজেও প্রতিদিনের কাজে এআই ব্যবহার করেন।
তবে, তিনি যখন একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এআই ও এর সঙ্গে জড়িত সব প্রতিশ্রুতি ও সতর্কবার্তাকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে রেখে দেখেন তখন এর মধ্যে অনেকখানি ‘অতিরঞ্জন বা হাইপ’ই তার চোখে পড়ে।
কোনো নিয়ন্ত্রক দল নেই
‘গ্লিচ’ নামের স্টার্টআপের সাবেক সিইও অনিল দাশ গত কয়েক দশক ধরে প্রযুক্তি নিয়ে লিখছেন। তিনিও বিশ্বাস করতে পারছেন না, প্রযুক্তি প্রধানরা এআই নিয়ে যা যা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন এআই সত্যিই তার সবকিছু করতে পারবে।
“যে কোনো প্রযুক্তিতে যদি আপনি প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের মতো বিনিয়োগ করেন তবে তা ভালো হোক বা মন্দ অনেক কিছুই করতে পারবে। এক্ষেত্রে এআই বড় ধরনের অগ্রগতি। আমার মনে হয় না এর আগে আমাদের কাছে এমন কোনো মেশিন লার্নিং সিস্টেম ছিল, যা বর্তমানটির মতো এত কাজ করতে পারে।
“তবে বিষয়টিকে নিয়ে এত বেশি শোরগোল বা হাইপ হচ্ছে, কোন কোন ক্ষেত্রে এআই আসলেই কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে তা বলা কঠিন।”
অনিল দাশ বলেছেন, কোডিংয়ের বিষয়টি অবশ্য আলাদা। এআই মডেলের তৈরি করা কোড পরীক্ষা করা সহজ। কারণ এটা হয় কাজ করবে, না হয় করবে না। তবে এ প্রযুক্তির অন্যান্য অনেক ব্যবহারই বেশ আপেক্ষিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক, যার কারণে সেসব ক্ষেত্রে এখনই মানুষের চাকরি চলে যাওয়ার ঝুঁকি কম।
এ কারণেই প্রযুক্তি খাত এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আকারে কর্মী ছাঁটাই করেছে। অ্যামাজন, মেটা ও ব্লক-এর মতো প্রযুক্তি কোম্পানিতে এ ছাঁটাইয়ের মধ্যেই সেখানকার কর্মীরা অভিযোগ করছেন, এআইয়ের কারণে উৎপাদনশীলতা আকাশচুম্বী হওয়ার যে দাবি তাদের প্রধানেরা জোর গলায় করছেন, তা আসলে বাড়িয়ে বলা।
কর্মী ছাঁটাই ও প্রাথমিক স্তরের বিভিন্ন পদ কমিয়ে আনার পেছনে এআই ঠিক কতটা ভূমিকা রাখছে তা-ও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
‘ইউসি বার্কলে হাস স্কুল অফ বিজনেস’-এর অধ্যাপক মার্টিন বেরাহা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও ব্যবসায়িক চক্র নিয়ে গবেষণা করছেন।
তিনি বলেছেন, চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার সঙ্গে প্রাথমিক স্তরের সফটওয়্যার চাকরি কমে যাওয়ার যে সম্পর্ক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখানো হয়েছে তাতে ‘গলদ রয়েছে’।
“করোনা মহামারির পর প্রযুক্তি খাতে প্রচুর কর্মী নিয়োগ করা হয়েছিল। তবে মহামারি শেষে মানুষের খরচের অভ্যাস যখন অনলাইন থেকে আবার বাস্তব পৃথিবীর দিকে ফিরে এল তখন দেখা গেল এই শিল্পে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত মানুষ কাজ করছে, যাদের আসলে তখন আর কোনো দরকার ছিল না।”
প্রযুক্তি জগতের ও এআইয়ের পক্ষে সবচেয়ে জোরালো গলা ফাটানো কিছু মানুষও এখন এআই সমালোচকদের মতো একই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন।
মার্চে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট মার্ক অ্যান্ড্রেসেন দাবি করেছেন, অতিরিক্ত কর্মী ছাঁটাই করে কোম্পানি ‘পরিষ্কারের’ জন্য বিভিন্ন কোম্পানি এআইকে ‘মোক্ষম উসিলা’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
আবার মে মাসে ওপেনএআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যান এআইয়ের মাধ্যমে ব্যাপক হারে চাকরি প্রতিস্থাপনের বিষয়ে তার আগের কিছু দাবি থেকে সরে এসে বলেছেন, “আমি ভেবেছিলাম প্রাথমিক স্তরের হোয়াইট-কলার (অফিস বা ডেস্কভিত্তিক) চাকরিগুলো এখন পর্যন্ত যেভাবে টিকে আছে এর চেয়ে বেশি মাত্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে।”
প্রযুক্তি খাতের চাকরির ক্ষেত্রে এআইয়ের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিও যদি সত্যি হয় তাহলে আসলেই বহু মানুষের জন্য খুবই খারাপ হবে। এরপরও বিষয়টি কিন্তু শ্রমবাজারের সেই চরম ধ্বংসাত্মক ভবিষ্যৎ রূপ ধারণ করবে না, যা নিয়ে অনেকে ভয় পাচ্ছেন।
অধ্যাপক নাইডু প্রশ্ন তুলে বলেছেন, “এআই কি আসলেই সব চাকরি ধ্বংস করে দেবে? আমি নিশ্চিত নই। সফটওয়্যার খাতের কথাই ধরুন। সফটওয়্যার আমাদের জিডিপির কেবল চার থেকে ছয় শতাংশ। ফলে তা অনেক বড় অংশ হলেও, পুরো অর্থনীতিকে কিন্তু ক্লড কোডের মতো প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।”
এআই দলে দলে মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে, মানুষকে এমনটা বিশ্বাস করানো আসলে চতুর এক বিপণন কৌশল বা মার্কেটিং ট্যাকটিক, যা কেবল বিনিয়োগকারীদের মনে অন্ধ উন্মাদনা ও জল্পনা-কল্পনাই তৈরি করে না, বরং বিশ্বজুড়ে সাধারণ কর্মীদের ক্ষেত্রে এআইয়ের আরও বাস্তবসম্মত ব্যবহারের দিক থেকে নজর ঘুরিয়ে দেয়, আর এমনটা কেবল প্রযুক্তি খাতের মধ্যেই সীমিত নয়।
বিকল্প পথও আছে
এআইয়ের যে সংস্করণটি মানুষের কাছে বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছে সেটাই গ্রহণ করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আর মানুষের যে গল্পটি বিশ্বাস করানো হচ্ছে, সেটা মেনে নেওয়ারও কোনো প্রয়োজন নেই।
তবে এআই থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা বা বর্জন করাও যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ এ ধরনের কঠোর অবস্থান অবাস্তব ও এর কোনো কার্যকারিতা নেই। বুদ্ধিমান যে কেউই বুঝতে পারেন, বাস্তব দুনিয়ায় এমন কট্টর নিয়ম বা বিধিনিষেধের পরিণতি কী হয়। এআইয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটছে।
এ বছরের শুরুতে ওয়াশিংটন পোস্টেরর শিরা ওভাইড লিখেছিলেন, “এআই এমন আরেকটি প্রযুক্তি যা আমেরিকানরা পছন্দ করে না তবে তা ব্যবহার করাও বন্ধ করতে পারে না।”
তিনি জরিপের দুটি বিপরীত চিত্রের কথা বলছিলেন, যেখানে একদিকে দেখা যাচ্ছে মানুষ এ প্রযুক্তির ওপর কতটা অবিশ্বাস করছে, আর অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে গত এক বছরে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা কতটা দ্রুত গতিতে বেড়েছে।
ইউসি বার্কলের অধ্যাপক বেরাহা বলেছেন, এআই’কে কেবলই মানুষের চাকরি কেড়ে নেওয়ার প্রযুক্তি হিসেবে দেখার প্রবণতা বড্ড বেশি। প্রযুক্তি খাতের মতো হাতেগোনা কয়েকটি ক্ষেত্র বাদ দিলে, বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, মানুষ ও বিভিন্ন কোম্পানির জন্য এআই ব্যবহারের সবচেয়ে কার্যকর উপায় কর্মী ছাঁটাই করা নয়, বরং এর মাধ্যমে আরও বেশি কিছু শেখা ও আরও দ্রুত শেখা যায়।
এআইয়ের কারণে যেসব শিল্পখাত ও পেশা ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে সেই ধাক্কাটি হয়ত কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ক্ষমতা পুনরায় ফিরিয়ে আনার পথ খুলে দিতে পারে। কারণ এখন হোয়াইট-কলার বা অফিসভিত্তিক কর্মীরাও এ ঐক্যের গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছেন, তা সে নিজের অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গেই হোক বা ব্লু-কলার বা শারীরিক শ্রম দেওয়া সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গেই হোক না কেন।
দিনশেষে, শিল্প বিপ্লবের কথাই যদি ধরা যায় সেক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত বড় পরিবর্তনের সেই অতীতকালটি অদ্ভুতভাবে বর্তমান সময়ের সঙ্গে মিলে যায়। সেই বিপ্লবটিই শেষ পর্যন্ত শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। তবে এর সুফল পেতে কিছুটা সময় লেগেছিল।